৭ নভেম্বর এবং বগদানফ সায়েবদের কীর্তি

দিনবদলবিডি ডেস্ক || দিন বদল বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ সকাল ০৯:৫০, সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০২২, ২২ কার্তিক ১৪২৯
ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

শিক্ষক বগদানফ সাহেব ছিলেন যেন কুসংষ্কারের এক চলন্ত বিশ্বকোষ। তিনি দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো ঘটনার নেতিবাচক ফলাফলের আশংকায় নিজে ভীতসন্ত্রস্ত থাকতেন এবং আশপাশের মানুষজনকে সন্ত্রস্ত-আতঙ্কিত করে তুলতে মরিয়া হয়ে উঠতেন।

হয়তো কেউ হেঁটে যাওয়ার সময় তার সামনের রাস্তা দিয়ে কালো বিড়াল দৌড়ে পার হয়েছে এবং এই দৃশ্য বগদানফ সায়েবের চোখে পড়েছে, তো আর নিস্তার নেই। সেই ব্যক্তিকে তার ভষিষ্যত অমঙ্গল নিয়ে নানান আশংকা আর ভীতিজনক গল্পে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তিনি।

কিংবা ধরুন কেউ নিজের বাঁ দিকে ঘাড় ফেরাতে গিয়ে পিছনের আকাশে চাঁদ দেখেছেন- বগদানফ সায়েবের মতে এটা গোখরোর ফণায় পা দেয়ার মতো ভয়ঙ্কর। সেই ‘দুর্ঘটনার’ তিন মাস পরেও যদি লোকটির পোষা বেড়াল বমি করে, তবে সেই বাঁ কাঁধের উপর দিয়ে অপয়া চাঁদ দেখাকেই তার জন্য দায়ী করবেন বগদানফ।

মইয়ের তলা দিয়ে গিয়েছেন, হাত থেকে পড়ে আয়না ভেঙে গিয়েছে, চাবির গোছা ভুলে ঘরের মেঝেতে ওপর রেখেছিলেন— ব্যস, ঘটনা ঘটে গেছে বগদানফের দৃষ্টিতে।

খবর পেলে সেই রাত্রেই বগদানফ সাহেব আপনার জন্য এক ঘণ্টা ধরে নানা মন্ত্র পড়বেন, চার্চের তাবৎ সেন্টদের কাছে কান্নাকাটি করে ধন্না দেবেন, পরদিন ভোরবেলা এসে আপনার চোখেমুখে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দিয়ে তিন বৎসর ধরে অপেক্ষা করবেন- আপনার কাছ থেকে কোনো দুঃসংবাদ পাবার জন্য।

তিন বছর দীর্ঘ একটা সময়, কিছু-না কিছু একটা তো ঘটবেই মানব জীবনে। এবং সেই ‘দুর্ঘটনার’ খবর পাওয়ামাত্র বাড়িতে ছুটে এসে বগদানফ সায়েব আপনার সামনে মাথা নিচু করে শোকাতুর মুখে বসে থাকবেন। এসময় তার মুখে থাকবে ঐ এক কথা- বলিনি?! আমি তো আগেই বলেছিলাম এরকম কিছু একটা ঘটবে!

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাসের পরতে পরতে, আমাদের নানান সাফল্যের উৎসবকে বিষাদের তারপুলিনে ঢেকে দিতে প্রফেসর বগদানফ সাহেবের মতো কিছু অস্তিত্ব, চরিত্র দেশ-বিদেশে সদা সক্রিয় থাকে। বগদানফ সাহেব পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু একদিকে অগাধ পাণ্ডিত্য, অন্যদিকে কুসংস্কারে ভর্তি। এই কুসংস্কারই হরেক বিপদের আধার। বাঙালির জাতশত্রু হানাদার পাকিস্তানিদের দোসররা আমাদের সব সাফল্যে সব অর্জনে দেখতে পান অমানিশার অন্ধকার। আর তাই এইসব কুসংস্কারজীবীরা পাকায় ঘড়যন্ত্র। সেইসব ঘড়যন্ত্র জন্ম দেয় ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর, ৭ নভেম্বর, ২১ আগস্ট।

শেখ সাহেব যা-ই ভালো কিছু করতেন তার পেছনে খুঁত ধরার জন্য, তার চরম অশুভ পরিণতি দেখার জন্য একদল লোক নির্ঘুম রাত পার করতো। বগদানফ সায়েব কুসংস্কার আক্রান্ত হলেও ছিলেন পরহিতাকাঙ্খী। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমলে এবং এখন পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা-সমৃদ্ধি- সাফল্যে বুক-চোখ জ্বালাপোড়া করা বগদানফরা মোটেই পরহিতাকাঙ্খী নন। তারা কায়মনোবাক্যে কামনা করেন আমাদের সর্বনাশ, ধ্বংস।

কিন্তু যখনি তাদের কুবাসনার ১৫ আগস্টের অমানিশা কাটিয়ে ওঠার আলোকরেখা জেগে উঠতে দেখা যায়, তখনি ৩ নভেম্বর জেলখানার সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠে হানা দিয়ে জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার মাধ্যমে তারা বাঙালির আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিতে তৎপর হয়।

