শুক্রবার

০২ অক্টোবর ২০২০


আশ্বিন ১৬ ১৪২৭

১৪ সফর ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

নারী সিরিয়াল কিলার এলিজাবেথ বাথোরি

|| দিনবদল.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৯:০৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০
নারী সিরিয়াল কিলার এলিজাবেথ বাথোরি

এলিজাবেথ বাথোরি

সিরিয়াল কিলার শব্দটি শুনলেই ভয়াবহ এক পুরুষ চরিত্রই মাথায় আসে। কিন্তু জগত ব্যতিক্রমে ঠাঁসা। কুখ্যাত নারী সিরিয়াল কিলারের মধ্যে রয়েছেন এমিলিয়া ডায়ার, জুডি বুয়েনোয়ানো, জেন টোপ্পান, কারলা হোমোকা, ক্যাথি উডেসহ অনেকেই। যাদের নাম শুনে আজও আঁতকে ওঠেন মানুষ। তেমনি আঁতকে উঠার মতো এক নাম এলিজাবেথ বাথোরি। ইতিহাস যাকে চেনে ‘ব্লাড কাউন্টেস‘ নামে। যিনি প্রায়  ৬০০ মানুষকে খুন করেছিলেন।

সিরিয়াল কিলাররা বেশিরভাগই মানসিক দিক থেকে বিকারগ্রস্থ হয়। তীব্র অবসাদ, অবদমিত আক্রোশ ও যৌন উত্তেজনার প্রভাবে তারা নির্বিকারভাবে চালিয়ে যায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুন করার পিছনে নির্দিষ্ট কোনও কারণ থাকে না। খুন করে আনন্দ পাওয়ার জন্যই খুন করে সিরিয়াল কিলাররা। রক্তের সাগরে ভাসতে থাকা, মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা মানুষদের দেখতে তাদের ভালো লাগে।

ষোড়শ শতাব্দীতে হাঙ্গেরির নাথারবাথোর এলাকায় ‘বাথোরি’ নামে অত্যন্ত অভিজাত এক কাউন্ট পরিবার বাস করত। বিশাল বিশাল দুর্গ ও প্রাসাদ, অগণিত সৈন্যসামন্ত, লোক-লস্কর ও দাসদাসী নিয়ে রাজকীয়ভাবে জীবন চালাতেন বাথোরি পরিবারের কাউন্ট ও কাউন্টেসরা।

১৫৬০ সালে, এই বাথোরি পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি। শিশু অবস্থাতেই এলিজাবেথের মৃগী রোগ ধরা পড়েছিল। ঘন ঘন অজ্ঞান হয়ে যেতেন। চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও, এলিজাবেথের মধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছিল অপরিসীম ক্রোধ। তুচ্ছ কারণে সে ক্রোধের ভয়ানক বহিঃপ্রকাশ ঘটত। যা সামাল দিতে পরিবারকে হিমশিম খেতে হতো।

এলিজাবেথের বাবা জর্জ (ষষ্ঠ) বাথোরি ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর মানুষ ছিলেন। তাঁর কাউন্টিতে বসবাসকারী কৃষকদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালাতেন। কৃষক পরিবারগুলির ওপর বাবার নির্মম অত্যাচার দেখতে দেখতে বড় হয়েছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি। একবার জর্জ বাথোরি গুপ্তচর সন্দেহে একজন নিরপরাধ কৃষককে মৃত ঘোড়ার পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে দিয়ে সেলাই করতে বলেছিলেন। তারপর জীবন্ত কৃষক সমেত মৃত ঘোড়াটিকে কবর দেওয়া হয়েছিল। নৃশংস এই ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এলিজাবেথ। মেয়ের সাহসের সেদিন প্রশংসা করেছিলেন বাবা ষষ্ঠ-জর্জ।

`চেতে` দুর্গর অংশ বিশেষ

মাত্র ১২ বছর বয়েসে এলিজাবেথ বাথোরির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ১৬ বছরের ফেরেঞ্জ নাদাসদির সঙ্গে। ফেরেন্স নাদাসদির পরিবারও ছিল কাউন্ট পরিবার। বিয়ের পরে খুব বেশিদিন টানা এক সঙ্গে থাকতে পারেননি এলিজাবেথ ও ফেরেঞ্জ। পাঁচ বছর পরেই এলিজাবেথ বাথোরির স্বামী ‘ম্যাগিয়ার কিরালাইসাগ’ সাম্রাজ্যের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। প্রশাসনের কাজে ফেরেন্সকে বেশিরভাগ সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো।

