শেখ হাসিনার প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সততার অনন্য দৃষ্টান্ত পদ্মা সেতু

দিন বদল বাংলাদেশ ডেস্ক || দিন বদল বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ বিকাল ০৩:১০, বুধবার, ৩ জুলাই, ২০২৪, ১৯ আষাঢ় ১৪৩১
ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

একটি সেতু শুধু দুটি বিচ্ছিন্ন এলাকাকেই যুক্ত করে না; সেইসঙ্গে গড়ে দেয় একটি জনপদের ভবিষ্যৎ, দেখায় সীমাহীন স্বপ্ন। জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের ফসল পদ্মা সেতু যেন এর চেয়েও বেশি কিছু। অযথা ও কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতাগোষ্ঠী ঋণ চুক্তি বাতিল করে নিলে একক নেতৃত্বে নিজস্ব অর্থায়নে সবচেয়ে বড় এ অবকাঠামো নির্মাণ করে রীতিমতো অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

এর মধ্য দিয়েই তিনি উন্নত বিশ্বকে নিজেদের সামর্থ্যের বার্তা দিয়ে বোঝালেন—এটা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রত্যয়, সততা, একাগ্রতা এবং জনগণের ওপর অগাধ আস্থা স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে তাকে প্রতিটি স্তরে সাহস জুগিয়েছে। তিনি জানেন কীভাবে শুদ্ধাচারের পথ অনুসরণ করে বড় বড় প্রজেক্টের কাজ ত্বরান্বিত করা যায়। তাই তো বিশ্ব দরবারে পদ্মা সেতু আজ বাংলাদেশের মর্যাদার প্রতীক। নামকরণে ‘পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক বিভীষণ’-এর যথার্থতা এ কারণেই যে, এই বিভীষণের মাস্টারমাইন্ড ও সেতুর অর্থায়ন বাতিলের মূল হোতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতিবাচক নানা ভূমিকার কথা এ নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ৬ জুনের মধ্যে বিশ্বব্যাংক, জাইকা, আইডিবি ও এডিবির সঙ্গে পদ্মা সেতু ইস্যুতে ঋণচুক্তিসমূহ সম্পাদিত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের ২৯ জুন কাল্পনিক, অমূলক ও ভিত্তিহীন দুর্নীতির ভুয়া অভিযোগ এনে এ ঋণচুক্তিসমূহ বাতিল করা হয়। ঠিক এর ১০ দিনের মাথায় ৯ জুলাই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। দুর্নীতির অভিযোগ এনে যখন অশুভ শক্তি জননেত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের মর্যাদা মাটির সঙ্গে মেশাতে উদ্যত হয়েছিল, ঠিক তখন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের তর্জনী আরেকবার কন্যা শেখ হাসিনার তর্জনীতে ভর করে রুখে দিয়েছিল সেই উদ্ধত ষড়যন্ত্রের কালো হাত। সেই তর্জনীর দেখানো পথেই শেখ হাসিনা তার সততা, আত্মবিশ্বাস, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে গড়লেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

ব্রিটেনের স্বনামধন্য লেখক ডগলাস এভ্রেট তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘There are some people who live in a dream world, and there are some who face reality; and then there are those who turn one into the other.’ যার বাংলা অর্থ এমন—‘কিছু মানুষ স্বপ্নের জগতে বাস করে। কিছু মানুষ বাস্তবে বাস করে। আর কিছু মানুষ আছে, যারা স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে।’ আমাদের সেই বিজয়ের স্বপ্ন দেখানো মানুষটিই হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু প্রকল্পে মোট পাঁচটি প্যাকেজ ছিল। যথা—মূল সেতুর অবকাঠামো নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ, অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ, নদীশাসন এবং পরামর্শক নিয়োগ। মূল সেতু প্রাকযোগ্যতা নির্ধারণ প্রক্রিয়া ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছিল। এর মধ্য বিশ্বব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ও ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে অযোগ্য বিবেচনা করে বিশ্বব্যাংকের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। ডিজাইনের আংশিক পরিবর্তন হওয়ায় বিশ্বব্যাংক ফের দরপত্র আহ্বানের পরামর্শ দেয়। সে অনুযায়ী কার্যক্রম শেষে দেখা যায়, আগের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই ফের দরপত্রের জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়।

