‘চাকরিচ্যুত’ মেজর জিয়ার নির্দেশে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ছক

দিনবদলবিডি ডেস্ক || দিন বদল বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ সকাল ০৯:৫০, সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০২২, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে বড় ভাই ওরফে সাগর ওরফে মেজর জিয়া (চাকরিচ্যুত মেজর)। মেজর জিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশের ওপর হামলা করে আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা হয়।

পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেপ্তার দুই জঙ্গি মো. আরাফাত রহমান (২৪) ও মো. আ. সবুর ওরফে রাজ ওরফে সাদ ওরফে সুজন (২১) প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে এ তথ্য জানিয়েছে।

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টায় ২০১২ সালে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত হন মেজর জিয়া। এই অভ্যুত্থান চেষ্টায় জড়িত থাকায় দুই সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হলেও পালিয়ে যান জিয়া। এরপর তিনি যুক্ত হন জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সঙ্গে। বহিষ্কৃত জিয়ার পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ঘটে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। আনসার আল ইসলামের বেশিরভাগ নেতাকর্মী গ্রেফতার হলেও এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি। এরইমধ্যে কয়েকটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ হয়েছে।

ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেসন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সন্ধ্যায় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগের পুলিশ পরিদর্শক জুলহাস উদ্দিন ২০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পলাতক ও অজ্ঞাত আসামিদের গ্রেপ্তারে রাজধানীসহ দেশজুড়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে সাগর ওরফে বড় ভাই ওরফে মেজর জিয়ার (চাকরিচ্যুত মেজর) পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় আয়মান ওরফে মশিউর রহমান (৩৭), সাব্বিরুল হক চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে কনিক (২৪), তানভীর ওরফে সামশেদ মিয়া ওরফে সাইফুল ওরফে তুষার বিশ্বাস (২৬), রিয়াজুল ইসলাম ওরফে রিয়াজ ওরফে সুমন (২৬) ও মো. ওমর ফারুক ওরফে নোমান ওরফে আলী ওরফে সাদ (২৮) পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে।

এ পরিকল্পনার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দুটি মোটরসাইকেলযোগে আনসার আল ইসলামের অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জন সদস্য অবস্থান নেয়। এছাড়াও আদালতের আশপাশে অবস্থান করা অজ্ঞাতনামা আরো ১০/১২ জন আনসার আল ইসলামের সদস্য আদালতের মূল ফটকের সামনে অবস্থান করে। এরপর তারা পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

মামলা এজাহারে আরো বলা হয়, রবিবার সকাল ৮টা ৫ মিনিটে কাশিমপুর থেকে ১২ জন আসামিকে ঢাকার আদালতে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে আসা হয়। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকার প্রসিকিউশন বিভাগে আসামিদের হাজিরা দেওয়ার জন্য সিজেএম আদালত ভবনের সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইবুনাল ৮-এ নিয়ে যাওয়া হয়।

এ মামলার শুনানি শেষে জামিনে থাকা ১৩ নম্বর আসামি মো. ঈদী আমিন (২৭) ও ১৪ নম্বর আসামি মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফি (২৪) আদালত থেকে বের হয়ে যায়।

এরপর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে আদালতের মূল ফটকের সামনে পৌঁছানো মাত্র আগে থেকেই দুটি মোটরসাইকেলযোগে অজ্ঞাতনামা আনসার আল ইসলামের ৫/৬ জন সদস্য, আদালতের আশপাশে অবস্থানরত আনসার আল ইসলামের আরো ১০/১২ জন সদস্য হামলা করে। তারা কনস্টেবল আজাদের হেফাজতে থাকা আসামি মইনুল হাসান শামিম ওরফে সিফাত ওরফে সামির ওরফে ইমরান (২৪), মো. আবু সিদ্দিক সোহেল (৩৪) মো. আরাফাত রহমান (২৪) ও মো. আ. সবুর ওরফে রাজু ওরফে সাদ ওরফে সুজনকে (২১) ছিনিয়ে নিতে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করে।

কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা তাদের কর্মকাণ্ডে বাধা দিলে আসামিদের মধ্যে কোনো একজন তার হাতে থাকা লোহা কাটার যন্ত্র দিয়ে কনস্টেবল আজাদের মুখে আঘাত করে।

সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা যায়

জঙ্গিদের মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার দুটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে বেসরকারি এক গণমাধ্যম। এতে দেখা যায়, ১ নম্বর রঘুনাথ দাস লেনের রায় সাহেব বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে লাল রঙের একটি মোটরসাইকেলে তিনজন পালিয়ে যান। তাদের পিছু পিছু আরো কয়েক যুবক দৌড়াচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের হাতে হেলমেট, দুজনের হাতে ব্যাগ ও দুজন খালি হাতে ছিলেন।

