বৃহস্পতিবার

২২ এপ্রিল ২০২১


৯ বৈশাখ ১৪২৮,

০৯ রমজান ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও ঝুঁকিসমূহ

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:১০, ৩ এপ্রিল ২০২১  
ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল: বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও ঝুঁকিসমূহ

ফাইল ছবি

ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, যা সম্প্রতি ‘আইপিএস’- নামে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে, প্রযুক্তিগতভাবে একটি ভৌগলিক ধারণা যা ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দুটি অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে। 

প্রায় দশ বছর আগে ভারতীয় নৌবাহিনী শব্দটি প্রথম প্রচলন করে। তবে ২০১৭ সালে অ্যাপেক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এশিয়াতে ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) নামে একটি নতুন কর্মসূচির ঘোষণা করে, তখন থেকে এর কার্যক্রম গতি পায়।

‘এফওআইপি’ ইতোমধ্যে এশিয়ার দেশ জাপান ইন্দো-প্যাসিফিকে তাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ বোঝাতে ব্যবহার করে, যেখানে ২০১৬ সালে ওশেনিয়ার দেশ অস্ট্রেলিয়াও তাদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক শ্বেতপত্রে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি’র ব্যবহার করে।
সময়ের পরিক্রমায়, ভূ-কৌশলগত দিক থেকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কথাটি- বহুলভাবে স্বীকৃত একটি আঞ্চলিক ধারণা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন, উভয়ের জন্য ভারত মহাসাগর ভূ-কৌশলগত দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বিমসটেক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, আর এই কারণে আইপিএসের সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। 

এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর একটি বড় ধাক্কা হিসেবেই কাজ করছে। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত ‘হাব অ্যান্ড স্পোকস’ ধারণা ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (আইপিএস) নামে কৌশলগত অগ্রাধিকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে চলেছে।

উদীয়মান অর্থনীতির পাশাপাশি চীনের কূটনীতিক উত্থান তার প্রতিবেশী দেশগুলো, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ‘নিরাপত্তা উদ্বেগ’ তৈরি করছে। বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের অবিচ্ছিন্ন আধিপত্য প্রদর্শন, তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে। আর তাই উদ্বিগ্ন দেশগুলো কোয়াড জোট গঠনের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে। 

এখানে উল্লেখ করার মতো বিষয় হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামনের দিনগুলোতে সমাজতান্ত্রিক চীনের বিশ্ব মোড়ল হওয়ার স্বপ্নকে প্রতিহত করতে আইপিএস এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে প্রভাব বলয় তৈরি করে চলেছে। 

আর্থনীতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সম্ভাবনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি অঞ্চলটি বৈশ্বিক নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বের মোট জিডিপির ৫০ শতাংশই হল এই অঞ্চলটির। আর তাই এই বিষয়ে এখন আর সন্দেহ নেই যে, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাংলাদেশকে এই অঞ্চলের দেশগুলোর কেন্দ্রে (হান) যুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। 

তবে আইপিএস যতটা না আর্থনীতিক, তার চেয়ে বেশি কৌশলগত। মার্কিন ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট, স্টিফেন বিগুন ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে আইপিএসের আওতায় অস্ত্র কেনার প্রস্তাব দিয়েছেন।

অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়, বাংলাদেশ এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়। যদিও সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশ তার অস্ত্রের প্রায় ৭১ শতাংশই আমদানি করে চীন থেকে। আর তাই আইপিএস এর সঙ্গে এমন সমঝোতা স্পষ্টতই চীনের জন্য অস্বস্তি সৃষ্টি করবে।

কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বিশ্বে বাংলাদেশের ক্ষমতা বা সম্পর্কের ভারসাম্যকে কঠিন করে দিয়েছে। আর এতে করে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয় সংকটের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ না পারছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ককে খাটো করে দেখতে, আবার না পারছে আইপিএসে যোগ দিতে, কারণ এটা চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

প্রচলিত সামরিক সুরক্ষার পরিবর্তে বাংলাদেশ যে মানবাধিকার দিকগুলোর প্রতি মনযোগী হয়ে দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে- তা খুবই স্পষ্ট। আক্ষরিক অর্থে আইপিএস হল বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে সামরিক সুরক্ষা সক্ষমতা তৈরির একটি জোট। যুক্তরাষ্ট্রে তার সরকারী সফর শেষে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে নিরাপত্তা নয়, বরং অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছেন করি’।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের দিকে এগিয়ে চলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সাফল্যের এক অনন্য নজির তৈরি করেছে। চীন, জাপান, ভারত, এডিবি বা বিশ্বব্যাংক সহ সমস্ত উন্নয়ন অংশীদাররা বাংলাদেশের এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অংশ নিতে আগ্রহী।

বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাসী দেশটি বিশ্বের সমস্ত ফ্রন্ট- ভারত-চীন বা যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া সবার সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।

আইপিএস চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ (বিআরআই) কে তুচ্ছ জ্ঞান করে, বাংলাদেশকে, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-জাপানের একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টের দিকে ঝুঁকাবে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং অর্থনৈতিক বিকাশ চায়; সুতরাং, দেশটি বিআরআই বা আইপিএস এককভাবে কোনোদিকেই ঝুঁকবে না। 

এতে করে এটা খুবই স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ বিআরআই থেকে সর্বোচ্চ প্রাপ্তির জন্য একটি অনন্য কৌশল অনুসরণ করছে।

দিনবদলবিডি/এস

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়