এরপরও ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না। ৩ নভেম্বর কুখ্যাত জেলহত্যাকাণ্ডের কয়েকদিনের মাথায় যখন দেশ্রপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিকরা আবারো জাতীয় স্বার্থ-স্বাধীনতাকে বাঙালির অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মানসে কিছু একটা করতে তৎপর হয় তখনি মীর জাফর, মিরনদের খঞ্জর ফের রক্তপিপাসু হয়ে উঠে। আর তারই ফলশ্রুতিতে ঘটানো হয় ৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিক হত্যাকাণ্ড। এদিনে হত্যা করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা এবং এটিএম হায়দারসহ আরও কয়েকজন সেনাকর্মকর্তা ও অন্যান্য র‌্যাঙ্কের সদস্যকে।

মুক্তিযোদ্ধা-সৈনিক হত্যাযজ্ঞের জঘন্য এই দিনটিকে ‘সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে একটি পক্ষ। আবার কারো কাছে তা ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’। বাস্তবে এই দেশে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কোনো বিপ্লব সংঘটিত হয়নি। ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব বলা আর যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী, কাদের মোল্লাদের শহীদ বলা সমতুল্য। আসলে হরদম কূটচালে অভ্যস্ত রাজনৈতিক পক্ষগুলো কখনোই ‘বিপ্লব’, ‘শহীদ’, ‘স্বাধীনতা’ এই শব্দগুলোর সঠিক অর্থ অনুধাবন করতে পারেনি এবং করতে চায়ওনা।

তাই তারা পঁচাত্তরের নভেম্বরের শুরুর দিকে দেশের জন্য ঘোর অমানিশার ষড়যন্ত্র চলাকালীন সেই কয়েকটি দিনের চরম পরিণতির দিনটিকে, যেই দিনটিতে দেশকে পঁচাত্তরের খুনিচক্রের রাহুমুক্ত করতে সংশপ্তক পণে আগুয়ান দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের হত্যা করা হয় ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের প্যাঁচ কষে- সেই দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করতে সচেষ্ট।

একটা সময়ে ১৫ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মিথ্যা জন্মদিন পালনের অরুচিকর বিবমিষা জাগানিয়া চণ্ডালবৃত্তি আমাদের দেখতে হয়েছে। জনগণের লাগাতার ধিক্কারে ইদানিং তা স্তিমিত হয়ে এসেছে অনেকটাই। আমরা আশা করি ৭ নভেম্বরের ক্ষেত্রেও তা হবে। একদিন দেশের সব মানুষ অজ্ঞতা, অমানিষয়া আর কুসংস্কারের জাল ছিন্ন করে ঠিকই চিনবে ৭ নভেম্বরের আসল রূপ এবং সেই বাস্তবতার নিরিখেই ৭ নভেম্বর পালিত হবে মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস হিসেবে, উদযাপন হবে না ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ পরিচয়ে। ১৫ আগস্ট বিএনপি নেত্রীর জন্মদিন যেমন মিথ্যা, তেমনি  ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ প্রসঙ্গটিও মিথ্যা- এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হোক।

৭ নভেম্বর যে সংহতি দিবস ছিল না তার সপক্ষে আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে- যে কর্নেল তাহের বন্দিদশা থেকে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন, সেই যুদ্ধাহত শারীরিক প্রতিবন্ধী মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকেও পরবর্তীতে প্রহসনের বিচার নাটকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিল সামরিক জান্তা জিয়া সরকার।

যেহেতু হত্যার রাজনীতির মাধ্যমেই বিএনপির অভ্যুদয়, তারা এদিনটি সেভাবে পালন করেই তৃপ্ত হবে- এটাই স্বাভাবিক। ৭ নভেম্বর তো আসলে জেনারেল জিয়াউর রহমান বহু সৈনিক ও অফিসারের রক্তাক্ত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন- এই সত্য কে কিভাবে অস্বীকার করবেন?
          
রাজনৈতিক অপকর্মজাত ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস, বিভীষিকা, হত্যাযজ্ঞের পেছনে থাকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অপসংষ্কৃতি, রাজনৈতিক কু-সংস্কৃতি তথা কুসংস্কার। এই কুসংস্কারের প্রসঙ্গ এলেই মনে পড়ে যায় সৈয়দ মুজতবা আলীর অমর সৃষ্টি দেশে বিদেশে উল্লেখিত শান্তি নিকেতনের রুশ প্রফেসর বগদানফ সায়েবের কথা।

দুঃখজনক হলো- আমাদের চতুর্দিকে সারাক্ষণ একশ্রেণির লোক সাধারণ মানুষজনকে বিভ্রান্ত করতে বগদানফি কায়দায় কুসংস্কার ছড়াচ্ছে, মিথ্যার বেসাতি প্রচার করছে। তাদের রঙচঙ্গে বায়োস্কোপি মিথ্যায় কখনো চাঁদে দেখা দেয় যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বদন, কখনো ১৫ আগস্ট হয় খালেদা জিয়ার জন্মদিন, কখনো পবিত্র কাবার ইমামসহ বিশ্বের শীর্ষ আলেমরা সাঈদীর মুক্তির জন্য মানবন্ধন করেন, কখনো ৭ নভেম্বর হয়ে যায় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। কিন্তু বাস্তবে দেখা এর সবই মিথ্যাচার, সত্যের অপলাপ, এক ঘটনাকে অন্য ঘটনা হিসেবে প্রচার ও জনগণকে বিশ্বাস করিয়ে হীন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপপ্রয়াস মাত্র।

দিনবদলবিডি/আরএজে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়