বিয়ের কয়েক বছর পরেই মারা গিয়েছিলেন বাবা ষষ্ঠ-জর্জ। স্বামী ফেরেঞ্জও বেশিরভাগ সময় দুর্গের বাইরে থাকতেন। এহেন পরিস্থিতিতে, কৃষকেরা ধীরে ধীরে বাথোরি পরিবারের অত্যাচারের কথা জনসমক্ষে বলতে শুরু করছিলেন। এলিজাবেথ বাথোরির মধ্যে জেগে উঠেছিল লুকিয়ে থাকা পিশাচ। তিনজন কর্মী সেমসেজ, জো ও ফিকোকে নিয়ে ‘চেত’ দুর্গে শুরু করেছিলেন ‘বাথোরি’ কাউন্টির এক নারকীয় অধ্যায়।

বালিকাগুলি পরিচারিকার কাজে যোগ দেওয়ার পর যেকোনও অছিলায় শুরু হতো অত্যাচার। বালিকাগুলি বাধা দিলে, বাধা দেওয়ার কারণে শুরু হতো আরও বেশি অত্যাচার। শুরু হতো অকল্পনীয় মারধোর, গায়ে মদ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া, লোহার শলাকা আগুনে লাল করে সর্বাঙ্গে ছ্যাঁকা দেওয়া, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কুপিয়ে কাটা, উলঙ্গ করে শরীরে মধু মাখিয়ে বিষাক্ত পিঁপড়ে ছেড়ে দেওয়া, মুখ বাহু ও অনান্য অঙ্গে কামড়ানো, জলে ডোবানো, বরফের ওপর নগ্ন দেহে শুইয়ে রাখা, দিনের পর দিন অনাহারে রাখা। যতরকমভাবে বালিকাগুলির ওপর পৈশাচিক অত্যাচার করা সম্ভব, ততরকমভাবে অমানুষিক অত্যাচার চালাতেন এলিজাবেথ বাথোরি।

অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একসময় বালিকাগুলি ঢলে পড়ত মৃত্যুর কোলে। দুর্গের পরিত্যক্ত কুয়োয় জমা হতো হতভাগ্যদের লাশ। শোনা যায় নাশপাতি চুরির অপরাধে এক পরিচারিকাকে এমনই অত্যাচার করেছিলেন, রক্তে ভিজে যাওয়া পোশাক পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন এলিজাবেথ। ঘন্টার পর ঘন্টা অত্যাচার চালানোর পর, কাঁচি দিয়ে আঘাতের পর আঘাত হেনে হত্যা করেছিলেন পরিচারিকাটিকে। এই হত্যাকাণ্ডগুলি এলিজাবেথ বাথোরি চালাতেন স্বামী ফেরেঞ্জের অনুপস্থিতির সুযোগে।

বিয়ে দশ বছর পর মারা গিয়েছিলেন স্বামী ফেরেঞ্জ। আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি। অসংখ্য বালিকা হত্যা করার পর এলিজাবেথ বুঝে গিয়েছিলেন, তিনি ধরা পড়বেন না। কারণ তাঁর সঙ্গে আছে বাথোরি পরিবারের নামডাক ও ক্ষমতা। এর পর এলিজাবেথ বাথোরি খুন করতে শুরু করেছিলেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর যুবতীদের। কেন এবং কোন অজানা আক্রোশে যুবতীদেরও খুন করেছিলেন এলিজাবেথ, তা আজও জানা যায়নি।

তিন সঙ্গীকে নিয়ে নির্বিঘ্নে নারকীয় হত্যালীলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি। ১৬১০ সালে গোপন সূত্রে এই পৈশাচিক হত্যালীলার খবর পেয়েছিলেন এলিজাবেথ বাথোরির খুড়তুতো ভাই, কাউন্ট জর্জ থুর্জোর। একবছর ধরে গোপনে তদন্ত চালিয়ে, ১৬১১ সালে সৈন্যসামন্ত নিয়ে হানা দিয়েছিলেন এলিজাবেথ বাথোরির ‘চেতে’ দুর্গে।

