মঙ্গলবার

২৬ অক্টোবর ২০২১


১১ কার্তিক ১৪২৮,

১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

আহ্ বিশ্ববিদ্যালয়, আহ্ গবেষণা!

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৫৮, ৭ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ০৩:৪০, ৭ অক্টোবর ২০২১
আহ্ বিশ্ববিদ্যালয়, আহ্ গবেষণা!

ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিয়ে দেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেই সভায় প্রধানমন্ত্রীকে দেশে একটি গবেষণাপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয় করা যায় কি না অথবা অন্তত কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা যায় কি না, এই ব্যাপারে প্রশ্ন করেন একজন সিনিয়র সাংবাদিক। প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার নিজের গবনেষণার ক্ষেত্রে আগ্রহ ও অনুদানের কথা সবিস্তারে বলেছেন। একই সঙ্গে দেশে যোগ্য গবেষকের যে অভাব, সেটার কথাও বলেছেন। 

আজ একটি দৈনিক পত্রিকা দেশে গবেষণা নিয়ে অনাগ্রহ ও ব্যয় হ্রাস নিয়ে প্রধান সংবাদ করেছে। যেখানে হিসেব দিয়ে দেখানো হয়েছে দেশে গবেষণা খাতে সময়, শ্রম, মেধা দিতে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অনাগ্রহের কথা। 

দেশে বিজ্ঞান গবেষণা, কৃষি-মাৎস্য গবেষণা, পাট-তুলা গবেষণার মতো আলাদা গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকলেও প্রধানত গবেষণা ক্ষেত্র হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে যতটা আগ্রহ এর সিকিভাগ আগ্রহও গবেষণায় নেই। অথবা যারা গবেষণায় আগ্রহী, তারা এতই সংখ্যালঘু যে, অন্যদের চাপে তাদের প্রায় দেখাই যায় না। অথবা এই স্বাপ্নিক ও কর্ম উদ্যোগী মানুষগুলো আড়ালে থাকতেই বাধ্য হন।   

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং দেখে আমরা হামেশাই হতাশ হই, বুকে এক ধরনের অপ্রকাশিত চিনচিনে ব্যথা অনুভব করেন দেশ প্রেমিক জনগণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে মৌলিক গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি। শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে গবেষক বা শিক্ষার্থীরা গবেষণা করবেন; যা বাস্তবজীবনে মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই কেবল পাঠদান এবং পরীক্ষা নিয়ে গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরেও খুব যৌক্তিক কারণেই অবমূল্যায়িত হচ্ছে দেশীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। 

গত অর্থবছরে গবেষণা খাতে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের এক দশমিক ৬০ শতাংশ। সেখানে চলতি অর্থবছরে মাত্র এক শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

দৈনিক পত্রিকাটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বরাতে জানাচ্ছে, দেশে অর্ধেকের বেশি পাবলিক (সরকারি) বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ সালে কোনো গবেষণা কার্যক্রম হয়নি। আর দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষকের ব্যক্তিগত গবেষণা বা পিএইচডি ডিগ্রি নেই। আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। ওইসব প্রতিষ্ঠানের গবেষণা করার মতো যোগ্য সিনিয়র শিক্ষকের ঘাটতি প্রকট। মোট শিক্ষকের মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ অধ্যাপক, যাদের অর্ধেকই খণ্ডকালীন বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাড়া করা। শিক্ষকের পদোন্নতিতে গবেষণা প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তা প্রায়ই ‘প্রমার্জন’ পাচ্ছে বলে অভিযোগ আসছে।

এখানে আরেকটি বিষয় বলে নেওয়া জরুরি, আমাদের দেশে রাজনৈতিক ও অন্যান্য প্রভাব খাটিয়ে অনেক শিক্ষন নিয়োগ পেয়ে থাকেন। আরো তিক্ত সত্য হচ্ছে যে, প্রায় ক্ষেত্রেই তারা গবেষণা এমন কি শিক্ষকতা (টিচিং) করানোর কোনোরকম যোগ্যতাই রাখেন না। দেখা যায়, এরা চাকরির কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় না টিকলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে ঠিকই নিয়োগ পেয়ে যান। কারণ এখানে তেমন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা উৎরাতে হয় না। খুবই সাদামাটা পরীক্ষা আর বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচিত নিয়োগবোর্ডই নিয়োগ দেয়। অনেকক্ষেত্রে প্রার্থীর পছন্দের পরীক্ষক আনা হয়ে থাকে। এসব কারণে তাদের মধ্যে পড়ানো বা গবেষণা এড়িয়ে কোনোরকমে চাকরিটা চালিয়ে নেওয়া আর দলবাজি করে কাটিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। 

