মঙ্গলবার

২৬ অক্টোবর ২০২১


১১ কার্তিক ১৪২৮,

১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

দাম বাড়ানোর বাড়াবাড়ি- কেন এমন হচ্ছে?!

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৩:২০, ১১ অক্টোবর ২০২১  
দাম বাড়ানোর বাড়াবাড়ি- কেন এমন হচ্ছে?!

সংগৃহীত ছবি

রাস্তায় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের সামনে দুপুরের তপ্ত রোদে ম্লান মুখে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। গুটি কয়েক হলেও, মধ্যবিত্তদেরও প্রতিনিধিত্ব সেখানে নজর এড়াচ্ছে না। তাদের সবার ক্লিষ্ট মুখগুলোর দিকে তাকালে এও বোঝা যায়, এই লাইনে দাঁড়িয়ে তারা মানসিকভাবে কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন। কিন্তু একটু কম দামের আশায় দীর্ঘ লাইন বা রোদ অথবা অস্বস্তি কোনোটাই গায়ে না মেখে দাঁড়িয়ে থাকা এক ধরনের অসম্ভবের পায়ে অসহায়ের হুমড়ি খেয়ে পড়ার বাস্তবতাই তুলে ধরছে। কারণ, কাফন-চোর স্বভাবের সিন্ডিকেটবাজদের বেপরোয়া কারসাজিকাণ্ডে নিত্যপণ্যের মূল্যেএখন দমে দমে বাড়ছে। এই বল্গাহীন দাম বাড়ার পেছনে আমরা কোনো যৌক্তিক যুক্তির দেখা পাচ্ছি না। কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্ন ভুক্তভোগী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর।    

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এই বছর এখন পর্যন্ত কোনো হিসাব প্রকাশ না দিলেও গত অক্টোবরে জানিয়েছিল, মানুষের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থ বছরে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। সেই হিসেবে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা আগের বছরের মতো দ্রব্যমূল্য থাকলেও অনেক কমে যেতো। কিন্তু মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হিসেবে লাগামহীন দ্রব্যমূল্য গরীব মানুষকে বেদিশা করে তুলছে। 

চাল, ডাল ও তেলের দামে অস্বস্তি আগে থেকেই ছিল, এ তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে পেঁয়াজ, আটা, ময়দা, মুরগি, ডিমসহ আরো কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। আজ দিনবদলবিডি.কমের নিউজ বলছে, বেসরকারি পর্যায়ে এলপিজি’র দাম মুসকসহ প্রতি কেজি ৮৬ টাকা ৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০৪ টাকা ৯২ পয়সা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। বাজারে দুই সপ্তাহে বেড়েছে পেঁয়াজ, মসুর ডাল, ব্রয়লার মুরগি, ডিম ও সবজির দাম। 

পেঁয়াজের দাম মোটামুটি দ্বিগুণ হয়ে গেছে। যে দেশি পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজিতে কেনা যেত, তা কিনতে এখন ৮০ টাকা লাগছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ টাকা ছুঁয়েছে, যা সাধারণত ১১০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে থাকে।  সাবান ও টুথপেস্টের মতো নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীর দামও বেড়েছে। মানুষের দারিদ্র্য বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি যোগ করলে তা আরো ভয়াবহ আকার নেয়। যার ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে জীবন যাপন অসহনীয় হয়ে উঠছে। 

গত বেশ কয়েকবছর দামবৃদ্ধির গতি সহনীয় থাকলেও গতবছর মার্চ মাসে দেশে করোনা হানা দেওয়ার পর থেকে অকস্মাৎ মূল্যস্ফীতি যেন বেঘোর মাতালে পরিণত হয়। বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বেশি দামে জিনিস বিক্রি হতে থাকে- এর পেছনে কলকাঠি নাড়েন রক্তচোষা ‘সিন্ডিকেটবাজ-ব্যবসায়ীরা’। মাত্র তো সেদিনের কথা- করোনার আবহে ৯০ টাকার হ্যান্ড সেনিটাইজারের দাম হয়ে যায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত, প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ পর্যন্ত বাজারে তিনগুণ দামে বিক্রি হয়েছে। চালের দাম বেড়ে যায়। বেড়ে যায় লেবুর দামও। তরমুজ বিক্রি হয় কেজি দরে! এখন ভাবতে অবাক লাগলেও তখন বড় লেবুর হালি কিনতে অন্তত ১০০ টাকা খরচ করতে হয়েছে, পুদিনার কেজি ঠেকে হাজার টাকায়। অবশ্য অর্থনীতির ভাষায় একে বলে আতঙ্কের কেনাকাটা বা ‘প্যানিক বায়িং’। প্যানিক বা অহেতুক আতঙ্ক কাটলে লেবু বা পুদিনার মতো জিনিসের দাম স্বাভাবিক হয়ে এলেও চাল-ডালের মতো নিত্যপণ্যের দাম কমে স্বাভাবিক হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ী নামের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী দুর্বৃত্তরা নানান ছুতোয় দাম বাড়িয়েই চলেছেন। 

