বৃহস্পতিবার

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১


৮ আশ্বিন ১৪২৮,

১৩ সফর ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

সূঁচের যন্ত্রণাই অসহ্য, ফালের জ্বালা কিভাবে সইবো!?

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ৩১ আগস্ট ২০২১  
সূঁচের যন্ত্রণাই অসহ্য, ফালের জ্বালা কিভাবে সইবো!?

সংগৃহীত ছবি

বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক আনন্দের আবহ বিরাজ করছে এখন। বহুল প্রতীক্ষিত উড়ালপথে রেল যোগাযোগের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছি আমরা। পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রীবিহীন মেট্রোরেল চালু হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য আনন্দের সময়। মোদ্দাকথা স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় আরো এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। খুব দ্রুতই মানুষ যাতায়াত করতে পারবে এই মেট্রো রেল বা স্কাই ট্রেনে। কিন্তু এমন খুশির দিনটিতেও (২৯ আগস্ট) একটি দৈনিকে ১৩৬ কোটি টাকা খরচায় করা বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটের অকেজো পড়ে থাকার সংবাদও ছেপেছে। এ যেনো আলো আঁধারের এক অস্বাভাবিক বাইনারি।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটা-আপ্যায়ন ইত্যাদিতে বড় বড় দুর্নীতির ঘটনায় আজকাল আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত হই না। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশকাণ্ড কিংবা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে পর্দার অস্বাভাবিক দামের ঘটনার পর এ রকম দুর্নীতি বিস্মিত করে না।

তারপরও মাঝেমধ্যে এমন কিছু দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে আসে, যা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। গত বছর এক প্রকল্পে এক টাকাও ছাড় হয়নি, খরচ দেখানো হয়েছিলো ২২ কোটি টাকা! এটি ঘটেছে সম্ভাবনাময় উদ্যোগে সহায়তা করতে গঠিত সরকারের ইইএফ বা ইক্যুইটি এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ডে; যার পরিবর্তিত নাম ইএসএফ বা ইক্যুইটি সাপোর্ট ফান্ড। এ তহবিলে অর্থ ছাড়ের আগেই সেখানে অবিশ্বাস্য দুর্নীতির খবর সামনে আসে। সেখানে দেড় বছরে বিভিন্ন কমিটির বৈঠকে সম্মানী ও আপ্যায়নে প্রতি কার্যদিবসে খরচ হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। যাতায়াত, মোটরগাড়ি রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খাতেও অবিশ্বাস্য খরচের হিসাব দেখানো হয়েছে। এমন বিষয় হামেশাই ঘটছে। 

সম্প্রতি একটি সেতু সম্বন্ধিত তথ্যচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। বান্দারবানের রুমায় সেই সেতুর শেষ প্রান্তে রয়েছে প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু এক বিশাল পাহাড়। এরপর রয়েছে আরো কয়েকটি ছোট-বড় পাহাড়। এতে সেতুটি কোনো কাজে আসছে না এলাকাবাসীর।  ৪ কোটি ১৪ লাখ ১৫ হাজার ২৪১ টাকা ব্যয়ে এমন এক গার্ডার সেতু নির্মাণ করেছে বান্দরবান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কর্তৃপক্ষের অমন স্বেচ্ছা-সজ্ঞান বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতাকে তিরস্কার করছেন রুমাবাসীসহ সেতুটি দেখতে আসা অনেকেই। তারা মনে করছেন, চুপিসারে সরকারি অর্থ আত্মসাতের জন্যই নির্জন এলাকায় সুউচ্চ পাহাড়ের পাদদেশে করা হয়েছে এই গার্ডার সেতুটি। তবে এর কিছুটা লাগসই ব্যবহার অবশ্য স্থানীয়রা করছেন। সেখানে তারা এখন ফসল শুকায়, কাপড় শুকায়, গরুবাছুর বাঁধে। 

