শুক্রবার

০৬ আগস্ট ২০২১


২২ শ্রাবণ ১৪২৮,

২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

গেটে তালা লাগিয়ে হত্যাকারীদেরকেও যদি একইভাবে...

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:৩২, ১১ জুলাই ২০২১   আপডেট: ২০:৩৫, ১১ জুলাই ২০২১
গেটে তালা লাগিয়ে হত্যাকারীদেরকেও যদি একইভাবে...

ছবি: দিনবদলবিডি

‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ বলে কবি নবারুণ ভট্টাচার্য যে পলায়নের রাস্তা বের করেছেন, আমরা সেই পথে যেতে পারি না। হ্যাঁ, এই মৃত্যু উপত্যকাই আমার দেশ। কিন্তু এদেশে যারা অপকর্ম করে তার দায় আমরা নেবো না। এর দায় সাধারণ জনগণ নেবে না। আমরা দিতেও পারি না। যার দায় তাকেই নিতে হবে। সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজ কারখানায় (সেজান জুস) অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুর দায় এর কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে, নিতে হবে সেইসব ব্যক্তিদেরও যারা এসব ভবনের অনুমোদন দিয়েছেন, ঠুনকো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

আমাদের দেশে ‘ক্ষমাহীন অবহেলাজনিত কারণে’ আগুন লাগা নতুন কিছু নয়। ভবনের নকশায় ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি সাধারণ টেকনিক্যাল সমস্যায় আগুন লেগে মানুষ পুড়ে কয়লা হলেই আমরা শুধু জানতে পারি। এর আগে নয়। যেন অগ্রিম প্রস্তুত করা রেডিমেড রেসিপি... ভবন নির্মাণে ত্রুটি, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত বা ছিলো না! কিন্তু বছরের পর বছর তারা এই অবস্থাতেই ‘বৈধ’ হিসেবেই কাজ চালিয়ে যায়। শুধু আগুন লাগলেই; না কথাটা ঠিক হলো না- কেবল লাশের সারি দীর্ঘ হলেই আমরা এই আজগুবি গল্প শুনতে পাই। 

আপনাদের স্মৃতি খুব খারাপ না হলে তাজরিনের আগুনের তাপ এখনও আপনার গায়ে লাগার কথা। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর ১১৭ জন মানুষ নির্মমতম কায়দায় পুড়ে কয়লা হয় তাজরিন গার্মেন্টসেই। ফি বছর সংখ্যাতীত ছোট বড় আগুনের ঘটনা ঘটে। রানা প্লাজার মতো গণখুনের ঘটনাও আমাদের সামনেই ঘটেছে। সব জায়গাতেই ‘রানাদের’ পিণ্ডি ‘জজমিয়াদের’ ঘাড়ে চাপানোর একটা ব্যাপার খেয়াল করা যায়। এ যেন, যার গলায় আংটা লাগানো যায়, তাকে ধরেই ফাঁসিয়ে দেওয়া! কিন্তু এইসব ঘটনা শুধু একটা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।  একটির সঙ্গে অপরটি সম্পর্কিত। এক মহা-দুর্নীতির আন্তঃসম্পর্ক এদের মধ্যে রয়েছে। শুধু একটা ফ্যাক্টরির মালিক কিংবা ম্যানেজমেন্ট নয়, যারা এসবের অনুমোদন দেয়, সেইসব দুর্নীতিবাজদেরও শাস্তির আওতায় আনা আবশ্যক। যা প্রায় কখনোই দেখা যায় না। 

২০ বছর আগে স্কুলের রচনায় যেমন লেখা হতো, বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এখন আর তেমনটি হয় না। বাংলাদেশের নয়া অর্থনীতি প্রধানত দুইটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে। যার একটি রেমিটেন্স, অপরটি তৈরি পোশাক খাত। আমরা আমাদের কর্মীদের নিয়ে গর্বও করি। সারা দুনিয়ার বড় বড় দেশ 'মেড ইন বাংলাদেশ পোশাক' এর কদর। কিন্তু এর পেছনে কত নির্মম অসহায় মৃত্যু, কত বুকফাটা তপ্ত অশ্রু জড়িয়ে থাকে তা হয়তো আমরা ভুলে যাই।

আমাদের সব কারখানা মালিককেই খুনি বলার এখতিয়ার নেই। বাংলাদেশে এমন কারখানাও আছে, যেগুলোর কর্মপরিবেশ পৃথিবীর যে কোনো দেশের সঙ্গেই তাল তুলনা যোগ্য। কিন্তু অনেক ফ্যাক্টরিই আছে, যেখানে তারা তাদেরই কর্মীদের জন্য অনায়াস আর বীভৎসতম মৃত্যুর ফাঁদ পেতে রেখেছে। 

