মঙ্গলবার

০৯ মার্চ ২০২১


২৪ ফাল্গুন ১৪২৭,

২৪ রজব ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

ফেব্রুয়ারি এলেই মাতৃভাষার জন্য মৌসুমী আহাজারি এবং...

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:২৯, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ২২:২৯, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
ফেব্রুয়ারি এলেই মাতৃভাষার জন্য মৌসুমী আহাজারি এবং...

ভাষার মাস চলছে। সহজেই বলে ফেলা গেলো- ভাষার মাস। ‘ভাষার মাস’ কথাটির মধ্য দিয়ে আমরা একটা সময়, সেই সময়ের ভেতর দিয়ে একটা দীর্ঘ সময়ের সংগ্রামের ইতিহাসকে অনুভব করি। অনুভব যদি নাও করতে পারি, অন্তত বোঝাতে চেষ্টা করি। এই ভাষার মাসকে সম্মান জানাতে হাইকোর্ট গতকাল (বুধবার) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলার রায় বাংলায় প্রদান করেছে। 

বিচারিক আদালতের দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ১০ জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার রায় হাইকোর্ট বাংলায় ঘোষণা করেছে। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি বদরুজ্জামান সমন্বয়ে গঠিত একটি ভার্চুয়াল হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিকে সম্মান জানাতে বাংলায় এই রায় ঘোষণা করেন। 

রায়টি নিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. বশির উল্লাহ বলেন, ‘আজ (বুধবার) হাইকোর্ট গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় রায় ঘোষণা করেন। রায়টি সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করেছেন আদালত। যেহেতু আমাদের গৌরবের ভাষা আন্দোলনের মাস চলছে তাই ভাষার মাসের প্রতি সম্মান জানাতে আদালত এ মামলার রায় বাংলাতে ঘোষণা করেছেন।’

বাংলায় রায় প্রদান এই প্রথম নয়। এর আগেও বহু রায় বাংলায় লেখা হয়েছে। বাংলাদেশের আদালতে সর্ব প্রথম বাংলায় রায় দেয়া শুরু করেন প্রয়াত বিচারপতি এ আর এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সর্বপ্রথম হাইকোর্টে বাংলায় আদেশ দেওয়া শুরু করেন তিনি। এরপর সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি হামিদুল হক, বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দেন। বিচারপতি খায়রুল হক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ, চার নদী সংরক্ষণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বাংলা দেন।

বাংলায় রায় দেওয়াটা কি শুধুই ভাষা প্রেম? বাংলা ব্যবহারে কেনইবা এত অনীহা? এসব প্রশ্ন আসতেই পারে। যেখানে আমাদের আইন-আদালতের খোলনলেচের বহুলাংশই ব্রিটিশ আমলের করা। এমন কি এখনো কোর্ট প্রায় ব্রিটিশ পদ্ধতিতেই চলে। তবে প্রকৃতপক্ষে শুধু বাচনিক ভাষাপ্রেমই নয়, বরং আমাদের প্রয়োজন এর ব্যবহারিক প্রয়োগ। আদালতে রায় বাংলায় হলে ফরিয়াদি-আসামি তথা দেশের সবাই সহজেই বুঝতে পারবেন রায়ের আদ্যোপান্ত।

এদিকে আজ (বৃহস্পতিবার) সাইনবোর্ড, নামফলকে বাংলা লেখা নিশ্চিত করতে ডিএনসিসি (ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন) ৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছে। এসময় প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে ও নির্দেশনা দেয় ডিএনসিসি। তাছাড়া বেশ কিছু সাইনবোর্ড অপসারণও করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ব্যাংকের প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভবন ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড অপসারণ করে বাংলা ভাষায় প্রতিস্থাপন করার জন্য ৭ দিন সময় দেওয়া হয়। বাংলাদশের প্রায় কোনো ব্যাংকই বাংলায় সাইনবোর্ড লেখতে আগ্রহী বলে মনে হয় না। 

বাংলাদেশে হাইকোর্টের নির্দেশ রয়েছে সাইনবোর্ডগুলো বাংলায় করার। এক রিট পিটিশনে হাইকোর্ট প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী সকল প্রতিষ্ঠানের (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) নামফলক, সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার ইত্যাদি বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে হাইকোর্টের আদেশটি ডিএনসিসি এলাকায় বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব ডিএনসিসিকে প্রদান করা হয়। এছাড়া ডিএনসিসি থেকে দেওয়া ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় ট্রেড লাইসেন্স বইয়ের মধ্যে ‘সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা বাধ্যতামূলক’ কথাটি সংযুক্তকরণেরও শর্ত দেওয়া হয়। 