সেতু নিয়ে এমন তেলেসমাতি কারবার খোদ ঢাকাতেও ঘটেছে। সম্প্রতি প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মান্ডার ‘শেষ মাথা’ নামে পরিচিত এলাকায় একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) নির্মিত এ সেতুটির আশপাশে মানুষের বসতি গড়ে ওঠেনি, তারওপর নেই চলাচলের কোনো রাস্তাও। অভিযোগ উঠেছে, একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধার্থে এ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং স্থানের বিবেচনায় সেতুর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ সিটি কর্পোরেশনেরই কয়েকজন কর্মকর্তা। কিন্তু এই এই ধরনের একের পর এক তুঘলকি কাণ্ডে প্রশ্ন যতই উঠুক, নীতি-নৈতিকতা আর দায়িত্ববোধের মাথা খাওয়া বিবেকের চোখে ঠুলি পড়ানো ব্যক্তিরা এমন অপকর্ম ঘটিয়েই যাচ্ছে একের পর এক। 

ঢাকায় একাধিক ফ্লাইওভারের কাজের শেষ দিকে এসে নকশায় সমস্যা আবিষ্কার হয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ আর সরকারি অর্থের অপচয় আমরা দেখেছি। 

সম্প্রতি সংবাদপত্রে এসেছে, বসিলা সেতুও ভেঙে ফেলতে হবে!

কারণ বর্ষায় নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে এর তলা দিয়ে তুলনামূলক বড় নৌযানগুলো চলাচল করতে পারে না, সেতুতে বেঁধে যায়। সব ঋতুতেই নদীর পানির উচ্চতা মাথায় রেখে সেই বিবেচনায় যথেষ্ট দূরত্ব হিসাবে রেখেই তো সেতুগুলো নির্মিত হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে এমন হলো কেন? এইসব কাজের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক, জনপ্রতিনিধি, অর্থ যোগানদাতা, কাজের গুণমানের পরিদর্শনকারী- সবাইকে দেখে জবাবদিহির আওতায় আনা হোক, এসব ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়। কারণ এমন আরো হাজারো ঘটনা ঘটে চলেছে। 

একটি দৈনিকের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে, দেশব্যাপী অব্যবহৃত পড়ে থাকা পৌনে তিন হাজার ছোট-বড় সেতু এবং বছরের পর বছর ধরে অসমাপ্ত পড়ে থাকা আরো কয়েক শ সেতুর যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য একইসঙ্গে হজমের অযোগ্য। এতে আমাদের জাতির স্বার্থ জড়িত আছে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা সাকারের পথ কণ্টকাকীর্ণ হওয়ার কষ্টকর বাস্তবতা দৃশ্যমান এখানে। এটা যারা চোখ বুজে কানে আঙুল দিয়ে সহ্য করে যাবেন তারা আর যাই হোক- বাংলাদেশকে ভালবাসেন না।

'সোনার বাংলা' নামে এক নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কথা অনেকের মনে থাকবার কথা। তারা আগে সেতু না করে টাকা মেরে দিয়ে কেমন করে যেন আর কাজ করতো না। পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হলেও তাদের কিছুই হতো না। এখন যুগ কিছুটা পাল্টেছে বটে। কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আরো চতুর হয়েছে দুর্নীতিবাজরা। 

আজকের প্রসঙ্গে ফেরা যাক। বালাসী-বাহাদুরাবাদ ঘাটে যে যে নৌ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে তার সবই বর্তমান আছে। বাহাদুরাবাদ ঘাটে সুন্দর স্থাপনা, বিশাল গেট, টোল আদায় বুথ, পুলিশ-আনসার ক্যাম্প, ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, নাবিকদের ব্যারাক, বিদ্যুতের জন্য সাব-স্টেশন, মসজিদ, বিশ্রামাগার ইত্যাদি সবই আছে... নেই শুধু ফেরি চলাচলের মতো অবস্থা। 