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে কিছু কাজ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান সৃষ্টি নাই বললেই চলে। আর কিছু ক্ষেত্রে গবেষণা হলেও সেসবের মান তথৈবচ! অনেকে টুকলিফাই করে ডক্টর হয়ে যাচ্ছেন। বাজারে একটা কথা চালু আছে- 'নীলক্ষেত ডক্টরেট'! এসবকেও বিবেচনায় নিতে হবে। খালি গবেষণায় অর্থ দিলেই হবে না, মানসম্মত গবেষক ও গবেষণার দিকেও নজর দিতে হবে।  

আমাদের দেশে ৮৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। নাম ধরে বললে নর্থ সাউথ বা ব্র্যাকের মতো বিশ্ববিদ্যালয় অনেক ভালোও করছে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল-পিএইচডি গবেষণার অনুমতি নেই। তবে ৮৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮৫টিই দাবি করেছে যে তারা বিভিন্ন হারে গবেষণার জন্য ব্যয় করেছে। এই দাবিদারদের মধ্যে শিক্ষকদের ১২ হাজার টাকা দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। তাই গবেষণায় আদৌ ব্যয় করা হয়েছে কি না- সেই প্রশ্ন উঠেছে। 

এর চেয়েও উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, এসব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিধারী বা সিনিয়র শিক্ষকের সংকটও প্রকট। মোট ১৬০৭০ শিক্ষকের মধ্যে অধ্যাপক মাত্র ২১১৩ জন, যা মোট সংখ্যা মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশ। তাদের মধ্যে আবার ১৩০৮ জনই খণ্ডকালীন।

তবে এসব ক্ষেত্রে মান বিবেচনায় নিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে এমফিল-পিএইচডি গবেষণার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। যেন তারা ৩-৫ টি এমফিল-পিএইচডি গবেষণা করার অনুমতি পায়। পরবর্তীতে এর সাফল্য বিবেচনায় বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া বা অন্য চিন্তা করা যেতে পারে।

চলতি বছর গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ শতাংশের হিসাবে কমেছে। এবার দেশের ৪৯টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ হাজার ৩২ কোটি ৮১ লাখ টাকা দিয়েছে সরকার, যা ইউজিসি বণ্টন করেছে। ওই অর্থের মধ্যে ৫ হাজার ৮৭৫ কোটি ৮১ লাখ টাকা রাজস্ব খাতে এবং ৪ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা উন্নয়ন খাতে দেয়া হয়েছে। রাজস্ব ব্যয়ের মধ্যে গবেষণা খাতে দেওয়া হয়েছে ১শ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের হিসাবে ১ শতাংশেরও কম। যদিও এই খাতে বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় ৫১ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু মোট বাজেটের দিক থেকে কমেছে। গত বছর এই খাতে মোট বাজেটের ১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ ছিল।

যেকোনো বিবেকবান নাগরিক এবং আমরাও মনে করি যে, শুধু অর্থ বা বাজেট বাড়ালেই হবে না- গবেষণার প্রতি ভালোবাসাও বাড়াতে হবে।  সংবাদ সম্মেলনে বলা প্রধানমন্ত্রীর কথা ধরে শেষ করা যাক, তিনি বলেছেন- গবেষণার জন্য আমাদের ফান্ড আছে। বিশেষ ফান্ড আছে। তবুও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য অনীহা তা আমি জানি না। অনেক শিক্ষক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। তারা টাকার মোহে না পরে গবেষণায় মনোযোগী হতে পারেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন- এই বিশ্বাস রাখতে পারলে ভালো বোধ করত সমগ্র জাতি।

দিনবদলবিডি/এমআর/জিএ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়