বৃহস্পতিবার

২২ অক্টোবর ২০২০


৬ কার্তিক ১৪২৭,

০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

ধরা আপনাকে খেতেই হবে, আজ অথবা কাল...

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদল.কম

প্রকাশিত: ১৮:০২, ৯ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৮:১০, ৯ অক্টোবর ২০২০
ধরা আপনাকে খেতেই হবে, আজ অথবা কাল...

প্রতীকি চিত্র

একসময় বিটিভির তুমুল জনপ্রিয় আইন বিষয়ক অনুষ্ঠান ছিল আইন-আদালত। এতে  দর্শকদের আইনি সমস্যার পরামর্শ দিতেন প্রখ্যাত আইন বিশারদ মরহুম গাজী শামছুর রহমান। অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন তিনি। সরল ও উপভোগ্য ভাষায় জটিল সব আইনি সমস্যার সমাধান জানাতেন তিনি যা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গোগ্রাসে গিলতো দশর্ক। 

বাংলা ভাষায় আইনবিষয়ক শতাধিক বইয়ের প্রণেতা এই আইনজ্ঞের ছিল দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতা। জেলা জজ হিসেবে আইনি ক্যারিয়ার শুরু করা শামছুর রহমানের বিচারক জীবনের বহুবর্ণিল ঘটনাবলী নিয়ে তার একটি স্মৃতিচারণমুলক গ্রন্থ আছে ‌'বিচারক জীবনের স্মৃতিচারণ' নামে। 

সেই বইয়ের একটি ঘটনা ছিল এরকম- একটি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচার শেষে তিনি মৃত্যুদণ্ড দেন। কিন্তু মন বলছিল, এই লোকটা আসলে খুনি নয়- তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ মিথ্যা হলেও ছিল মজবুত, ঠাসবুণোটে গাঁথা। তাই এক্ষেত্রে জজ গাজী সাহেবের হাত-পা ছিল বাঁধা। তিনি আইনি বিধিবিধান মেনে লোকটিকে মৃত্যুদণ্ড দিতে বাধ্য হন। তবে বিষয়টা তাকে খুব পীড়া দিচ্ছিল। তিনি রায় প্রদান শেষে দণ্ডিত ওই ব্যক্তিকে তাঁর খাস কামড়ায় ডেকে পাঠান। লোকটি এলে তিনি জানতে চান এই মামলায় সে আসলেই অপরাধী কি না?

জবাবে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া ব্যক্তি যা বলেন তা অনেকটা এই রকম- হুজুর, এই মামলায় আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। এই খুনের সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে আজ আমি আমার একটা অন্য পাপের শাস্তি পেলাম, হুজুর। গাজী সাহেব শুধান- কী সেই ঘটনা? আমাকে বলা যায়?
লোকটি বলেন- হুজুর, আজ থেকে অনেক বছর আগে  প্রতিবেশী এক পরিবারের সঙ্গে আমার বিরোধ চলছিল। নিয়মিত ঝগড়া-ফ্যাসাদ লেগই থাকতো দুই পক্ষে। তো একদিন দুপুরে দেখি আমার ওই প্রতিবেশীর বছর দশেকের ছেলেটি পাশের পুকুরে পড়ে গেছে। একদম দুপুর বেলা, আশপাশে কেউ নেই। ছেলেটি সাঁতার জানতো না। আমার চোখের সামনে সে হাবুডুবু খেতে খেতে পানিতে তলিয়ে গেল। ছেলেটিকে আমি বাঁচাতে পারতাম- কিন্তু তার পরিবারের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার নেশায় তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যাইনি। এ ঘটনা আমি ছাড়া আর কেউ দেখেও নাই। আমি চুপচাপ রইলাম। ওদিকে কয়েক ঘণ্টা পর লাশ ভেসে উঠলো- প্রতিবেশীর বাড়িতে বুক ফাটানো কান্নার রোল শুরু হয়ে গেল... 
হুজুর, আজ আমি সেই পাপের শাস্তি পেলাম!

