রোববার

১৩ জুন ২০২১


৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮,

০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

রোমে আগুন দিয়ে নিরোদের বাঁশি বাজানোর কুৎসিত সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২৩:০৮, ৭ জুন ২০২১   আপডেট: ২৩:০৯, ৭ জুন ২০২১
রোমে আগুন দিয়ে নিরোদের বাঁশি বাজানোর কুৎসিত সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে

বস্তিতে আগুন যেন এক নৈমিত্তিক ব্যাপার

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ বস্তি 'সাততলা বস্তি'তে আজ (সোমবার) ভোর ৫ টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এতে ছাই হয়ে গেছে হাজারো মানুষের সমস্ত সম্বল। অংকের হিসেবে সেটা হয়তো সামান্য হবে, কিন্তু তা ছিলো এখানে বাস করা মানুষের সর্বস্ব। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের ১৮ টি ইউনিট ও এলাকাবাসীর চেষ্টায় দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। 

প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন জানিয়েছেন, অবৈধ গ্যাস ও বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে মহাখালীর সাততলা বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। 

এরইমধ্যে আজকের ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, এসমস্ত ঘটনায় যা হয় সাধারণত। যদিও আগের সংখ্যাতীত তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমাদের জানা হয় না। আমরা সংবাদকর্মীরাও সেসবের ফলোআপ বিশেষ করি না। 

বস্তিতে আগুন লাগা একটি নৈমিত্তিক ঘটনা যেন। ফি মাসেই ২-৩টি ছোট-বড় আগুনের ঘটনা ঘটে চলেছে। গত বছর ২২ ডিসেম্বর একটি দৈনিক পত্রিকা জানায়, শুধু ২০২০ সালেই ঢাকার বস্তিগুলোতে ৩১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যা ওই পত্রিকার ভাষ্যে 'রহস্যজনক'।  রহস্যজনক; কারণ একদল স্বার্থান্বেষী মহল চায়, ঢাকার 'দামি' জমি থেকে গরিবেরা উঠে যাক। 

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, বস্তিগুলোতে স্বার্থান্বেষী মহলের আগুন লাগানোর অভিযোগ বহুদিনের। এটিকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

২০১৪ সালের বস্তিশুমারি অনুযায়ী, ঢাকা শহরের দুই সিটি কর্পোরেশনে মোট ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তি রয়েছে। সেখানে মোট ঘরের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৭৫ হাজারের মতো। ওই জরিপ অনুযায়ী, সে সময় সাড়ে ছয় লাখের মতো লোক এসব বস্তিতে বসবাস করছিল। অর্ধেকের বেশি বস্তি সরকারি জমিতে তৈরি। ৬৫ শতাংশ বস্তিবাসী ভাড়া থাকেন। ২০১৪ সালের শুমারি অনুযায়ী, সারাদেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২২ লাখ। তবে এসব সংখ্যা ও তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৪ সালের পর এখন বস্তি বা বস্তিবাসীর সংখ্যা কত তার কোনো হিসেব কারও জানা নেই। তবে ধরে নেওয়া যায় ঢাকায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ বস্তিতে থাকে। 

'ভদ্র সমাজ' থেকে এদের নামে নানা অপরাধ কর্মে জড়িত থাকার নালিশও রয়েছে। যার অনেকগুলোই শহর দারিদ্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এর সত্যতাও রয়েছে। একই  সঙ্গে এটাও সত্য, ঢাকার পরিষেবা দানকারীদের বড় অংশই বস্তিতে থাকে। কারখানা শ্রমিকদের বাদ দিলে, রিকশা শ্রমিক বা গৃহকর্মীদের (ছুট্টা বা ছুটা বুয়া) প্রধান অংশই বস্তিতে থাকে। যারা ঢাকার আর্বান মিডলক্লাসের নিত্যকর্মসহায়ক। কিন্তু এরাই সবচেয়ে বঞ্চিত। অন্যদিকে বস্তিতে আগুন লাগা আমাদের যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। এটা ঘটবে, এমন যেন মেনেই নিয়েছি। 

সাততলা বস্তিতে আগুন এবারই প্রথম না। এখানেও আগুনের ঘটনা মোটামুটি নিয়মিতই। হিসেব বলছে আগুনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সখ্য বনানীর কড়াইল বস্তির। গত ১০ বছরে বস্তিটি পুড়েছে ১৭ বার; গত তিন বছরে পুড়েছে ছয়বার।

এসব আগুন নিছক দুর্ঘটনা বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। ভাড়া বা চাঁদা নেয়ার ক্ষেত্রে সামান্য তারতম্য হলেই বস্তিতে চলে উচ্ছেদ। আর এই উচ্ছেদের ঘৃণ্য-কৌশলি পথ হলো 'অগ্নিকাণ্ড-থেরাপি'; অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব করে তাদের সরিয়ে দেওয়া। 

বস্তির ঘিঞ্জি ঘর, ঘন স্থাপনা, বাঁশ-কাঠের ব্যবহার আগুন দ্রুত ছড়াতে সহায়ক হয়ে থাকে। আজকের আগুন সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি যে প্রাথমিক সম্ভাবনার কথা বলেছেন- তাই হয়তো ঠিক। কিন্তু সব ঘটনার মূল এখানে নয়। এর পেছেনে থাকে অনেক রাঘব বোয়াল, থাকে নানা স্তরের স্বার্থ। আধিপত্য বিস্তার ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলদারিত্বের কারণেই একের পর এক বস্তিতে আগুন লাগানো হয়।

আজ (সোমবার) আগুনের ঘটনার পর ঢাকা উত্তরের মেয়র একটি গুরুত্বপুর্ণ কথা বলেছেন, ‘বস্তিবাসীরা আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তাদের উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা মোতাবেক কাজ করা হচ্ছে।’

ফলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যেন বাস্তবায়ন হয়। বস্তিবাসীদের যেন আদার (other) করে রাখা না হয়। তাহলে উন্নয়নের ডামাডোল যতই বাজুক, তার ফল আসবে না। তারা ‘আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই বিবেচনা সক্রিয় রেখে প্রতিটি আগুনের পেছনের কারণ তদন্ত করে বের করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। মানুষের সর্বস্ব হারানোর আহাজারিতে বাতাস আর ভারি না হোক। রোমে আগুন দিয়ে নিরোদের বাঁশি বাজানোর কুৎসিত সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়