শুক্রবার

১৪ মে ২০২১


১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮,

০১ শাওয়াল ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ
Eidul Fitor

বিশ্বমহামারি রোধ : শীর্ষ ভ্যাকসিন নির্মাতাদের কর্তব্য দ্রুত ফর্মুলা ভাগাভাগি

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:০৬, ৪ মে ২০২১   আপডেট: ১৫:১৫, ৪ মে ২০২১
বিশ্বমহামারি রোধ : শীর্ষ ভ্যাকসিন নির্মাতাদের কর্তব্য দ্রুত ফর্মুলা ভাগাভাগি

সংগৃহীত ছবি

ঘটমান বাস্তবতায় একে বলা যায়- তিক্ত-রস। ব্যাপার হলো, বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ ট্র্যাজেডির তীব্রতা বিশ্বের কাছে প্রতীয়মান করেছে যে করোনা প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবহৃত পণ্যগুলোকে (ওষুধ ও টিকা)  "স্বার্বজনিন বৈশ্বিক পণ্য" (global public goods) হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। বিশ্বজুড়ে তাই সরকার, মানবাধিকার সংস্থা ও সহায়করা, এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ওষুধ কোম্পানিগুলোকে তাদের জ্ঞান এবং পেটেন্ট সম্পর্কিত তথ্য আরো বিস্তৃতভাবে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করার আহ্বান জানাচ্ছে যাতে এরইমধ্যে দেখা দেওয়া মহামারিতে ভ্যাকসিনের তীব্র ঘাটতি পূরণ করা যায়, নইলে ২.৫ মিলিয়নেরও বেশি জীবনহানী ঘটতে পারে।  এমনিতেই বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় খুব কম এবং উৎপাদিত সীমিত পরিমাণটিও "উন্নত" দেশগুলোতে যাচ্ছে। 

ডব্লিউএইচও'র তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০ শতাংশ ভ্যাকসিন মাত্র ১০টি দেশ পেয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২.৩ বিলিয়ন লোকের আবাস ১৪০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চল মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত একটিও ভ্যাকসিন পায়নি। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই ভাইরাসটি থেকে মুক্তি পেতে বিশ্বব্যাপী টিকার সরবরাহ দ্রুততার সঙ্গে বাড়িয়ে তুলতে এবং তা করতে অপরাপর উৎপাদকদের তাদের অভিজ্ঞতা তথা ভ্যাকসিন প্রস্তুত প্রণালী ভাগাভাগির অনুরোধ করেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিচার প্রোগ্রামের প্রধান স্টিফেন ককবার্ন বলেছেন, "এরইমধ্যে ধনী দেশগুলোতে ২০২১ সালে সম্ভাব্য উৎপাদিত ভ্যাকসিনের বেশিরভাগ বিক্রি করা হয়ে গেছে; ভ্যাকসিনটি নিরাপদ এবং কার্যকর হিসাবে প্রমাণিত হয়ে গেলে মডার্নাকে অবশ্যই অন্যদেরকে ভ্যাকসিন তৈরির অনুমতি দেওয়া এবং জ্ঞান-প্রযুক্তি সরবরাহ করা উচিত । মডার্না এবং ফাইজার-বায়োএনটেকের মতো কোম্পানিগুলোর মানবাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে এবং একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ নির্মূলের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত। আমরা কভিড-১৯ এর করাল গ্রাস থেকে বের হয়ে আসতে পারব যদি কম্পানিগুলো নিশ্চিত করে যে জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিনগুলো পড়ে থাকবে না। এখন সময় এসেছে সংস্থাগুলোর মানবাধিকারের দায় শোধ করার এবং তাদের উদ্ভাবনের জ্ঞানকে যতদূর সম্ভব আরো বিস্তৃতভাবে শেয়ার করার।" 

পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স (জিএভিআই) ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ চরম হতাশা নিয়ে বলেছিল, ফার্মাসিউটিক্যাল কর্পোরেশনের একচেটিয়া ব্যবসা এবং একচেটিয়া দখলবাজির কারণে সকলের জন্য নিরাপদ এবং কার্যকর ভ্যাকসিনের সরবরাহে ‘কৃত্রিম বিভাজন’ তৈরি করা হচ্ছে। জিএভিআই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে বিশ্বের তিনটি বৃহত্তম ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী সংস্থা- মডার্না, ফাইজার-বায়োএনটেক এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা মূলত একদিকে ঘুরে বসে আছে- তারা ২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী জনসংখ্যার মাত্র ১.৫ শতাংশের জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন তৈরির পরিকল্পনা করেছে।

