ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০২ জুলাই ২০২০,   আষাঢ় ১৮ ১৪২৭,   ১১ জ্বিলকদ ১৪৪১

DinBodolBD
সর্বশেষ:
বৃষ্টির কারণে ত্রিদেশীয় টি-টোয়েন্টি সিরিজের উদ্বোধণী ম্যাচ শুরু হবে সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটে

ইসলামে নরহত্যা মহাপাপ

প্রকাশিত: ১৫:১৯, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৪:২৫, ৭ অক্টোবর ২০১৯

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলামে নরহত্যা, গুপ্তহত্যা, অপহরণ, গুম প্রভৃতি চরমপন্থা অবলম্বনকে নিষিদ্ধ করে হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। পূর্ববর্তী জাতিসমূহ এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সাময়িক উত্তেজনা বা সস্তা আবেগের বশবর্তীতে মানুষকে অপহরণ, গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ, জ্বলন্ত পুড়িয়ে মারার মতো চরমপন্থা গ্রহণ বা বাড়াবাড়ির অবকাশ ইসলামে নেই। কাউকে প্রাণনাশ বা হত্যা করা সামাজিক অনাচার ও অত্যাচারের অন্তর্ভুক্ত। প্রতিশোধ গ্রহণের অসৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যারা নিরপরাধ মানুষ হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তারা মানবতাবর্জিত ও সভ্য জগতের শত্রু। তাদের কোনো ধর্ম নেই। নরহত্যা যে কত বড় মহাপাপ, তা তারা উপলব্ধি করে না। নিরপরাধ মানুষ হত্যার মতো ঘোরতর অন্যায় করতে এরা দ্বিধাবোধ করে না। পবিত্র কোরআনে নরহত্যাকে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তোমরা তাকে হত্যা করো না।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩৩) বিশ্বের সকল ধর্ম নরহত্যার মতো জঘন্য অপরাধ থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। নিরীহ মানুষকে বিনা বিচারে মেরে ফেলার চেয়ে ভয়াবহ পাপ আর সমাজে নেই। যেখানে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আদর্শিক প্রতিপক্ষকে শত্রু বিবেচনা করা হয়। মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের কারণে মনুষ্যত্ব হারিয়ে পশুত্বে পরিণত করে এবং আল্লাহর গজব নেমে আসে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, একজন মানুষ কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হওয়ার পর তিনি জানেন না, কাজ শেষে নিরাপদে বাসায় পৌঁছতে পারবেন কি না। বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাতনামা লাশ ও বস্তাবন্দী কঙ্কাল পাওয়ার সংবাদে জনসাধারণের মাঝে একধরনের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। অথচ ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী হলো ‘নরহত্যা মহাপাপ।’ নরহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধে ইসলামি শরিয়তের দিকনির্দেশনাগুলো মেনে চলা উচিত এবং অন্যকেও ধর্মীয় জীবনযাপনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। মানুষ যত বেশি নৈতিক শিক্ষা অর্জন ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবে, তাদের জীবন থেকে তত বেশি অপরাধপ্রবণতা কমে যাবে। হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে করলে হয় প্রকাশ্য হত্যা, আর গোপনে করলে হয় গুপ্তহত্যা। উভয় হত্যাকাণ্ডের শাস্তি একই—মৃত্যুদণ্ড। প্রকাশ্যে বা গোপনে যেভাবেই হোক, হত্যাকারীকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। যদি সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দুনিয়ার আদালতে এর ন্যায়বিচার করতে হবে। নতুবা তাকে আখেরাতের আদালতে কঠিন শাস্তি পেতে হবে। পবিত্র কোরআনে হত্যাকাণ্ডকে মহাপাপ সাব্যস্ত করে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে হত্যা করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে জাহান্নামে শাস্তির কঠোর বিধান সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো মুমিনের জন্য সমীচীন নয় যে, সে অন্য মুমিনকে হত্যা করবে, অবশ্য ভুলবশত করে ফেললে অন্য কথা। আর কেউ স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯২-৯৩)

হত্যা ও গুপ্তহত্যা যেভাবে রাষ্ট্রীয় আইনে একটি ভয়াবহ অপরাধ, তেমনি পবিত্র কোরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতেও  জঘন্যতম অপরাধ। এ ধরনের অমানবিকতা দূর করতে হলে মানুষের মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করতে হবে। তাকওয়া বা খোদাভীতি মনে থাকলে মানুষ কখনো কাউকে হত্যা করবে না। পরকালে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করার অনুভূতি জাগ্রত থাকলে মানুষের মধ্যে অপরাধের মাত্রা অনেক কমে যায়। কারণ, মানুষ জানে, তাকে একদিন আল্লাহর সামনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তখন নরহত্যার মতো মহাপাপের কথা জিজ্ঞাসা করলে সে কী জবাব দেবে? মানুষের অন্তরের এই অনুভূতি অন্যায় কাজ করতে বাধা দেয়। নরহত্যার শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ৩২)

ভয়ানক নরহত্যার জঘন্যতা ও হত্যাকারীর জন্য কঠোর শাস্তির কথা হাদিস শরিফেও উল্লেখ করা হয়েছে যে ‘দুনিয়া ধ্বংস করে দেওয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।’ (তিরমিযি) কিয়ামতের দিন নরহত্যার বিচার করা হবে সবার আগে। তারপর অন্যান্য অপরাধের বিচার করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফয়সালা হবে, তাহলো রক্তপাত (হত্যা) সম্পর্কিত।’ (বুখারি ও মুসলিম)

নবী করিম (সা.) কখনো একজন মানুষকে গুপ্তহত্যা করেননি, বরং নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে মানুষকে দূরে থাকতে বলেছেন এবং হত্যাকে কুফরির মতো ভয়াবহ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মানুষকে হত্যার পরিবর্তে মিত্রতা স্থাপনের কথা বলেছেন। খুনখারাবি থেকে মানুষকে বিরত রেখে তিনি বিবদমান আরব গোত্রদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) বিনা অপরাধে একজন নিরীহ মানুষকেও হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। যখনই কেউ অবৈধ হত্যায় লিপ্ত হয়, তার ওপর থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যায়। সবার গুনাহ ক্ষমা করলেও আল্লাহ তাআলা হত্যাকারীকে ক্ষমা করবেন না। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘একজন প্রকৃত মুমিন তার দ্বীনের ব্যাপারে পূর্ণ প্রশান্ত থাকে, যে পর্যন্ত সে অবৈধ হত্যায় লিপ্ত না হয়।’ (বুখারি)

সমাজে ফেতনা-ফ্যাসাদ, মানবিক বিপর্যয় ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাকে হত্যার চেয়ে জঘন্যতম অপরাধ সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাই জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। দেশের আলেম সমাজ, ধর্মীয় নেতা, মসজিদের ইমাম ও খতিবদের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অপহরণ, গুম, হত্যা ও গুপ্তহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ এবং বলিষ্ঠ অবস্থান রেখে জনগণকে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সমাধানের একটি সহজ পথ। নিরীহ মানুষকে অপহরণ, গুম, হত্যা ও গুপ্তহত্যা সম্পর্কে সচেতন ও সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে ইসলামের বিধানের প্রচারণামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়ে গণমাধ্যমও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।


ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: শিক্ষক, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।