এ প্রক্রিয়া চলাকালে অযোগ্য বিবেচিত প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানির প্রাকযোগ্যতা দরপত্র বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পুনর্বিবেচনার পরামর্শ থাকায় মূল্যায়ন কমিটি অনুরোধটি আমলে নিয়ে পরপর দুবার প্রতিষ্ঠানটিকে সুযোগ দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সক্ষমতা নির্ধারণে প্রকৌশলীদের যে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বিবরণ দিয়েছিল; তা যাচাইকালে ভুল ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে অনুমিত হয়। সেতু নির্মাণে অভিজ্ঞতার কথা বলে তারা যে দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার ও যন্ত্রপাতির বর্ণনা দিয়েছিল, তার প্রমাণ আদতে তাদের কাছে ছিলই না। সেতু নির্মাণে মূল্যবান উপাদান হ্যামারের যে বর্ণনা তারা দিয়েছিল, তা অন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সান ফ্রান্সিসকোতে ব্যবহার করা হয়েছে মর্মে যাচাইকালে ধরা পড়ে। এ অসামঞ্জস্যতা সম্পর্কে তারা সদুত্তরও দিতে পারেনি বিধায় তাদের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অবশেষে তারা প্রাকযোগ্যতার আবেদন প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাদের স্থানীয় এজেন্ট ভেঞ্চার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের এজেন্সিশিপ বাতিল করে দেয়। এতে রাগান্বিত হয়ে ওই কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট জনৈক ক্যাপ্টেন রেজা সেতু কর্তৃপক্ষকে ‘ভবিষ্যতে খারাপ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে’—এ হুমকি দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

পরবর্তীকালে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী চায়না রেলওয়ে ফিফটিন গ্রুপ করপোরেশনের বরাত দিয়ে এর স্থানীয় এজেন্ট জনৈক হেলাল উদ্দিন দাবি করেন, তাদের মূল প্রতিষ্ঠানে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে সাকো ইন্টারন্যাশনাল নামে বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান তাদের ‘সাইলেন্ট এজেন্ট’ নিয়োগ দেওয়া শর্তে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কথিত চিঠির যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য চায়না রেলওয়ে ফিফটিন ব্যুরো গ্রুপ করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, এ ধরনের কোনো পত্র তারা পাননি এবং হেলাল উদ্দিনের কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো পত্রও প্রেরণ করেননি। হেলাল উদ্দিন জানান, তার কাছে মূল কপি নেই; পত্রটি তিনি মেইলযোগে পেয়েছেন। তবুও তিনি কথিত প্রাপ্ত কপি জমা দেননি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরে বারবার তল্লাশি চালিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, প্রিন্সিপাল অর্থাৎ চায়না রেলওয়ে ফিফটিন ব্যুরো গ্রুপ করপোরেশন পত্রের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এবং বিস্মিত হয়। পত্রের কপি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সৃজিত প্যাডে স্বাক্ষর সুপার ইম্পোজ করে পত্রটি তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগের সমর্থনে কোনো দালিলিক বা মৌখিক সাক্ষ্য না থাকায় বিশ্বব্যাংকের আনা প্রথম অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।

এ অধ্যায় শেষ হতে না হতেই বিশ্বব্যাংক থেকে অভিযোগ করা হয়, পরামর্শক নিয়োগ পক্রিয়ায় দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে এটি একটি অভিনব অভিযোগ। কেননা দুর্নীতির জন্য কখনো ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিতে হয় না।

উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাংকের সন্তুষ্টির স্বার্থে দুদক যখন এটা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়; ঠিক তখনই বিশ্বব্যাংক জানায়, তাদের একটি তদন্ত দল দুদক তদন্ত দলের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করতে চায়। কিন্তু বিদেশের কোনো তদন্ত সংস্থার সঙ্গে দুদকের কাজ করার সুযোগ আইনত না থাকায় আমরা অপারগতা প্রকাশ করি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক দুদককে লজিস্টিক, প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে সহায়তার কথা জানায়। দুদক এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর লুইস মোরেনো ওকাম্পো, যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান ও হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টংকে নিয়ে বিশ্বব্যাংক একটি এক্সপার্ট প্যানেল তৈরি করে।