পিপলস ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের দেখিয়েছে কোভিড-১৯-কে মহামারি ঘোষণা করার এক বছর পর, উন্নয়নশীল দেশগুলো করোনা  মোকাবিলার ক্ষেত্রে অক্সিজেন ও চিকিত্সা সামগ্রীর সংকটে পড়েছে।  এই পরিস্থিতিতেও সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ একটিও ভ্যাকসিন পেতে সক্ষম হয়নি। অথচ এর তীব্র বৈপরীত্যমূখী অবস্থানে দেখা গেছে, উন্নত দেশগুলো গত একমাসে প্রতি সেকেন্ডে একজন হারে তাদের নাগরিকদের টিকা দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইইউসহ উন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অনেকেই ২০২১ সালের ১১ মার্চ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) আলোচনার জন্য ১০০ টিরও বেশি উন্নয়নশীল দেশের একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। যে প্রস্তাবটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর আধিপত্য কমাতে এবং দরিদ্র দেশগুলোকে তাদের তীব্রভাবে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য নিরাপদ এবং কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরিতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে সক্ষম করে তুলতো। বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন সংকটের মুখে জিএভিআই ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুরোধ করে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় একচেটিয়া বাণিজ্য ও কৃত্রিম বাধা অপসারণ করা উচিত। জিএভিআইয়ের প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে- বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বিধি (intellectual property rules) স্থগিত করা, প্রযুক্তি ভাগাভাগি করে নেওয়া এবং একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সমাপ্তি। এতে করে প্রত্যেককেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই ভ্যাকসিন পেতে পারবে। অন্যথায়, এটি হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে এবং সবচেয়ে দরিদ্রদের মধ্যে যে অর্থনৈতিক কষাঘাত পড়ছে তা-ও দীর্ঘায়িত করবে।

অক্সফামের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ১০০ মিলিয়নেরও বেশি লোককে টিকা দেওয়া হয়েছে, তবে মোট টিকার মাত্র ৪ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলির মধ্যে কেবল গিনি মাত্র ৫৫ জন নাগরিককে টিকা দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলো তাদের জনসংখ্যার তিনগুণ মানুষকে টিকা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সংখ্যক ডোজ ক্রয় করেছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভ্যাকসিন পেতে এক তীব্র ও অসম প্রতিযোগিতার মুখে ফেলে দিয়েছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ওষুধের একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলি কৃত্রিম বাধা এবং পেটেন্ট সম্পর্কিত সমস্যা দৃষ্টি করে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য উন্নয়নশীল দেশের সক্ষম ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য ক্ষমতাটিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট এরইমধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনিকা এবং নভোভ্যাক্সের পক্ষে কোভিড-১৯ এর লাখ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে এবং তাদের নিজেদের উন্নতি করছে, তবে ভারতে কমপক্ষে আরো ২০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ভ্যাকসিন উত্পাদন করতে সক্ষম হতো যদি তাদের ফর্মুলা (কীভাবে বানাতে হয়) ও প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হতো। বাংলাদেশে এরকম একটি সক্ষম প্রতিষ্ঠান হ'ল ইনসেপটা, যারা এরইমধ্যে হেপাটাইটিস, ফ্লু, মেনিনজাইটিস, রেবিস, টিটেনাস এবং হামের টিকা তৈরি করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যানুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের তিনটি মহাদেশের তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি যাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা যদি ব্লুপ্রিন্ট এবং প্রযুক্তি পায় (blueprints and  technical know-how) তবে তারা সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে কয়েক মিলিয়ন ভ্যাকসিন উত্পাদন করতে পারবে। বাংলাদেশি ওষুধ প্রস্তুতকারক ইনসেপ্টার প্রধান নির্বাহী আবদুল মুক্তাদির বলেছেন যে তার প্রতিষ্ঠানের এশিয়া জুড়ে বিতরণ করার জন্য বছরে ৬০০ মিলিয়ন থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডোজ করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ইনসেপ্টার মতো, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোতে আরো অনেক ভ্যাকসিন উত্পাদক রয়েছে, যদি তাদের হাতে ফর্মুলা (know-how) এবং ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি লাইসেন্স থাকতো তবে তারা নিরাপদ এবং কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরিতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারতো।

উপসংহারে বলা যায়, বৈশ্বিক মহামারির বৈশ্বিক সমাধান প্রয়োজন এবং বৈশ্বিক সমস্যা বৈশ্বিক সমাধান দাবি করে। সুতরাং, 'কৃত্রিম বাধা' উৎপাটন, মুনাফা-চালিত একচেটিয়া ব্যবসার সমাপ্তি এবং ফর্মুলা (know-how) ভাগ করে নেওয়াটা প্রয়োজন। যার মাধ্যমে এই একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বব্যাপী কোটি মানুষকে সর্বগ্রাসী মানবিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়