সেজানের ফ্যক্টরিতে যা ঘটেছে (সাম্প্রতিক বলে নমুনা হিসেবে নিলাম, আসলে সব ঘটনাই প্রায় এই রকম), তা হত্যাকাণ্ডের নামান্তর। আগুন লাগলে, যেকোনো দুর্ঘটনার জন্যই এক্সিট পথ থাকে, খোলা রাখতে হয় দ্রুত বের হয়ে যাওয়ার রাস্তা। এখানে আমরা উল্টা ঘটনা দেখলাম। গেট তো বটেই, ফ্লোরগুলোতেও তালা দেওয়া ছিলো। আগুন লাগার পর শ্রমিকরা বাঁচার জন্য দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। এ সময় অনেক শ্রমিক জীবন বাঁচানোর জন্য বিল্ডিং থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে। আগুন বেড়ে যাওয়ার পর ফ্লোরের গেট খুলে। এরইমধ্যে কেউ কেউ ধোঁয়ায় অজ্ঞান হয়ে যায়। এর মধ্যে জানা গেছে, চতুর্থতলা তালাবদ্ধই ছিলো! 

এমন তালা বন্ধ রাখার বজ্জাত সংস্কৃতি নতুন না। আগের আরো দশটি ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, বারবার একই চিত্র। তালা বন্ধ, কলাপসিপল গেট বন্ধ, গেট বন্ধ... মৃত্যু, পুড়ে কয়লা, অজ্ঞাত অবহেলিত শ্রমিকের লাশ, ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’। আত্মীয়দের ইন্দ্রিয় অবশ করা দাবি, ‘আমাদের হাড্ডি খুঁজে দিন’। কান্নায় ভারি হয়ে যাওয়া আকাশ বাতাস। 

আর কি? আর কতো অসহায় আত্মসমর্পন? আর? আর কত? আইন? আইনের চোখ বাঁধা? না! সময় এসেছে, প্রতিটি মৃত্যুর যথাযথ বিচারের। সেই কথাটি মনে হয়, একটি মৃত্যু দুঃখের, অনেক মৃত্যু হয় 'পরিসংখ্যান'। আরে ভাই, সেটা আপনার জন্য পরিসংখ্যান। কিন্তু যার বাবা/মা/ভাই/বোন/স্বামী/স্ত্রী/সন্তান মারা গেছে তার জন্য তা এক ভয়াবহ ঘটনা, কিছু মৃত্যু আছে পালকের মতো হালকা, কিছু মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারি। প্রতিটা মৃত্যু তার পরিবারের জন্য পাহাড়, সেই পাহাড় তাকে বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন। নির্ভরশীল ব্যক্তিরা হয়ে যায় অসহায়। তাজরিনের শতাধিক, রানা প্লাজার হাজারের অধিক বা সেজান জুসের পঞ্চাশের অধিক, এই সবাই আলাদা ব্যক্তি, সবার আলাদা পরিবার আছে। এদের অধিকাংশই ছিলেন পরিবারের প্রধান রোজগেরে ব্যক্তি। কিন্তু তারা তাদের পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পাচ্ছে ‘কয়লার বস্তা’! 

এরইমধ্যে প্রথমে কুড়ি হাজার ও পরে প্রতি মৃত শ্রমিকের পরিবারকে দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ (?) দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু যারা মারলো তাদের দায় কোথায়? সরকার টাকা দিচ্ছে। ভালো কথা কিন্তু অবশ্যই কারখানা কর্তৃপক্ষকে উপযুক্ত ক্ষতিপুরণ দিতে বাধ্য করতে হবে। আর যাদের অঙ্গহানি হয়েছে, কর্মে ফেরা সম্ভব না, তাদেরকে আজীবন ভাতা প্রদান করতে বাধ্য করতে হবে। 

নিষ্ঠুরতাকে নিষ্ঠুরতা দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না। চোখের বদলে চোখ নিলে সারা দুনিয়া অন্ধ হয়ে যেতো, রাষ্ট্র তা করতে পারে না। তারা আইন প্রয়োগ করবে। কিন্তু সংক্ষুব্ধ কারো মতো ভেবে দেখুন, আগুনে পুড়ে যারা মারা গেছেন, যারা গেটে তালা লাগিয়ে তাদের মেরেছে, তাদেরকেও যদি একইভাবে... না তা হয় না। 

আগুনে পুড়িয়ে অর্ধশতাধিক শ্রমিক হত্যা করার পরও দম্ভ করে যিনি ‘শ্রমিক মরলে দায় কেন নেবেন’ বা ‘ইন্ডাস্ট্রি করে ভুল করেছেন’ ইত্যাদি বলা সেই মালিক আবুল হাশেমসহ তার পুত্রদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের আইনের আওতায় দ্রুত নিয়ে আসাটা স্বস্তির। সমগ্র জাতি চায়, দ্রুততম সময়ে এই ঠান্ডা মাথার ঘাতকদের শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। প্রয়োজনে তাদের সম্পত্তি ক্রোক করে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রদান করা হোক। শহিদ শ্রমিকদের আত্মার অভিশাপ থেকে নইলে আমাদের মুক্তি মিলবে না। কথাটা হয়তো অনেকেই হৃদয়ঙ্গম করছেন না...

দিনবদলবিডি/এমআর

পাঠকপ্রিয়