বিশ্বব্যাংকের ওই তদন্ত দল ঢাকায় আসার প্রাক্কালেই তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পক্ষ থেকে আমাকে একদিন তার বাসায় সৌজন্য সাক্ষাতের কথা বলা হয়। আমি বিষয়বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞাত থেকেই সময়মতো সেখানে পৌঁছলে অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গওহর রিজভী আমাকে স্বাগত জানান। আলোচনাকালে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের বিষয়ে তার নেতিবাচক ধারণার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বব্যাংক ও দাতা সংস্থার অর্থ ছাড়া এ সেতু বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি এও বলেন, দুদক বিশেষত আমি সহায়তা করলে বিশ্বব্যাংক ও দাতাগোষ্ঠীদের কাছ থেকে পুনঃঅর্থ পাওয়া সম্ভব; সংস্থাগুলো তাকে এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উপদেষ্টা গওহর রিজভী জানান, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বৈরী শক্তিকে পুনঃঅর্থায়নের জন্য রাজি করাতে সক্ষম হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে দুদককে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আমি ওই কার্যক্রম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে মন্ত্রী স্পষ্টতই বলেন, বিশ্বব্যাংকের টিম আসার আগেই সদ্য বিদায়ী মন্ত্রী আবুল হোসেনকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিয়ে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন করাতে হবে। এ সময় আরও দু-একজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলে তিনি উল্লেখ করেন, এরই মধ্যে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক চায় আবুল হোসেনের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার পাশাপাশি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অভিযান চালাতে হবে এবং এমএলএআর ভিত্তিতে তার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা স্থানান্তরের গতিবিধি জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে চার মাসের ছুটিতে পাঠানোর জন্য সরকারকে অনুরোধ করতে হবে। কেননা তিনি দায়িত্ব পালনরত থাকলে তদন্তে তা প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ থাকবে। আমি বিস্মিত হয়ে বলি, দুদকের সামনে এই মুহূর্তে এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই, আইনেরও কোনো ভিত্তি নেই; যার ওপর নির্ভর করে এই কার্যক্রম চালাতে পারি। তখন তারা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, সহজেই পুনঃঅর্থায়নের পথ বন্ধ হোক কিংবা পদ্মা সেতু নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হোক—আপনি কি সেটা চান? আমি উত্তরে বলি, ‘বেআইনি কোনো কাজে শুধু বিশ্বব্যাংকের অযাচিত অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া আমার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’ আমার আরও দুজন সহকর্মী আছেন, তাদের সঙ্গে আপনারা পরামর্শ করতে পারেন। তারা বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে এরই মধ্যে পরামর্শ করেছি।’ আমি উত্তরে বলি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের যে ঘোষণা দিয়েছেন; আমি তার সঙ্গে একমত। অপমানিত হয়ে কোনো দাতা সংস্থার কাছে অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আমি অংশীদার হতে পারি না। আমার এ অপারগতার কারণে তারা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বলে মনে হয়। এরই মধ্যে মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নের ক্রমানুসারে এসএনসি-লাভালিন, কানাডা প্রথম; হেলকো গ্রুপ, ইউকে দ্বিতীয়; হাইপয়েন্ট রেন্ডার, ইউকে তৃতীয়; একোমনিউজিল্যান্ড চতুর্থ এবং ওরিয়েন্ডেট কনসালট্যান্ট পঞ্চম স্থানে নির্ধারিত হয়। ১০০ নম্বরের মধ্যে ০.০২৫ নম্বর বেশি পেয়ে কানাডার কোম্পানি এসএনসি লাভালিন প্রথম থাকায় মূল্যায়ন কমিটি তাদের কার্যাদেশের সুপারিশ করে। কিন্তু দুদক টিম জানতে পারে, বিশ্বব্যাংক এ কোম্পানিকে কাজের বিষয়ে সম্মতি দেয়নি। এখানে বলে রাখা দরকার, মূল্যায়ন কমিটিতে বিশ্বব্যাংকের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ড. দাউদ নামের ওই ব্যক্তি ছিলেন প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিস্ট। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানান, পরামর্শক হিসেবে এসএনসি-লাভালিনকে নির্বাচন বিশ্বব্যাংকের বিদ্যমান নীতিমালার আলোকেই করা হয়েছে। এরই মধ্যে তথ্য পাওয়া যায়, এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে কানাডার অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিসে বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ঘুষ প্রদানের ইচ্ছেপোষণ ও কার্যাদেশ পাওয়ার জন্য পৃথক অর্থ বরাদ্দ রাখার অভিযোগে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেখানে এসএনসি-লাভালিনের দুই কর্মকর্তা যথাক্রমে বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত ইসমাইল ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত রমেশের ঘুষ গ্রহণের ইচ্ছেপোষণমূলক অনৈতিক কাজের সাক্ষ্য পাওয়া গেছে। তথ্যে আরও বলা হয়, রমেশ সাহার কাছে একটি ডায়েরি পাওয়া গেছে, যেখানে বাংলাদেশের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও পদ্মা সেতু প্রজেক্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজনসহ আরও কিছু ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের প্রভাবিত করতে অর্থ খরচের অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়। আমরা বিশ্বব্যাংককে রমেশ সাহা এবং তার ডায়েরি ও সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রেরণের অনুরোধ করি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক পত্রের উত্তর না দিয়ে একটি রেফারেল রিপোর্ট পাঠায়, যেখানে বর্ণিত বক্তব্যসমূহের সমর্থনে সাক্ষ্যের অভাব ছিল। আমরা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট তথা এমএলএআর পদ্ধতিতে কানাডা সরকারের মাধ্যমে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ ও কানাডিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের কাছে তথ্য চাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা আমাদের কাছে তথ্য পাঠায়নি। এমন অবস্থায় লুইস ওকাম্পোর নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের একটি এক্সপার্ট টিম বাংলাদেশে আসে এবং আমাদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হয়। আলোচনাকালে পরবর্তীকালে তথ্য দেবে মর্মে গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। তারা বলেন, সাকো কোম্পানির অ্যাকাউন্ট জব্দ করে এমএলএআরের মাধ্যমে তথ্য জানতে চাইলে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে বিদেশের বিভিন্ন স্থানে যথা লন্ডন, কানাডা, আমেরিকাসহ আরও অন্যান্য দেশে অর্থ স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া যাবে। তাদের বিশ্বাস, এ অর্থ বিদেশে লেনদেন হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আনা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া এসব বিষয়ে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয় বলে জানালে বিশ্বব্যাংকের এক্সপার্ট টিম ক্ষিপ্ত হয়ে সভাস্থল ত্যাগ করতে উদ্যত হয়। পরে অনুরোধ করে তাদের নিবৃত্ত করা হয়। আমাদের অনুরোধে তারা কথা দেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা রমেশ সাহার ডায়েরিসহ পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে ফের মিলিত হবেন। আমরা নিজ উদ্যোগে কানাডিয়ান রয়েল মাউন্টেড পুলিশের কাছ থেকে কোনো প্রমাণ/নোটপ্যাড সংগ্রহ করতে না পারায় তৎকালীন মুখ্য আইন উপদেষ্টা আনিসুল হক ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য কানাডায় পাঠাই। প্রথমবার কোনো তথ্য না পেলেও দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিস থেকে সংগৃহীত সাক্ষ্যের ট্রান্সক্রিপ্ট পর্যালোচনা করে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি; যাতে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতি বা ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। দুদকের অনুসন্ধান দলের প্রাপ্ত তথ্য গোপনে রাখা অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের এক্সপার্ট টিম ফের বাংলাদেশে আসে এবং দুদকের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হয়। দুদিনব্যাপী আলোচনার প্রথম দিনে নৈশভোজ চলাকালে লুইস ওকাম্পো ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈরী সম্পর্ক কেন—তাও জিজ্ঞেস করেন ওকাম্পো। এ কথাও বলেন, এ বৈরিতা নিরসন হলে সব জটিলতার অবসান হবে বলে তার বিশ্বাস। আমি তাকে জানাই, নির্ধারিত বয়স উত্তীর্ণ হওয়ায় এবং আইনের বিধানমতো যোগ্য না হওয়ায় তাকে পদ ছাড়তে হয়েছে। ড. ইউনূস উচ্চ আদালতে প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। উপরন্তু তিনি বয়স পার হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল এমডি পদে বহাল ছিলেন। এ কথা বলার পর ওকাম্পো স্তম্ভিত হন এবং এ বিষয়ে আর কথা বাড়াননি।

