রোববার

১৩ জুন ২০২১


৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮,

০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

আসুন, প্রতিরোধ করি ‘সেপটিক ট্যাংক হত্যাকাণ্ড’

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৪২, ৮ জুন ২০২১  
আসুন, প্রতিরোধ করি ‘সেপটিক ট্যাংক হত্যাকাণ্ড’

ফাইল ছবি

পত্রিকার পাতায় হামেশাই দেখা মেলে- সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে মৃত্যু। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর সংখ্যা হয় একাধিক। আজ (মঙ্গলবার) দিনবদলবিডি.কম ঢাকার নবাবগঞ্জে সেপটিক ট্যাংকে নেমে দুই শ্রমিকের মৃত্যুর সংবাদ দিয়েছে। 

সেপটিক ট্যাঙ্ক ক্রমেই এক নিরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশের মতো তুলনামূলক অনুন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের দেশে সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করার কাজটা আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়াই ম্যানুয়ালি করা হয়ে থাকে। প্রায়ই যার ফল হয় ভয়াবহ। নিয়মিতই এই ধরনের কাজে নিয়োজিত নিম্নবর্গের মানুষের অসহায় আর নির্মম মৃত্যুর খবর আসে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিকটিমের সংখ্যা হয় একাধিক। কারণ কেউ একজন ট্যাঙ্কে নামার পর সাড়াশব্দ না পেয়ে ওপরে অপেক্ষমান ব্যক্তিরা যখন নামে, তখন তারাও একই পরিণতির শিকার হয় এবং উঠে আসতে পারে না। 

এসব ঘটনা অনেক সময় ব্যাপক ও ট্র্যাজিক আকার নেয়। ২০১৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সে বছর প্রথম দশ মাসে সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে মারা গেছেন ৩৫ জন। মনে থাকবার কথা ২০১৮ সালে বগুড়ায় এক দুর্ঘটনায় একে একে ঝরে ৬ প্রাণ। দমকল বাহিনী সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে ম্যান-হোল, কূপ, পানির ট্যাংক এবং সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩৮টি দুর্ঘটনায় উদ্ধারের জন্য দমকল বাহিনীর ডাক পড়েছে। ঐ সব দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৩ জন মারা গেছে, আহত হয়েছে ২১ জন। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জে সেপটিক ট্যাংকে নেমে ৮ ব্যক্তির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২০২০ বা ২০২১ সালেও এর ধারাবাহিকতা চলছে। থামছে না অপরিণামদর্শী ও অবহেলাজনিত নির্মম মৃত্যুর মিছিল। 

আজকের ঘটনার পাশাপাশি মনে করা যায় এ মাসের ৫ তারিখে ভোলায় সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে মারা গিয়েছে ২ শ্রমিক, গত মাসে কুষ্টিয়ায় সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে প্রাণ যায় আরো দুই শ্রমিকের। এমন ঘটনা প্রতিমাসেই ২/১টি ঘটছে।  

ঘটনাগুলোর ধরনও সাধারণত অভিন্ন থাকে। এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত দেখা যায়, কেউ একজন ময়লা পরিষ্কার করার জন্য ট্যাঙ্কে নামেন। বিষাক্ত গ্যাস নাকে ঢোকার পর তিনি অন্ধকার ট্যাঙ্কের মধ্যেই অচেতন হয়ে যান। সাড়াশব্দ না পেয়ে ট্যাঙ্কের ওপরে থাকা লোকেরাও পর্যায়ক্রমে নেমে যান বিষাক্ত কূপ বা ট্যাংকে এবং যথারীতি তারাও মারা পড়েন। প্রতি মাসেই এমন ঘটনা কোথাও না কোথাও ঘটছে। কিন্তু তাতেও সাধারণ মানুষের হুঁশ হয় না। জেনেশুনে বিষাক্ত পোটকা মাছ খেয়ে মারা যাওয়ার মতো একই কায়দায় সেপটিক ট্যাংক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা মরতে থাকেন।

সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সেপটিক ট্যাঙ্ক বদ্ধ থাকার ফলে বিষাক্ত গ্যাস ক্রমশ ঘন হতে থাকে, এবং সেই সঙ্গে অক্সিজেনের স্বল্পতা তৈরি হতে থাকে। কখনো কখনো এ ধরনের বদ্ধ কূপ একেবারে অক্সিজেন শূন্য হয়ে যেতে পারে। সেখানে অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন সালফাইড, সালফার ডাই অক্সাইডসহ সালফারের অন্যান্য গ্যাস, মিথেন, এমনকি বিষাক্ত কার্বন মোনোঅক্সাইড তৈরি হয়। যার ফলে বিষাক্ত গ্যাসে খুব দ্রুতই জ্ঞান হারিয়ে মৃত্যু হয় শ্রমিকদের। 

আমরা সমস্ত ধরনের কাজের ক্ষেত্রে একটি প্রমো ব্যবহার করি- সেইফটি ফার্স্ট। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, নির্মাণ সংস্কার বা উদ্ধার কাজের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী খুব গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা 'এই কথাটা' আমাদের ক্ষেত্রে অনেকটাই যেন কাগুজে। বড় ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কন্সস্ট্রাকশনের কাজে শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনা নিত্যই ঘটছে। আমাদের অবশ্যই 'সেইফটি ফার্স্ট' নীতি অনুসরণ করতে হবে। 

সেপটিক ট্যাঙ্কে নেমে মৃত্যুর ক্ষেত্রে আমরা কোনো ধরনের সহায়তার খবর পাই না। পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুর পর তারা সরকারি-ব্যক্তিগত সহায়তার বাইরেই থেকে যায়। মানবসৃষ্ট এসব দুর্যোগের পর শ্রমিকদের এই মৃত্যু 'অপমৃত্যু' হিসেবে গণ্য হয়। অথচ এগুলোকে নিয়মতান্ত্রিক হত্যাকাণ্ড বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না। 

আমাদের দেশে এসব ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। চাইলেই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ নেই। তবু সীমিত সম্পদের মধ্যেই 'সেইফটি ফার্স্ট' নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা সেপটিক ট্যাঙ্কের দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু সাধারণ পরামর্শ দেন যার মধ্যে রয়েছে কুপি টেস্ট। অর্থাৎ কোনো কুপি, হ্যারিকেন বা মোম জ্বালিয়ে কায়দা করে দড়িতে বেঁধে সেপটিক ট্যাঙ্কের ভেতর তা আগে নামিয়ে দেওয়া। নিচে নামানোর পর যদি তা নিভে যায় তাহলে বুঝতে হবে,  সেখানে অক্সিজেনের সঙ্কট ও বিষাক্ত গ্যাস রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এসব ট্যাঙ্কে নামা যাবে না। উচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করে অক্সিজেন মাস্ক পরে নামা লাগবে। 

যে কোনো দুর্ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত থাকে অনেক কান্না। শ্রমক্ষম কারো মৃত্যু একই সঙ্গে একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। বিশেষত দরিদ্র শ্রমিক পরিবার হলে তো কথাই নেই। তাই এসব দুর্ঘটনায় মালিকের গাফিলতির জন্য তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, ক্ষতিগ্রস্তের জন্য জরিমানা আদায় নিশ্চিত করা জরুরি। এর চেয়ে জরুরি, কাগুজে বাঘ 'সেইফটি ফার্স্ট' নীতির বাস্তব প্রয়োগ।

দিনবদলবিডি/এস

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়