জানা গেছে প্রকল্পটি তাড়াহুড়া করে নেওয়া হয়েছে। এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ড্রেজিং করে একটি চ্যানেল করা হয়েছিলো যা এখন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বদলে গেছে নদীর বাঁক। ফলে এখানে ফেরি চলাচল সম্ভব না। এর দায় কেউ নিচ্ছেন না। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একে অন্যকে দোষারোপ করে নিজেদের দায় সারছেন। কিন্তু এর মধ্যে হাওয়া হয়ে গেছে সরকাররের তথা জনগণের সম্পদ থেকে ১৩৬ কোটি টাকা। এত টাকা ব্যয় করার পরও এক টাকার উপকারও পেলো না এই রুটে চলাচল করা লাখ লাখ মানুষ। 

বর্তমান সরকারের আমলে ব্যাপক অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে, হচ্ছে। এসব দেখে দেখে আমাদের ধারণা হচ্ছে- বাংলাদেশে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে বিবেচনাটি মুখ্য হওয়া উচিত সেদিকে খেয়াল করছে না সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্নটি হল, এ উন্নয়নের জন্য কত ব্যয় হচ্ছে। Development at what cost? এই মৌলিক প্রশ্নটি বিবেচনায় না নিলে উন্নয়ন টেকসই হবে না, উন্নয়নের জন্য ব্যয় এবং উন্নয়ন থেকে প্রাপ্ত সুফল যৌক্তিক বলে বিবেচিত হবে না। যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে Cost-Benefit হিসাব করতে হয়। প্রকল্পটি গ্রহণযোগ্য কিনা তা নির্ধারণ করতে অবশ্যই দেখতে হবে Cost I Benefit-এর অনুপাত কী দাঁড়াচ্ছে? Cost যদি Benefit কে ছাড়িয়ে যায় তাহলে সেরকম প্রকল্প গ্রহণের কোনো যৌক্তিকতা থাকে না (অবশ্য এসব ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক হিসাব নয়, সামাজিক ক্ষেত্রে কি ভূমিকা নেবে সেই হিসেবও জরুরি। এবং কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতির চেয়ে সামাজিক উন্নয়ন বেশি দেখা প্রয়োজন)।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বারবার অপচয় রোধের ব্যাপারে সচেতন হতে বলে চলেছেন সবাইকে। পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যাদের গাফিলতিতে অর্থ ও সময় অপচয় হয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। একনেকের এক সভাতেও তিনি অযাচিত প্রকল্প নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। অর্থের অপচয় ও দুর্নীতি রোধে প্রতিনিয়ত হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। কিন্তু তারপরও 'চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী' অবস্থা বিরাজমান অনেক ক্ষেত্রেই।

সরকার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা। এখানে অনেক স্টেকহোল্ডার থাকেন। বিভিন্ন উইং কাজ করে থাকে। অপ্রিয় হলেও সত্যি আমাদের দেশে দুর্নীতির এক মন্দ কালচার আছে। এসবের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে সরকারের সদিচ্ছার অনেক কিছুই নৈরাজ্যকর পরিণতি দেখবে। যা আখেরে কারোর জন্যই মঙ্গল আনবে না। আমরা যারা সংবাদকর্মী বা সংবাদিক, আমরা ভালো করেই জানি, স্বাভাবিক কোন ঘটনা বা কিছু আসলে 'খবর' নয়। অস্বাভাবিক কিছুর খবর মূল্য বেশি। মানুষ দেখে কি হয় নি- সেটা। স্বাভাবিক বা নিয়মমাফিক কী হলো- তা নিয়ে তাদের খুশির চেয়ে কী হয়নি, সেটা নিয়ে মাথা ব্যথা বেশি। আর স্বাভাবিক কারণেই যে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিকে দেশ যাত্রা করেছে তা বাধাগ্রস্ত করছে কিছু আমলা-নেতার খামখেয়ালিপনা আর দুর্নীতি। তাই এখনই সময় এর রাশ শক্ত করে টেনে ধরার। নইলে সূঁচ ফাল হতে বেশি সময় নেবে না। সূঁচের যন্ত্রণাই যেখানে অসহ্য সেখানে ফালের জ্বালা কিভাবে সইবো আমরা!?

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়