দুর্গের ঘন অন্ধকার থেকে দিনের আলোয় বেরিয়ে এসেছিল, এক নারকীয় ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। দুর্গের ভেতরে থাকা পরিত্যক্ত সুবিশাল কুয়োতে পাওয়া গিয়েছিল প্রচুর বালিকা ও যুবতীর পচতে থাকা মৃতদেহ ও কঙ্কাল। দুর্গের গোপন কুঠরিগুলিতে পাওয়া গিয়েছিল মৃত্যুর প্রতীক্ষায় থাকা অগণিত কঙ্কালসার বালিকা ও যুবতীকে।

দুর্গের ভেতরে এক যুবতীর ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানোর সময় হাতেনাতে পড়েছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি ও তাঁর তিনসঙ্গী। কিন্তু গ্রেফতার করা হয়েছিল বাথোরির তিন সঙ্গীকে। বিচার শুরু হয়েছিল। আজও সেই বিচারের কাগজপত্র হাঙ্গেরির সরকারি আর্কাইভে সযত্নে রাখা আছে। বিচারের সময় এক সাক্ষী জানিয়েছিলেন, ১৫৮৫ সাল থেকে ১৬০৯ সাল পর্যন্ত, এলিজাবেথ বাথোরি ও তাঁর তিন সঙ্গী মিলে খুন করেছিলেন প্রায় ছ’শো নিরপরাধ বালিকা ও যুবতীকে। যদিও এর মধ্যে মাত্র ৮০ টি খুন আদালতে প্রমাণ করা গিয়েছিল। খুনি সেমসেজ, জো ও ফিকোকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছিলেন বিচারক। মৃত্যুদণ্ড কয়েক মিনিটের মধ্যেই জনসমক্ষে কার্যকর করা হয়েছিল।

বিচারের সময়ে জানা গিয়েছিল, এলিজাবেথ বাথোরি বাথটবের জলে বালিকাদের টাটকা রক্ত মেশাতেন। ত্বককে বয়েসের তুলনায় তরুণ করে তোলার জন্য। জানা গিয়েছিল এলিজাবেথ বাথোরি ছিলেন উভকামী। পুরুষ ও নারী উভয়ের সঙ্গেই অকাতরে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন। অমানুষিক অত্যাচার করে, খুন করে যৌন আনন্দ পেতেন। কিন্তু এলিজাবেথ বাথোরির এই নির্মম হত্যালীলার বিচার করতে পারেনি আদালত। কারণ তিনি ছিলেন কাউন্টেস। তাহলে কী পাশবিক অপরাধ করেও পার পেয়ে গিয়েছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি! না পার তিনি পাননি। ভাই কাউন্ট জর্জ থুর্জোর তাঁর দিদিকে দিয়েছিলেন এক ভয়াবহ শাস্তি।

এলিজাবেথ বাথোরির ‘চেত’ দুর্গেরই একটি গোপন কুঠরিতে এলিজাবেথকে ঢুকিয়ে দিয়ে, দেওয়াল গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। দেওয়ালের মাঝখানে দুটি ইঁটের সমান একটি গর্ত রাখা হয়েছিল। সেই গর্ত দিয়ে প্রবেশ করতো বাতাস ও আলো। সেই গর্ত দিয়েই ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হতো খাদ্য এবং পানীয়। ওই কালকুঠরিতেই মল-মুত্র ত্যাগ করতে বাধ্য হতেন একান্ন বছরের এলিজাবেথ বাথোরি। বাধ্য হতেন ঠান্ডা মেঝেতে, বিছানা ছাড়া শুতে।

নিজেরই আবিষ্কার করা পৈশাচিক পদ্ধতিটির ভয়াবহতা সেই প্রথম অনুভব করেছিলেন এলিজাবেথ বাথোরি। কী অসীম যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছিল ছ’শো বালিকা ও যুবতী, হয়তো তাও অনুভব করেছিলেন। প্রায় চার বছর ওই বদ্ধ কুঠরিতে নরক যন্ত্রণা ভোগ করার পর মিলেছিল মুক্তি। ১৬১৪ সালে, বসন্তের এক ভোরে, এলিজাবেথ বাথোরিকে ঘরের মেঝেতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল। এলিজাবেথ বাথোরির পচন ধরা শরীর কুরে কুরে খাচ্ছিল পিঁপড়ের দল।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়