বৃহস্পতিবার

২২ অক্টোবর ২০২০


৬ কার্তিক ১৪২৭,

০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

আসলে সত্য কে বলবে?

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদল.কম

প্রকাশিত: ২০:৫৬, ১৪ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৬:০২, ১৫ অক্টোবর ২০২০
আসলে সত্য কে বলবে?

এসআই আকবর (বামে) ও নিহত রায়হান (ডানে) -ফাইল ফটো

আজ থেকে অনেক বছর আগে সালেহা হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। দেশসেরা একটি ব্যবসায়ী পরিবারের সুন্দরী আদরের দুলালী সালেহাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল গরীবের মেধাবী সন্তান ডা. ইকবালের সঙ্গে। ইকবালের ডাক্তার হওয়ার পেছনে যাবতীয় খরচাপাতিও করেছিলেন সালেহার বাবা। জাহাজমার্কা আলকাতরা কোম্পানির মালিক সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন সালেহাকে মহা ধুমধামে বিয়ে দেওয়ার সময় নতুন সংসারের জন্য দরকারি সব কিছুই দেওয়া হয়েছিল, দেওয়া হয়েছিল ওই সময়ের বিবেচনায় মহার্ঘ একটি প্রাইভেট কারও। নয়া দম্পতি বসবাসও করছিল সালেহার বাবার দেওয়া বাসায়।

অনাবিল সুখে কেটে যাওয়ার কথা গরীবের মেধাবী সন্তান আর বড়লোকের সুন্দরী কন্যার এই সংসার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষতক তা হয়নি। দেখতে হেমা মালিনীর মতো গৃহকর্মী মনোয়ারার প্রতি যৌতুকলোভী ডা. ইকবালের অন্যরকম আকর্ষণ চরম পরিণতি ডেকে আনে। তাদের অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি সালেহা হাতেনাতে ধরে ফেলায় বেঁচে থাকাটা অসম্ভব হয়ে যায় তার জন্য। ডা. ইকবাল দরজার ডাঁসা দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করে। এরপর এটাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর জন্য শেভিং ব্লেড দিয়ে সালেহার গলা কেটে ফেলে ইকবাল। এই হত্যাকাণ্ডকে প্রথমে আত্মহত্যা বলে চালানো হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এমনি বলা হয়।

একবার নয়, পর পর দুইবার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এমনি দেন চিকিৎসকরা। পরে কবর থেকে লাশ তুলে তৃতীয়বারের মতো ময়নাতদন্ত করা হয় সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে। চিকিৎসকদের তিন সদস্যের একটি বোর্ড ময়নাতদন্ত করে। এবার বেড়িয়ে আসে থলের বিড়াল। জানা যায় ডাক্তার সহকর্মীকে বাঁচানোর জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা এই মিথ্যাচার সাজিয়েছিল। কারণ ডা. ইকবালও ঢাকা মেডিকেলেই কর্মরত ছিল। তার সহকর্মী-বন্ধু ডাক্তাররা এবং তাদের সমর্থনকারী চিকিৎসক সমাজের একটি পক্ষ নৈতিকতার সব শিক্ষা, বিবেকের চোখ রাঙানি সব ভুলে সেদিন একজোট হয়েছিল ইকবালের পক্ষে- তাকে নিশ্চিত ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচাতে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিষয়টি তখন পুরো দেশকে উথালপাথাল করে দিয়েছিল।

পুলিশ ও আইনজীবীদের দক্ষ তৎপরতা আর মিডিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকা সালেহা হত্যাকারী ইকবালকে ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচানোর সব অপচেষ্টা ধূলিস্যাৎ করে দেয়। সেই সময় বিবেক গিলে খাওয়া একদল সঙ্ঘবদ্ধ চিকিৎসকের হীন তৎপরতার বিরুদ্ধে পুরো দেশবাসীর ক্ষোভ আর প্রতিবাদ ছিল আইনজীবী, পুলিশ ও মিডিয়ার বড় শক্তি। নরপিশাচ ডা. ইকবালের ফাঁসির দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে মানুষ। পত্রপত্রিকাগুলোতে এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনও প্রকাশ হয় একের পর এক।

