শুক্রবার

০৬ আগস্ট ২০২১


২২ শ্রাবণ ১৪২৮,

২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

ডেঙ্গু: ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দর্শন 

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৮, ১৭ জুলাই ২০২১  
ডেঙ্গু: ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দর্শন 

ফাইল ফটো

বাংলাদেশ করোনা মহামারিতে এক ভয়াবহ সময় অতিক্রম করছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২৭৮ জনে। প্রতিদিনই ২০০ এর অধিক মৃত্যু দেখতে হচ্ছে। মোট শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১০ লাখ ৭১ হাজার ৭৭৪ জন। তৃতীয় বিশ্বে টিকার জন্য হাহাকার। আমরাও এর বিশেষ ব্যতিক্রম নই। এরইমধ্যে মরার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে আঘাত হেনেছে ডেঙ্গুজ্বর।

শুক্রবার দিনবদলবিডি.কম এর দেওয়া সংবাদ থেকে জানা যায়, অতি সম্প্রতি রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তিনশ’ ছাড়িয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর সরকারি হাসপাতালে ২৯৯ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে চারজনসহ মোট ৩০৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন। করোনা পরিস্থিতির এই ভয়াবহ সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ স্বাস্থ্য খাতের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

গত বছর (২০২০ সাল) তুলনামূলক কম আক্রান্ত থাকলেও ২০১৯ সালে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করেছে বাংলাদেশ। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মৌসুমে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এত রোগী কখনোই হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। এমনকি এই সংখ্যা গত ১৯ বছরে দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে দেশে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত ১৯ বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মোট রোগী ৫০ হাজার ১৭৬ জন। ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারায়। আর সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১৭৯। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ওই বছর সারাদেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন।

এবারও যদি পরিস্থিতি খারাপ হয়, তাহলে সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এরমধ্যে সিটি কর্পোরেশনের মশক দমন যেমন আরো বেগবান করা প্রয়োজন, একই সঙ্গে এডিস মশা যেন ডিম দিতে না পারে সেজন্য বাড়ির আঙিনায়, ফুলের টবে বা পানি জমে এমন যেকোনো জিনিসের দিকে নাগরিকদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, সিটি কর্পোরেশন অনেক কাজে সাফল্য দেখালেও মশা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সাফল্যের দেখা পায়নি। এটি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের জন্যই প্রযোজ্য। তারা নিয়মতো ফগ মেশিন দিয়ে ফগিং করা থেকে শুরু করে মাছ-ব্যাঙ-হাঁস সব কিছু দিয়েই চেষ্টা করেছে। মানহীন মশা মারার বিষ ও অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি ঘটায়নি। যদিও বর্ষা শুরু হওয়াতে খাল-বিলের জলাবদ্ধতা সরে গিয়ে অনেক মশা কমেছে। কিন্তু বেড়ে গেছে এডিস মশার উপদ্রুপ।

এতো গেলো প্রতিরোধের কথা। কেউ আক্রান্ত হলে এই কোভিড পরিস্থিতিতে প্রতিকার পাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়বে। এর পেছনের প্রধান কারণ, ডেঙ্গু আর করোনার লক্ষণের সাযুজ্য। করোনার মতো ডেঙ্গু মোটেই ছোঁয়াচে না হওয়া সত্ত্বেও সেবা পেতে বিলম্ব হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এই লক্ষ্মণ নিয়ে হাসপাতালে গেলে স্বভাবতই শুরুতে করোনা রোগী হিসেবে ধরে নেবে- তখন প্রথমেই করোনা টেস্ট করতে হবে। এ কারণে মূল চিকিৎসায় যেতে বিলম্ব হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, কিছু লক্ষণ এবং উপসর্গ আছে যেগুলা শুরুর দিকে ডেঙ্গুজ্বর এবং কোভিড১৯-এর ক্ষেত্রে একই রকম। সেক্ষেত্রে অনেক রোগীর ডেঙ্গু জ্বর এবং কোভিড১৯- দুটোর পরীক্ষা একসঙ্গে করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শর্মিলা হুদা সম্প্রতি একটি সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর জ্বর, গায়ে ব্যথা, মাথা ব্যথা এবং চোখের পেছনে ব্যথা থাকে। সাধারণত এ ধরনের লক্ষণ থাকলে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় না, কারণ হাসপাতালগুলো এখন কোভিড রোগীতে পরিপূর্ণ। তবে পরিস্থিতি যদি জটিলতার ইঙ্গিত দেয় তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হতেই হবে। সেক্ষেত্রে বিকল্প নেই।

ফলে এখন এই লক্ষ্মণ নিয়ে হাসপাতালে গেলে একই সঙ্গে দুইটি টেস্ট করাতে হচ্ছে।

দেশের স্বনামধন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ সম্প্রতি জানিয়েছেন, ডেঙ্গুজ্বর এবং কোভিড-১৯  দুটোই ভাইরাসজনিত রোগ হলে দুটোর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। একই রোগী কোভিড এবং ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। দুইটার ক্ষেত্রেই জ্বর, গলা ব্যথা, সর্দি, কাশি এবং স্বাদবোধহীনতা থাকতে পারে। করোনার ক্ষেত্রে এসব লক্ষণের সঙ্গে রোগী নাকে কোনো ঘ্রাণ না পাওয়া এবং কারো কারো পাতলা পায়খানা হয়।

আমরা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু তাদের কথা এত দিন যা জেনে এসেছি, সেটা হলো করোনা হলে যদি অন্য কোনো অসুখ ওই ব্যক্তির থেকে থাকে তাহলে সে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। একই কথা আমরা ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রেও জানি। এই দুই ভাইরাসের আক্রমণ যদি একই ব্যক্তির দেহে একই সঙ্গে হয়, তাহলে সঙ্গত কারণেই সেই ব্যক্তির ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে।

করোনার কারণে স্বাস্থ্য সেবার প্রধান মনোযোগ এখন এ খাতে। কিন্তু ডেঙ্গু এই সুযোগে তার ভয়াল থাবা বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালে ১ লাখের বেশি মানুষকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। এবারের অবস্থা তেমন হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া খুবই কঠিন হয়ে যাবে।

আমরা আশা করি, তেমন হবে না। এই রোগের মরুতে আশা যেন মরীচিকা না হয়। তাই সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সরকারের স্বাস্থ্যখাতসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকেই ডেঙ্গু নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে হবে। আমরা যে ভাই ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয়ে কুঁকড়ে যাই- যেন জানা-অজানা কোনো আগুনে পুড়বো ফের!

দিনবদলবিডি/কে

পাঠকপ্রিয়