গতকাল প্রথম আলোর অনলাইনে প্রকাশিত 'কার সম্পদ কে খায়' শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়তে পড়তে গাজী সাহেবের আইন জীবনের অভিজ্ঞতার ওই ঘটনাটি মনে পড়ে গেল। প্রতিবেদনটি রাজধানীর একসময়ের অন্যতম টপ টেরর কুখ্যাত '‌মুর্গি মিলন' এর সম্পত্তি নিয়ে। আজ থেকে ২০ বছর আগে (২০০০ সালের ২৭ অক্টোবর) পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে জনাকীর্ণ আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিপক্ষ গুলি করে হত্যা করে হুমায়ুন কবির ওরফে মুর্গি মিলনকে। স্বর্ণ চোরাচালানের র‌্যাকেট নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মিলন নিহত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে থাকা ১৭টি মামলা ও ৩৩টি জিডির তদন্ত একে একে নথিভুক্ত (অর্থাৎ বিচার স্থগিত) হয়ে যায়। পুলিশও যেন ফাইল গুটিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু সন্ত্রাস-অস্ত্রবাজী আর মানুষের সর্বনাশ ঘটিয়ে মুর্গি মিলনের কামাই করা কোটি টাকা ও সম্পদের কিছুই তার স্বজন বা উত্তরাধিকারীদের ভোগে আসেনি। সেই বিশাল সম্পদ এখন ভোগ করছে তার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কহীন এক ব্যক্তি। পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুরগি মিলন সোনা চোরাচালান আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিল। এর মধ্যে আছে এলিফ্যান্ট রোডে দোকান, গার্মেন্টস কারখানা, পল্টনে ফ্ল্যাট, হাতিরপুলে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন। এর বাইরে আরও অনেক কিছু থাকার কথা। কিন্তু কিছুই ভোগ করে যেতে পারেনি সে। ১৬ বছরের দাম্পত্য জীবনে তার কোনো সন্তান ছিল না। মিলনের তিন ভাই ও এক বোনও ওই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। অর্থাৎ মুরগি মিলন নিহত হওয়ার পর তার সব সম্পত্তি চলে যায় স্ত্রী নাসরিনের নিয়ন্ত্রণে। সেই সম্পদ স্ত্রী নাসরিনের হাতেও থাকেনি, চলে গেছে অন্যের হাতে- সেই অন্য ব্যক্তিটি হচ্ছেন নাসরিনের দ্বিতীয় স্বামী মাহবুবুর রহমান সরদার। নাসরিন মারা গেছেন দ্বিতীয় স্বামীর ঔরসে এক সন্তান রেখে। পরে নাসরিনের সৎ মা এক মামলায় অভিযোগ করেছেন নাসরিনকে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে দ্বিতীয় স্বামী মাহবুবুর।  
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, বিষ প্রয়োগের পর ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকার একটি ক্লিনিকে মারা যান নাসরিন। এর ৩৩ দিন পর কাউকে কিছু না জানিয়ে আদালতের মাধ্যমে নাসরিনের মালিকানায় থাকা মুর্গি মিলনের সব সম্পত্তি তাদের নাবালক সন্তান রাইয়ান মাহবুবের নামে হস্তান্তর করিয়ে নেন মাহবুব। এরপর তিনি সেই নাবালকের অভিভাবক হয়ে সব সম্পত্তি ভোগ করতে থাকেন। ভোগ করা সম্পদের মধ্যে রাজধানীর হাতিরপুলে ইস্টার্ন প্লাজার পাশে বেলভিউ নামে নয়তলা বাণিজ্যিক ভবনটি থেকে থেকে মাসে আট লাখ টাকা ভাড়া আসে।

এদিকে সৎ মা ছালেহা খানমের করা মামলার তদন্তে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ তথ্য-প্রমাণ না পেয়ে আদালতে প্রতিবেদন দেন। সেই প্রতিবেদনের ব্যাপারে নারাজি দেন বাদী ছালেহা। আদালত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে এটাকে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত হওয়া সমীচীন বলে মন্তব্য করেন। পরে আদালত কার্যবিধির ২০০ ধারায় তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন। এরপর পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়, নাসরিন আগে থেকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। পরে তাঁর কিডনি জটিলতা দেখা দেয়। মোহাম্মদপুরে কেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি  চিকিৎসাধীন অবস্থায় একদিন তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। পিবিআই ওই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে ওই সময় নাসরিনের মৃতদেহের সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত করা হয়নি।

পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার মামলা প্রসঙ্গে বলেন, পিবিআই অনেক চেষ্টা করেছে। আসলে এটা অনেক দিন আগের ঘটনা হওয়ায় বাদীর অভিযোগের সপক্ষে সব তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। সে কারণে বাদীর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে আদালতে প্রতিবেদন দেয় পিবিআই। ২০১৮ সালের ১১ মার্চ পিবিআই আদালতে এই প্রতিবেদন দেয় এবং আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। ছালেহা খানম সেই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যান। মামলাটি এখনো হাইকোর্টে চলমান আছে।

প্রিয় পাঠক, বিচারক গাজী শামছুর রহমান বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে মুর্গি মিলনের ঘটনার হয়তো তেমন সংশ্লিষ্টতা নেই। আবার আপনাদের কেউ কেউ বলতে পারেন গাজী সাহেবের ঘটনায় বর্ণিত ওই ব্যক্তির বিশ্বাসের কী ভিত্তি আছে যে আগের অপরাধের জন্য তিনি পরের ওই শাস্তি পেলেন? এরকম কেউ যদি বলেন তবে বলবো, তার কথায় যুক্তি আছে। এ নিয়ে তর্ক করার জো নেই। তবে আমাদের এই ক্ষুদ্র মানবজীবনে দুই যোগ দুই চারের হিসেবে নিয়তির এমন যোগফলে কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করেন এবং তাদের কাছে বিষয়টি যৌক্তিকও। সে যাই হোক, সন্ত্রাসের মাধ্যমে মুর্গি মিলনের অর্জিত সম্পদ তার কাজে লাগেনি, তার মা-বাবা বা ভাই-বোনরাও বঞ্চিত হয়েছেন সেই সম্পদের ভোগ দখল থেকে, সন্তান নেই, এমনকি তার প্রিয়তমা স্ত্রী নাসরিনও (তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত জজ সাহেবের কন্যাও) তা বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি, রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। শেষে সেই সম্পদ ভোগ করছেন অন্য একজন যার মালিকানা পেতে চাইছেন মুর্গি মিলেনের সৎ শাশুরি সালেহা- যার সঙ্গে তার কোনো ধরনের রক্তের সম্পর্ক নেই, যেমন সম্পর্ক নেই নাসরিনের দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গেও। এরকম ঘটনা হরদম আমাদের আশপাশে ঘটছে কিন্তু। অন্যায় পথে অর্জিত সম্পদ আগে হোক পরে হোক- কোনো কাজে আসে না, বরঞ্চ এটা এর অধিকারী বা তার সঙ্গী-প্রিয়জনদের জন্য বিষফল হয়ে দেখা দেয়। আর  কেউ দেখলো না তাই অপরাধ করে পার পেয়েই যাবো- এমনটাও কিন্তু এই দুনিয়াদারির জীবনে হওয়া সম্ভব নয়- ধরা আপনাকে খেতেই হবে, আজ অথবা কাল, এভাবে নয় তো ওভাবে। সমাজে ক্ষমতার অধিকারী, অর্থশালী, সম্মানের অধিকারী বা সাধারণ মানুষ- আপনি যেই হন না কেন- অপরাধে জড়ানোর আগে, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার আগে, বা অন্যের চরম ক্ষতি হতে দেখে চুপ করে বসে থাকার আগে এই বিষয়গুলো যেন আমাদের বিবেচনায় আসে- এই আশায় লেখা শেষ করছি। মনে রাখবেন, ধরা আপনাকে পড়তেই হবে, ব্যর্থ আপনাকে হতেই হবে- যদি অন্যায় করেন।

দিনবদলবিডি.কম/একেআর

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়