এমন রায় থাকার পরও কেন সাইন বোর্ড বাংলায় লেখা হয় না? এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। রয়েছে ক্ষমতা ও ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত ঔপনিবেশিক উচ্চম্মন্যতা বা হীনম্মন্যতা। এই জারজসুলভ মানসিকতার ফলে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তথাকথিত উচ্চ শ্রেণির কোনো কিছু বাংলায় লেখা দেখতে পাওয়া বেশ একটা দুরূহ ব্যাপার বটে।  

আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার কথা বলি। সেটি আজ থেকে নয়, একদম বাংলাদেশ জন্মের পর থেকেই। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গেই যেখানে ভাষা আন্দোলন সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িত সেখানে সর্বস্তরে বাংলাভাষা বিকাশের জন্য আমরা কি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছি? আদালতে এখনো বাংলায় রায় হলে সেটি ‘সংবাদ’ হয়ে যায়। ফলে বলা বাহুল্য, দরদ থাকলেও আমরা এখনো বাংলাকে ব্যবহারিক জায়গায় খুব ভালো অবস্থান দিতে পারিনি। 

একটি ভাষা মানুষ আয়ত্ত করে প্রয়োজন থেকে। আধুনিক সমাজে মানুষের প্রয়োজন জটিল জালে বিস্তৃত। মোঘল আমলে ‘শিক্ষিত’ লোক বলতে তাদেরই বোঝাতো যারা ফার্সি জানতেন, বৃটিশ আমলে শিক্ষিত শ্রেণি হিসেবে হাজির হলো ইংরেজি জানা লোকেরা। এই শিক্ষাটাও তাহলে সরল নয়, বরং ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কলকব্জার সঙ্গে যুক্ত। একটি দেশে ব্যবহারিক বিবেচনায় সেই ভাষাই প্রধান ভাষা যেটির মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাজ পরিচালনা করা হয়। আর একই সঙ্গে অর্থ ও ক্ষমতাযোগ থাকলেই একটি ভাষা মানুষ আয়ত্ত করে। নির্মম হলেও সত্যি, আমরা এখনো বহুলাংশে অনাহুতভাবে ব্রিটিশ সিলসিলা বহন করছি। ফলে এখানে ক্ষমতার ভাষা বা অভিজাতের (এলিট) ভাষা বাংলা না। সেই ভাষা উপনিবেশি ভাষা। মাতৃভাষার ওপর অন্য ভাষার এই দৃষ্টিকটু বাহাদুরি কমতে পারে শুধুমাত্র সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার চালুর মধ্য দিয়ে। ফলে ‘বাংলা চালু কর’ চাওয়াটা নিতান্ত সাধারণ চাওয়া নয়। এটি একটি রাজনৈতিক চাওয়া। বাংলা চালু হলে ঠুনকো অভিজাততন্ত্রের গায়েও ধাক্কা লাগবে।

এখানে একটি প্রশ্ন উঠে যায়, তাহলে কি আমরা ইংরেজি বা বিদেশি ভাষা শিখব না? অবশ্যই শিখবো। সেটাও লক্ষ্য করতে হবে। বাংলাদেশ আত্মমর্যাদাপূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের অবশ্যই ইংরেজিসহ ফরাসি, স্প্যানিশ চীনা বা আরবির মতো ভাষা শিখতে হবে। আমরা যেন কোনোভাবেই ভাষাকে ভাষার বিপক্ষে না দাঁড় করিয়ে দেই। অতি উৎসাহী অনেকের মধ্যে এমন বহু নজির দেখা যায়। 

বাংলাদেশে অল্প কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি ছাড়া প্রায় সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলেন, বাংলা বোঝেন। এখানে সরকারি কাজে, আদালতে বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বাংলার ব্যবহার যত বাড়ানো যাবে আমাদের অভিজাতদের জবাবদিহিতার জায়গাও তত বৃদ্ধি পাবে, উন্নত হবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ। সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালুর জন্য ফেব্রুয়ারি এলেই মৌসুমী আহাজারির বাইরে গিয়ে শুধু আদালত নয় আন্তর্জাতিক বিষয় ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সকল নথি বা আদেশ-নির্দেশ কার্যাদি বাংলায় করার আন্তরিক প্রয়াস নেওয়া হোক; যা ইংরেজি বা অন্য ভাষায় করা হয়, তারও একটি বাংলা অনুলিপি যেন করা হয় সেই লক্ষ্যে এখন থেকেই কাজ করা হোক। আরো জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের বিকল্প নেই।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়