তার সঙ্গে কথোপকথনে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিলে ও কথিত দুর্নীতি অভিযোগ উত্থাপনে ড. ইউনূসের ভূমিকা রয়েছে বলে অনুমিত হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ থেকে বিশ্বব্যাংকের কাছে পাঠানো কয়েকটি ইমেইল; যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংক বিষয়বস্তু প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে পাঠায়। সেই ইমেইলের সেন্ডার নামটি ঘষামাজা করে দেয় বিশ্বব্যাংক। ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত আছে এবং এখানে অর্থায়ন করা সংগত হবে না’—ইমেইল পর্যালোচনা করে এমন তথ্যই পাওয়া যায়। বিশ্বব্যাংকের কাছে ইমেইলসমূহ যে ড. ইউনূসই পাঠিয়েছেন, ওকাম্পোর কথা ও উপরোক্ত ঘটনাগুলো সেটাই সমর্থন করে।

এর আগে অবশ্য দুদকের গোয়েন্দা কাজে নিয়োজিত দুজন কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে আমরা জানতে পারি, আমাদের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনে মিলিত হওয়ার আগে তারা স্থানীয় প্রতিনিধি গোল্ড স্ট্যানের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের কতিপয় ব্যক্তির সঙ্গে হোটেল ওয়েস্টিনে বসেছিলেন। সেখানে সুশীল সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি তথা আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলোর মতিউর রহমান, আইনজীবী ব্যারিস্টার মঞ্জুর হোসেনসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন এবং তারা এক্সপার্ট টিমকে ব্রিফ করেছিলেন বলে জানা যায়। তাদের আলোচনায় আমি আইনের যুক্তি উত্থাপন করলে এবং দুদকের তৎকালীন মুখ্য আইন উপদেষ্টা আনিসুল হক সমর্থন করায় লুইস ওকাম্পো আমাকে ও আনিসুল হককে রূঢ় ভাষায় আক্রমণ করেন এবং ক্ষিপ্ত হন।

যাই হোক, দ্বিতীয় দিনের আলোচনা শেষে বিশ্বব্যাংকের টিম ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার কথা জানিয়ে সভা ত্যাগ করে এবং পরে বাংলাদেশ ছাড়ে। তার পরও আমরা দীর্ঘসময় তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করি। অবশেষে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ পর্যালোচনাপূর্বক তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনায় আর কোনো উপাদান না পাওয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করে আদালতে প্রতিবেদন পাঠাই। স্বচ্ছতার সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম শেষে ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, যা আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়। দুদকের তদন্তে বিশ্বব্যাংকের সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার প্রতিবেদন দাখিলে প্রায় এক বছর পর দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে ফলাফলের সঙ্গে একমত হয়ে কানাডার অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিজ একই বিষয়ে তাদের কাছে প্রেরিত অভিযোগে রায় প্রদান করেন। রায়ে তারা সুস্পষ্টভাবে জানান যে, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগটি ছিল অসত্য এবং নেহায়েত গালগল্প ভিন্ন অন্য কিছু নয়। ওই আদালতও মামলাটি খারিজ করে দেয়। পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহের বিচার-বিশ্লেষণে এবং বিশ্বব্যাংকের সাক্ষ্যপ্রমাণ দাখিলে ব্যর্থতার কারণে এটা সহজেই অনুমিত হয় যে, তথাকথিত ঘুষ লেনদেনে অভিপ্রায় সংবলিত অদৃশ্য নোটপ্যাড, সাইলেন্ট এজেন্ট নিয়োগের পত্র প্রেরণসহ সবকিছুই ছিল সৃজিত, মনগড়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত; এর পেছনে ছিল অশুভ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আজ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং দৃঢ়প্রত্যয়ী সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী তার অঙ্গীকার ও ঘোষণা অনুযায়ী দাতাগোষ্ঠীর সহায়তা ব্যতীত সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে বিশ্বে বাংলাদেশকে মর্যাদার উচ্চতর আসনে আসীন করেছেন।

লেখক: মহামান্য রাষ্ট্রপতি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

দিনবদলবিডি/Rabiul

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়