গৃহপরিচারিকার সঙ্গে স্বামীর পরকীয়ার জেরে ১৯৭৮ সালের ১৮ এপ্রিল রাজধানীর মালিবাগের বাসায় খুন হন সালেহা। এই অপরাধে শেষ পর্যন্ত ১৯৮৭ সালে ডা. ইকবালকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছিল। সালেহা হত্যা মামলার সূত্রে শুধু একজন ভয়ঙ্কর যৌতকলোভী ব্যাভিচারী ব্যক্তিরই শাস্তি হয়নি, ১৯৮০ সালে দেশে যৌতুকবিরোধী আইনটিও প্রণীত হয়।  

সালেহা হত্যাকাণ্ডের সাড়া জাগানো ঘটনাটি মনে পড়ে গেল সিলেটের কোতোয়ালি মডেল থানার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নির্মম নির্যাতনে তিরিশ বছরের তরতাজা যুবক রায়হান উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায়। পিটিয়ে তার পা দুটি ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে, হাতের আঙুলেও ভয়াবহ নির্যাতনের চিহ্ন। এই যুবক রাতের বেলা কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরছিলেন প্রিয়তমা স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি আর মাত্র তিনমাস বয়সী ফুটফুটে কন্যার কাছে। ফেরার সময়টায় বউয়ের সঙ্গে ফোনে কথাও বলেছিলেন, বলেছিলেন  দ্রুতই ফিরতেছেন বাসায়। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, তারই মতো আরেক টগবগে তরুণ এসআই আকবর তাকে স্ত্রী সন্তানের কাছে যাবার বদলে কবরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালের লাশ ঘরে পড়েছিল রায়হানের প্রাণহীন শরীরটা- নির্যাতনের অনেক ক্ষত নিয়ে। যদিও পুলিশ তাকে ছিনতাইকারী সাজাতে চেয়েছিল কিন্তু তার ‘অপরাধটা’ আসলে কী ছিল- তাও ঠিকমতো জানা যায়নি।

এসআই আকবর সিলেটে নাকি বেশ জনপ্রিয়- ইউটিউবে প্রচারিত নাটকে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত  নাটক ‘গেইমওভার’ ও ‘গরীবের দেব’-এ অভিনয় করে বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। এইসব নাটকে নায়কের অভিনয় করতেন তিনি। ইউটিউব চ্যানেলে গ্রিন বাংলার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন এই এসআই মহাশয়। বেশ কয়েকটি নাটকে তিনি পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয় করে বাহবা কুড়িয়েছেন দর্শকের। 

  নিহত রায়হানের তিন মাস বয়সী কন্যা

কিন্তু গত ১০ অক্টোবর দিনগত রাতে তিনি যা ঘটালেন তা কোনো নায়কোচিত বা বীরোচিত ঘটনার ধারে কাছে দিয়ে যায় না। কাপুরুষোচিত আর পৈচাশিক কায়দায় ফাঁড়িতে পিটিয়ে মৃত্যুর দরোজায় পৌঁছে দেন তিনি সিলেট নগরীর আখালিয়ার নেহারিপাড়ার রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হানকে। ঘণ্টা তিনেক নির্যাতন চালানোর পর রবিবার (১১ অক্টোবর) ভোরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বা নেওয়ার পর রায়হান উদ্দিন মারা যান। তবে প্রথমেই পুলিশের দাবি ছিল, ছিনতাইয়ের দায়ে নগরীর কাস্টঘর এলাকায় গণপিটুনিতে নিহত হন রায়হান। অপরদিকে, রায়হানের পরিবারের অভিযোগ এবং এখন পর্যন্ত যা সত্য বলে প্রকাশিত তা হচ্ছে, সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালি থানার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনেই নিহত হন রায়হান। এ কাজে এসআই আকবরকে সহায়তা করেন তার তিন সহকর্মী।

ঘটনাস্থলের পাশে থাকা খোদ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সিসি ক্যামেরা এবং অন্যত্র থাকা সিসি ক্যামেরা ফুটেজে ঘটনার সত্যতা ধরা পড়েছে। এই ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এসআই আকবরসহ তার সঙ্গী তিন পুলিশ সদস্যকে। এরা হলেন— বন্দরবাজার ফাঁড়ির কনস্টেবল হারুনুর রশিদ, তৌহিদ মিয়া ও টিটু চন্দ্র দাস। তাদের পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়েছে। একই ঘটনায় প্রত্যাহার হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন— এএসআই আশেক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী ও কনস্টেবল সজিব হোসেন। মামলার তদন্তভার পিবিআইকে দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে যে সরকার ও পুলিশ প্রশাসন যেভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে তাতে করে এই ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তি পাবে, সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণও দেওয়া হবে নিহত রায়হানের পরিবারকে। 

