বুধবার

০২ ডিসেম্বর ২০২০


১৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭,

১৬ রবিউস সানি ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

আমি তার মৃত্যুদণ্ড চাই: ডোম শ্যামল

নিজস্ব প্রতিবেদক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৩:১৪, ২১ নভেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:৫৮, ২১ নভেম্বর ২০২০
আমি তার মৃত্যুদণ্ড চাই: ডোম শ্যামল

লাশ কাটা ঘরের (মর্গ) সহকারী মুন্না ভগত

ডোম মুন্নার পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে শিউরে উঠেছে মানুষের বিবেক। তার নারকীয় ঘটনায় হতভম্ব খোদ ডোম সম্প্রদায়ও।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশ কাটা ঘরের (মর্গ) সহকারী মুন্না ভগত গত এক বছরে ৬ জন মৃত নারীকে ধর্ষণ করেছে। 

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে এই ডোমকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

এ ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারী সেকান্দর আলী ও স্যার সলিমুল্ল্যাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারী (ডোম) শ্যামল জানান, এটি একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এই জঘন্য ঘটনার জন্য মুন্নাকে ফাঁসিতে ঝুলে মারার দাবি করেছেন তারা। 

তারা বলেন, দেশ স্বাধীনের পর থেকে মর্গে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে নাই। ময়না তদন্তের জন্য যেসব নারীর মরদেহ মর্গে রাখা হতো তাদের স্বজনরা মর্গের লোকজনদের ওপর বিশ্বাস করে আসছিলেন। মুন্না যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার কারণে মরদেহের স্বজনরা এখন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে।

ঢামেক হাসপাতালের মর্গ সহকারী সেকান্দর আলী বলেন, ‘আমি ৩০/৩৫ বছর যাবত হাজার হাজার লাশ কাটাকাটির কাজ করে আসছি। কিন্তু কোনোদিন এ ধরণের কর্মকাণ্ড আমার মধ্যে কোনোক্রমে প্রকাশ পায়নি। এই ধরণের মনমানসিকতাও আমার ভেতরে কোনো সময় আসেনি। নারীদের ময়না তদন্তের জন্য কয়েক দফা নারী ডাক্তার সরকারিভাবে নিয়োগ দিলেও কিছুদিন কাজ করার পর তারা আর কাজ করতে রাজি হয় না। কারণ মর্গের দুর্গন্ধ তাদের কাছে সহ্য হয় না। আমরা অনেকবার কতৃপক্ষের কাছে মৌখিকভাবে নারীদের ময়নাতদন্তের জন্য নারী ডাক্তার ও নারী ডোম চেয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা সমাধান করেনি কতৃপক্ষ। ফরেনসিক বিভাগে যে কয়জন নারী ডাক্তার রয়েছেন তারা ময়নাতদন্ত করতে আসেন না। উনারা শুধু নির্যাতিত বা ধর্ষণ রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন।’

এ ব্যাপারে মিটফোর্ড হাসপাতালের ডোম শ্যামল বলেন, ‘মুন্না যে কাজটি করেছে তা ন্যাক্কারজনক। আমি তার মৃত্যুদণ্ড চাই। আমি শত শত লাশ কাটাকাটি করে আসছি। কোনোদিন এ ধরনের কর্মকাণ্ড মনের ভেতরে আসেনি। তার (মুন্না) জন্য এখন আমাদের মান-সম্মান নিয়ে টানাটানির মধ্যেপড়েছি। রাজধানীর তিনটি সরকারি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়। সেগুলোতে নারী ডাক্তার ও নারী ডোম নেই। উল্লেখ্য, ছয় নারীর এইচভিএসে (হাই ভ্যাজাইনাল সোয়াব) মুন্নার ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। লাশগুলো আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃতদের ছিল। ১২ থেকে ২০ বছর বয়সের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থায় থাকা লাশ এলেই মুন্না ধর্ষণ করতো বলে সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

কর্মকর্তারা বলেন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের ডোম সহকারী হিসেবে প্রায় ৪ বছর ধরে কাজ করছে মুন্না। শুরু থেকে মর্গেই থাকে সে। ময়নাতদন্তের আগে লাশ রাতে পাহারা দেওয়ার সময় এই কাজে লিপ্ত হতো সে। সিআইডি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মুন্না তার এসব অপকর্মের কথা স্বীকার করেছে।

২০১২ সালে বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে প্রথম ডিএনএ ল্যাব স্থাপিত হয়। ল্যাব স্থাপনের পর হতে ধর্ষণ ও হত্যাসহ আদালতের নির্দেশে প্রেরিত সব আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা ও প্রোফাইল তৈরি করে সিআইডি। গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ কয়েকটি নমুনা পাঠিয়েছিল সিআইডিকে। সেখানে মৃত নারীর এইচভিএসে পুরুষ বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করার চেষ্টা করে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘কোডিস (CODIS) সফটওয়্যার আমরা সার্চ দিয়ে দেখি মোহাম্মদপুর ও কাফরুল থানার কয়েকটি ঘটনায় প্রাপ্ত ডিএনএ’র প্রোফাইলের সঙ্গে একই ব্যক্তির ডিএনএ বারবার ম্যাচ করছে। যেটা অনেকটাই অস্বাভাবিক ছিল। ধারণা করা হয়, একজন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা অথবা ধর্ষণজনিত কারণে আত্মহত্যা হয়েছে। কিন্তু মরদেহগুলোতে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না।’

সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তখন মনে করি, কোনো না কোনোভাবে ভিকটিমদের মৃতদেহের ওপরে কোনো ব্যক্তির বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ হয়েছে। প্রতিটি মৃতদেহ মর্গে আনার পর তার মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ বিশ্লেষণ করা হয়। সব লাশই ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রেখে দেওয়া হয়। সেখানে বেশ কয়েকজন ডোম নিয়মিত পাহারা দিত। কিন্তু এই লাশগুলোর ক্ষেত্রে একজন ডোম সহকারী নিয়মিত ডিউটিতে থাকতো। প্রাথমিকভাবে তাকে সন্দেহ হয় আমাদের। পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বাইরে নিয়ে গিয়ে কথা বলার নামে, চা খাওয়ার ছলে তার ডিএনএ সংগ্রহ করি আমরা। সেটা সিআইডি ল্যাবে নিয়ে বিশ্লেষণ করলে ওই ৬ মরদেহে পাওয়া ডিএনএ’র সঙ্গে ম্যাচ করে। তখন শতভাগ নিশ্চিত হয়ে তাকে গ্রেফতারে অভিযান চালাযনো হয়। বিষয়টি আসামি বুঝতে পেরে গাঢাকা দেয়।’

এরপর শুক্রবার (২০ নভেম্বর) সিআইডি সদর দফতর থেকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ৬ মৃত নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গের ডোম সহকারী মুন্নাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মুন্নার ডিএনএ প্রোফাইল মিলে যাওয়ায় মৃতদেহের ওপর সে যে বিকৃত যৌনাচার করেছে সেটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ হয়েছে।

ব্রিফিংয়ে সিআইডি জানায়, আসামিকে আদালতে পাঠিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে।

দিনবদল বিডি/এজি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়