দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে গাজা-সুদান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || দিন বদল বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৩:৫২, রবিবার, ২৪ মার্চ, ২০২৪, ১০ চৈত্র ১৪৩০
ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

গাজার প্রায় ১১ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ক্ষুধার্ত। পরিস্থিতি যদি সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায় তাহলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মধ্যেই গাজার সবাই দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে।

খাবারের অভাবে গাজা উপত্যকার লক্ষাধিক মানুষ এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। সেই সঙ্গে সুদানেও চলমান সংঘাত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষুধা সংকটের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। খাবারের তীব্র সংকটের ফলে একটি দেশের জনগোষ্ঠী গুরুতর অপুষ্টি, অনাহার বা মৃত্যুর দিকে ঝুঁকে পড়লে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

সাধারণত কোনো দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে কি না, সেটা ঘোষণা করে জাতিসংঘ। কখনও কখনও দেশটির সরকারের সঙ্গে বা অন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা বা মানবিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে এ ঘোষণা দেয় সংস্থাটি।

আইপিসির শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১১ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ক্ষুধার্ত। পরিস্থিতি যদি সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায় তাহলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মধ্যেই গাজার সবাই দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে।

জাতিসংঘ বলছে, আইপিসির নথিভুক্ত যেকোনো অঞ্চল বা দেশের তুলনায় গাজায় বেশি সংখ্যক মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অন্যদিকে, সুদানে চলমান সংঘাত দেশটিকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে মানবিক দুর্দশায় নিমজ্জিত করছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের কর্মকর্তারা, যা কিনা বিশ্বের বৃহত্তম ক্ষুধা সংকটের কারণ হতে পারে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধের ফলে সুদানের প্রায় এক কোটি আট লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছে। ইউনিসেফ বলছে, এর ফলে ‘সবচেয়ে বাজে ধারণারও বাইরে গিয়ে’ ছোট শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির পাশাপাশি কলেরা, হাম এবং ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।

অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার নামের একটি মানবিক সংস্থার তথ্যমতে আরও কয়েকটি দেশেও ‘ক্ষুধার মাত্রা খুবই উদ্বেগজনক’ অবস্থানে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, কঙ্গো, ইথিওপিয়ার টাইগ্রে অঞ্চল, পাকিস্তান, সোমালিয়া, সিরিয়া এবং ইয়েমেন।

২০২৪ সালের মার্চে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছিল যে, অনবরত বাড়তে থাকা গ্যাং সহিংসতার কারণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুতর সংকটের সম্মুখীন হওয়া হাইতি ‘ধ্বংসাত্মক ক্ষুধা সংকটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।

সেখানকার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এর চেয়ে এক ধাপ নিচের স্তরে রয়েছে আরও ৩০ লাখ মানুষ। আইপিসির মতে, হাইতির খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি ‘আশঙ্কাজনক’।

আইপিসি বলছে, দুর্ভিক্ষ এবং চরম খাদ্য সংকটের একাধিক কারণ রয়েছে। মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক কারণে কিংবা দুটোর সংমিশ্রণে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার বলছে, ‘বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার মূল কারণ’ সংঘাত।

সুদানের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের জন্য সংস্থাটি অপর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন ও খাবারের উচ্চ মূল্যকে দায়ী করছে। এতে বলা হয়েছে, গাজায় চলমান সংঘাতের কারণে জীবন রক্ষাকারী খাদ্য, জ্বালানি ও পানি ওই ভূখণ্ডে ঢুকতে পারছে না।

উত্তর গাজায় মানবিক সংস্থাগুলোর ‘প্রায় ঢুকতেই না পারা’র বিষয়টিকেও তুলে ধরেছে আইপিসি। আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির (আইআরসি) মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে চরম আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে, তার কারণে সৃষ্ট খরা ও ফসল উৎপাদনে ব্যর্থতায় খাদ্য ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকায় এই ঘাটতি ব্যাপক।

আরও একটি কারণ এল নিনো। এটি মূলত জলবায়ুর একটি ধরন, যার কারণে প্রশান্ত মহাসাগরে ভূপৃষ্ঠের জলের উষ্ণতা অস্বাভাবিক পরিমাণে বেড়ে যায়।

সংস্থাটির মতে, ইতোমধ্যেই এল নিনো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকায় খাদ্য সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে দক্ষিণ সুদানে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছিল। তিন বছরের গৃহযুদ্ধের পর প্রায় ৮০ হাজার মানুষ অনাহারে এবং আরও দশ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে ছিল। সে সময় কৃষির ওপর যুদ্ধের প্রভাবকে এর জন্য দায়ী করে জাতিসংঘ। কৃষকরা গবাদি পশু হারিয়েছিল, ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছিল এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল।

এছাড়া ২০১১ সালে দক্ষিণ সোমালিয়ায়, ২০০৮ সালে দক্ষিণ সুদানে, ২০০০ সালে ইথিওপিয়ার সোমালি অঞ্চলের গোডে, ১৯৯৬ সালে উত্তর কোরিয়ায়, ১৯৯১-৯২ সালে সোমালিয়ায় এবং ১৯৮৪-৮৫ সালে ইথিওপিয়ায় দুর্ভিক্ষ ছিল।

১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ সালের একটি সময় পর্যন্ত আয়ারল্যান্ড অনাহার ও রোগে ভুগেছে। অনেকেই সেসময় দেশত্যাগ করে, যা পরবর্তী সময়ে ‘মহা দুর্ভিক্ষ’ নামে পরিচিতি পায়। সেসময় দেশটির এক তৃতীয়াংশ মানুষ আলু খেয়ে জীবন ধারণ করতো। বলা হয়ে থাকে, কোনো এক রোগের কারণে আলু উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় তখন দশ লাখ মানুষ মারা যায়। কিন্তু এর মধ্যেও সেই সময়ে দ্বীপটি শাসন করা গ্রেট ব্রিটেনে আলু আমদানি অব্যাহত ছিল।

দিনবদলবিডি/Rony

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়