বৃহস্পতিবার

২২ এপ্রিল ২০২১


৯ বৈশাখ ১৪২৮,

০৯ রমজান ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

উন্নয়নশীল তালিকায় বাংলাদেশ: পোশাক খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:১৫, ৬ এপ্রিল ২০২১  
উন্নয়নশীল তালিকায় বাংলাদেশ: পোশাক খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা

এলডিসি থেকে উন্নীত হওয়ার ফলে পোশাক খাতকে মোকাবিলা করতে হবে নয়া চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলো। সব ঠিক থাকলে আগামী ২০২৬ সালে যা বাস্তবরূপে দেখা যাবে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বাংলাদেশকে এই তালিকায় প্রবেশের যোগ্য করেছে। এলডিসি থেকে উন্নীত হওয়ার ফলে বর্তমানে পাওয়া অনেক সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশকে ত্যাগ করতে হবে।

এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ যে সুবিধাগুলো পায় তাকে তিন ভাগে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে: (১) অগ্রাধিকারমূলক,  (২) উন্নয়ন সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং (৩) সাধারণ সহায়তা এবং অন্যান্য ধরনের সহযোগিতা। এতে করে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যে তৈরি পোশাক খাতের ওপর ধাক্কা লাগবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার ফলে পোশাক খাতের ওপর সেই সম্ভাব্য প্রভাবটি কী হতে পারে? 

তৈরি পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রভাব প্রকৃতপক্ষে এতো তীব্র হবে না। এই খাতটি বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের শুধুমাত্র পাঁচ চতুর্থাংশেরও বেশি প্রদান করেই থেমে থাকছে না, একইসঙ্গে এই খাত বাংলাদেশের প্রায় সকল প্রধান বাজারে শুল্ক আয়ের শীর্ষেও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের পোশাকখাত ইউরোপীয় ইউনিয়নে গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ এবং কানাডায় ১৬-১৮ শতাংশ শুল্ক দিয়ে থাকে। সেই হিসেবে, বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে এর ক্ষতিকর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে জিএসপি সুবিধা পেয়ে থাকে। জিএসপি সুবিধার ফলে ওইসব বাজারে বাংলাদেশের  'শুল্ক-মুক্ত কোটা-মুক্ত' (ডিএফকিউএফ) প্রবেশাধিকার রয়েছে। 'অস্ত্র ছাড়া সকল কিছু' নীতির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিএফকিউএফ প্রদান করে থাকে। ডিএফকিউএফ সুবিধা না পেলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিতে আয় ঘাটতি হতে পারে, যা বার্ষিক হিসেবে প্রায় আড়াই মিলিয়ন ডলার।  এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির বেশিরভাগটাই হবে পোশাক খাতের। ভর্তুকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা (এসসিএম) সম্পর্কিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) চুক্তি অনুযায়ী রপ্তানি প্রণোদনা ও ভর্তুকি পাওয়ার সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। ফলে পোশাক শিল্পখাত বর্তমানে যে প্রণোদনাগুলো পাচ্ছে তা আর পাবে না এবং এটি বাংলাদেশি পোশাক কোম্পানিগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা এবং আয়ের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পর অবশ্য বাংলাদেশ জিএসপিপ্লাস সুবিধা পাবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পূরণ করতে হবে ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেশন ও দুইটি সংখ্যাগত মানদণ্ড। কনভেনশনগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের ৭ টি মানবাধিকার বিষয়ক কনভেনশন, ৮ টি বিশ্ব শ্রমিক সংস্থার কনভেনশন, পরিবেশ সুরক্ষা বিষয়ে ৮টিসহ গুড গভরন্যান্স বিষয়ে ৪টি কনভেনশন। 

এলডিসি-র দেশগুলোর জন্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মূল বিধি (আরওও) অত্যন্ত এলডিসি-বান্ধব (যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়নে মাত্র একটি কনভেনশন মানলেই হয়, কানাডায় ২৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজন সুবিধা পেয়ে থাকে)। উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশের অর্থ এই যে, এর ফলে রপ্তানির ক্ষেত্রে নিয়ম কানুন কঠিন হবে যা তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। দক্ষিণ এশিয়া ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) এর মতো আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে যে অগ্রাধিকার পায় সে ক্ষেত্রেও এর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। যেখানে ভারত চারটি এলডিসি সদস্যের জন্য ডিএফকিউএফ বাজারে প্রবেশাধিকার পায় ও চীনের বাজারেও তারা সেই সুবিধা পেয়ে থাকে। 

বাংলাদেশের কিছু প্রতিযোগী আগ্রাসী আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থার (আরটিএ) দিকে যাচ্ছে, এটা আমাদের তৈরি পোশাক খাতের জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনাম-ইইউ এফটিএ চু্ক্তি বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামকে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা দেবে। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশ ভিয়েতনামের তুলনায় যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ভোগ করে তা রহিত করবে। কিন্তু সামনে ২০২৭ সালের পর এমন সময় হয়তো আসবে, যখন ভিয়েতনামের পোশাক ইইউর বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক সেখানে শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হবে (যদি বর্তমান পরিস্থিতি বিরাজমান থাকে)।

এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরোক্ষ কারণগুলো আরো প্রভাব বিস্তার করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,  স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নতির ফলে ডাব্লুটিওর বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা সম্পত্তি অধিকার (টিআরআইপিএস) এর অধীনে কঠোর নীতিমালা, বর্ধিত সমন্বিত কাঠামো (ইআইএফ) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিভিন্ন ও বিশেষ  সহযোগিতার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে। তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ প্রাপ্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে সহায়তা পেতো উন্নয়নশীল দেশর তালিকায় প্রবেশ করলে তা আর পাওয়া যাবে না। অপরদিকে, তৈরি পোশাক শিল্পখাতে ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে যখন এই খাত উপরে বর্ণিত চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হবে। 

সাম্প্রতিক সময়ে অর্জিত মধ্যম আয়ের দেশের তকমার কারণে এরই মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক চাহিদার বিকাশ এবং বিরাজমান অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালনের ফলে ঐতিহ্যগতভাবে তৈরি পোশাক খাত যে ধরনের প্রণোদনা পেয়ে আসছিলো, ভবিষ্যতে তা সঙ্কুচিত হয়ে যেতে পারে। 

বাংলাদেশের উচিত উপযুক্ত স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করা এবং টেকসই উন্নয়নশীল দেশের তকমা ধরে রাখতে তৈরি পোশাক খাতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে প্রবেশের পর বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের একটি টেকসই এবং শক্তিশালী ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য এই খাত সংশ্লিষ্ট সকলের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে এবং পোশাক সেক্টরের ২০২৬ পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের তৈরি করতে হবে। 

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগুতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে জিএসপিপ্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকারকে মনোনিবেশ করা এবং এর আগে উল্লিখিত ২৭ টি কনভেনশন অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। একইসঙ্গে ইইউ কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের পক্ষে আরো বেশি আমদানি সুগম করতে অর্থনৈতিক-কূটনীতি বাড়াতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার চাহিদার বাইরেও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডকে আরো বৈচিত্র্যময় ও বহুমুখী করা উচিত। ২০৩০ সালের মধ্যে মিলিনিয়াম ডেভলেপমেন্ট গোল (এসডিজি) অর্জনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হিসাবে, সেই কাঠামোর অধীনে আরও বাণিজ্য-সম্পর্কিত সুযোগের জন্য জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলন (ইউএনসিটিএডিডি) এবং বর্ধিত সমন্বিত ফ্রেমওয়ার্ক (ইআইএফ) নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন। 

এশিয়ান প্রোডাক্টিভিটি অর্গানাইজেশনের মতে, প্রতি ঘণ্টায় বাংলাদেশের শ্রম উত্পাদনশীলতা ৩.৪ ডলার যা অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের গড় উত্পাদনশীলতার চেয়ে কম। দেশের উত্পাদনশীল ও শ্রম উত্পাদনশীলতা জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৭৩.১৭ শতাংশের বেশি মোট পাঁচটি পণ্য- শার্ট, ট্রাউজার্স, জ্যাকেট, টি-শার্ট এবং সোয়েটার। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনতে হবে। ডিজাইন-মানের সঙ্গে পণ্যগুলোর বৈচিত্র ও মানের দিকেও নজর দিতে হবে। 

বিবিআইএন, বিসিআইএম এবং বিমসটেক ইত্যাদির মতো আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক ফোরামে বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে যা দ্বিপাক্ষিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং নতুন প্রযুক্তির সুযোগকে কাজে লাগাতে সরকারের সক্রিয়ভাবে সাড়া দেওয়া উচিত। দক্ষ জনবল সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নে কারিকুলাম ঠিক করে উদ্যোক্তা, নীতি নির্ধারক, ক্রেতা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। 

কারখানার সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালীকরণ, ফিজিক্যাল ও সফট অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে ব্যবসায়ের ব্যয় হ্রাস করা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ- যা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ায় পোশাক শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এই শিল্পের অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে আস্থা তৈরি করবে। সামনের দিনগুলোর জন্য অপেক্ষমান চ্যালেঞ্জের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নীত দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনারও প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় প্রবেশ বাংলাদেশকে যুগপৎ নিজেদের ব্র্যান্ডিং-এর সুযোগ ও বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার হারানোর দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলেছে। সঠিক নীতি ও ব্যবসায়িক কৌশল পোশাক খাতকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে। বাজারের পরিবর্তনগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করে তৈরি পোশাক খাতকে টেকসই করতে পারলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশেকে এই খাত উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় ভূমিকা রাখবে।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়