সিসিটিভি ফুটেজ

ছিটানো হয় পিপার স্প্রে

আদালত প্রাঙ্গণে দায়িত্বরত পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, অন্যান্য দিনের মতো আজকেও ডিউটিরত ছিলাম। হঠাৎ পিপার স্প্রে ছিটানোর পরে চারদিকে ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, আদালতের শুনানি শেষে প্রথমে চারজনকে নিচে নামিয়ে আনা হয়। দুটি হাতকড়া দিয়ে দুজনকে আটকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাকি আসামিরা তখন উপরে ছিল।

তিনি বলেন, চারজনের মধ্যে মইনুল হাসান ও আবু সিদ্দিককে জঙ্গিরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তবে মো. আরাফাত ও মো. সবুজকে নিতে পারেনি।

আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

জঙ্গিদের আদালতে আনার দিন নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. গোলাম ছারোয়ার খান জাকির।

আদালতের নিরাপত্তার ঘাটতি আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে পারবে। তবে অবশ্যই নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার হওয়া উচিত ছিল। তাদের কীভাবে নামিয়ে আনা হয়েছিল তা জানি না।

আদালত এলাকা পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়েছি। আমাদের ডিবির প্রত্যেকটা টিম কাজ করছে। আশা করছি তাদের (পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি) দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারবো।

‘জঙ্গিরা বিভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করে। এবার তারা নতুন একটি কৌশল নিয়েছে। আমরা শুনেছি আদালতের গেটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের চোখে স্প্রে করে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়েছে অপর জঙ্গিরা। চোখে স্প্রে করার কারণে দায়িত্বরতরা কিছু দেখতে পারেননি।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।

কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা

আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

তিনি বলেন, বিচারের মাধ্যমে দুই জঙ্গির ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ দুজন নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য। তাদের আনা হয়েছিল, কোর্ট হাজতে তাদের রাখা হয়েছে, তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে প্রডিউস করার পর আবার নির্দিষ্ট রুমে নিয়ে যাচ্ছিল। তখন আমরা জানলাম যে পুলিশরা তাদের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের ওপর কেমিক্যাল ছুড়ে, অজ্ঞান করে কয়েকজন তাদের সমর্থকদের নিয়ে পালিয়ে যায়।

তিনি বলেন, ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা রেড অ্যালার্ট জারি করেছি। আমাদের পুলিশ তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে, তাদের খুব শিগগির ধরতে পারবো বলে আমরা বিশ্বাস করছি। আমরা বর্ডার এলাকাগুলোতেও বলে দিয়েছি, তারা যেন দেশ থেকে পালিয়ে যেতে না পারে।

‘এ ঘটনাটি দুঃখজনক। আমরা মনে করি যদি কারও অবহেলা থাকে, যদি কারও গাফিলতি থাকে যদি কেউ ইচ্ছা করে এ কাজটি ঘটিয়ে থাকেন, তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করবো।’

আসাদুজ্জামান খান বলেন, এটা নিয়ে নিশ্চয়ই আমরা তদন্ত কমিটি করবো। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। সচিব, কারা মহাপরিদর্শক, ডিএমপি কমিশনার সবাই এটা নিয়ে মিটিং করছেন। আমরা খুব সহসাই পরবর্তী নির্দেশনা জানাবো।

রাজধানীতে রেড অ্যালার্ট

আদালত থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া দুই জঙ্গিকে গ্রেফতারে রাজধানীতে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রাজধানীর প্রতিটি থানা ও অন্যান্য ইউনিটকে চেকপোস্ট বসানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ধরিয়ে দিলে পুরস্কার ২০ লাখ

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির ও মো. আবু ছিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিবকে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ লাখ টাকা পুস্কারের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি, প্রতিবেদন তিনদিনের মধ্যে

দুই জঙ্গি পালানোর ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারকে সভাপতি করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার (২০ নভেম্বর) ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক স্বাক্ষরিত এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটির সভাপতি হলেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম আ্যন্ড অপস) এ কে এম হাফিজ আক্তার।

কমিটির সদস্যরা হলেন ডিএমপির যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার (অপারেশনস), যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি), লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ও ডিএমপির সিআরও’র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পলাতকদের দ্রুত গ্রেপ্তারের আশা ডিএমপির

রবিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, পুলিশের চোখে স্প্রে মেরে ঢাকা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের গেট থেকে দুই আসামিকে কারা ছিনিয়ে নিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে তথ্য পেয়েছি। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব।

সূত্র: জাগো নিউজ

দিনবদলবিডি/আরএজে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়