কিন্তু একটি কথা এখন বলতেই হচ্ছে। রায়হানকে হত্যার পর কোন সাহসে তা গণপিটুনি বলে প্রচারের সাহস পেল এসআই আকবর। এরপর তাকে সমর্থন করা হলো তার ঊর্দ্ধতনদের পক্ষ থেকে। তাদের কি বিবেক, সততা, দায়িত্ববোধ বলে কিছুই কি নেই! একজন পুলিশ কর্মকর্তা যার জনগণের সেবক হওয়ার কথা, যে জন্য তাকে বেতন দেওয়া হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকায়- সেই পুলিশ কর্মকর্তা ইচ্ছা করলেই কাউকে ধরে এনে পিটিয়ে হত্যা করে ফেলতে পারেন! এরপর তাকে সমর্থনের জন্য আছেন একশ্রেণির ঊর্দ্ধতন। স্থানীয়দের অভিযোগে জানা গেছে, এই লোকটি নাকি যা ইচ্ছা তাই অপকর্ম করতো ওই ফাঁড়িতে। তা এতদিন মনিটরিং করার কি কেউ ছিল না?

আমাদের পুলিশ বাহিনীকে দিন দিন জনবলে, অস্ত্রবলে, সুযোগ-সুবিধায় সক্ষম করে তোলা হচ্ছে। আগের চেয়ে স্মার্ট, মেধাবী, শিক্ষিত তরুণরা এই পেশায় আসছেন। সামাজিক মাধ্যমে তাদের অনেকের কৃতিত্বের ঘটনা ঘুরে বেড়ায়, তাদের মানবিক তৎপরতা অনেক সময় চোখে আনন্দের অশ্রু এনে দেয়। কিন্তু আকবরদের মতো নায়কের মুখোশধারী পিশাচদের অপকর্ম সেইসব আনন্দাশ্রুতে আগুন ঢেলে দেয় ঘৃণা আর ক্ষোভের। 

আজ থেকে ৪২ বছর আগে সালেহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিছু ডাক্তার একজোট হয়েছিল তাদের সহকর্মীকে বাঁচাতে- তবে শেষতক তারা ব্যর্থ হয় পুলিশ, আইনজীবী আর মিডিয়ার বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে। এমন ঘটনা আরো আছে। আমরা আশা করি আমাদের সামাজিক  শান্তি-শৃঙ্খলার নিরব কাণ্ডারি পুলিশ বাহিনীতে যেন ডা. ইকবালদের বন্ধুশ্রেণির আত্মপ্রকাশ না ঘটে। একপেশার, এক জেলার বা একই মতের বলে কারও অপরাধকে আড়াল করার যে অন্ধকার মানসিকতা যুগে যুগে প্রকট হয়ে ওঠে- তার অশুভ গ্রহণে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যেন অন্ধকারে ডুবে না যান। সমাজের অন্য সবগুলো মহলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

নিজ নিজ অপরধীদের প্রশ্রয় না দিয়ে তাদের স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে দিলে অপরাধ এমনিতেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তার জন্য কঠোরতর শাস্তি বা আইন-কানুনের জন্য অপেক্ষমান সময় পেরোনোর অনেক আগেই পরিবেশ অনেক সহনীয় হয়ে উঠবে। না হলে অপরাধীকে লুকাতে আর তাকে ধরতে নিজেদের মধ্যে চোর-পুলিশ খেলায় সময় অতিবাহিত হতে থাকবে। আর আমরা ক্রমশ ঢেকে যেতে থাকবো সর্বনাশের কৃষ্ণ গহ্বরে- যেখান থেকে আর উদ্ধার করার কেউ থাকবে না। শত মানববন্ধন, শত সেমিনার, শত বিক্ষোভ, শত টক শো বাঁচাতে পারবে না আমাদের। সত্যটা আপনাকেই বলতে হবে, আমাকেই বলতে হবে। অন্যের সত্য বলার অপেক্ষায় না থেকে- আসুন, প্রথমেই সত্যটা মেনে নেওয়ার শপথ নেই।

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়