একটি দৈনিকের রিপোর্ট সূত্রে টিসিবির ২০২০ সালের ১ মার্চ ও গত বৃহস্পতিবারের বাজারদরের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সে সময়ের তুলনায় এখন মোটা চালের গড় দাম সাড়ে ৩১ শতাংশ, খোলা আটার ২০, খোলা ময়দার ৩৩, এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল ৪৩, চিনির ১৯, মোটা দানার মসুর ডাল ৩০ ও গুঁড়া দুধের দাম ১৩ শতাংশ বেশি।

লক্ষ করার বিষয়, বছরের ব্যবধানে তেলের দাম বেড়েছে ৪৩ শতাংশ, চালের ৩১ শতাংশ। কিন্তু এর বিপরীতে সাধারণ মানুষের আয় কমেছে অন্তত কুড়ি শতাংশ। এই অবস্থায় মানুষ কেমন করে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনবে, পরিবার চালাবে? করোনায় অনেকের কাজ চলে গেছে। রাস্তায় আগের তুলনায় বেড়েছে ছিনতাই, বাসাবাড়িতে চুরি। এসবই একটি চেইন রিঅ্যাকশনের নমুনা। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমলে তার প্রভাব পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে সামাজিক-রাষ্ট্রিক সমস্ত জায়গাতেই পড়ে। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, চালের মজুত আছে, আছে পিঁয়াজের মজুতও। কিন্তু বাজার তো কথা শুনলো না। ৪০ টাকার পেঁয়াজ কিনতে এখন ৮০ টাকা লাগছে, কেন? এই নিত্য ব্যবহার্য মশলা পণ্যটির তো এখন কোনো সঙ্কট নেই। এর বাইরে ব্যবসায়ীরা বরাবরের মতোই বিশ্ববাজারের দোহাই দিচ্ছে। এর সত্যতা কিছুটা আছে। কিন্তু এখানে সমাধানের ভিন্ন পথে হাঁটার সুযোগও রয়েছে। তথাপি বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে যারা আছেন- তারা আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দোষ এড়াতে পারেন না। কারণ, এটা তো স্পষ্টই যে, আমাদের এখানে মনিটরের গাফিলতি রয়েছে। নইলে যে পণ্যের মজুদ আছে তা সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণ হয়ে যায় কেমন করে? 

অ্যাডাম স্মিথ আধুনিক বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়। তিনি বলেছিলেন, ব্যবসায়ীদের যেন প্রেসার গ্রুপ হিসেবেও না রাখা হয়। কারণ, তারা সব সময় ব্যবসা আর লাভের কথাই বিবেচনা করে। আমাদের দেশ এখন অনেক বেশি ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রিত। সরকারেও অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন। ফলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠ অনেক বেশি রুদ্ধ। কিন্তু বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারকে সবার কথাই ভাবতে হয়। দ্রব্যমূল্য একটি জটিল জালের মতো। মূল্যবৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক কোনো প্রপঞ্চ নয়। বরং অনেক বেশি রাজনৈতিক ও সামাজিক। ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে এর সম্পর্ক অনেক নিবিড়। 

কোভিড পরিস্থিতে সরকার অনেক অনেক ভালো কাজ করেছে। করোনা সংক্রমণের হার নেমে এসেছে ৪ শতাংশের নিচে, প্রায় ৪ কোটি করোনা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। দেশে পরিকাঠামো উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এমন অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের এই বাড়বাড়ন্তি বেশ অস্বস্তির ব্যাপারই বটে। এখনই খুব জোর ব্যবস্থা না নিলে সরকারের অনেক ভাল অর্জনও ম্লান হয়ে যাবার দেখতে পাচ্ছি আমরা। সরকারের হাতে কি এমন কোনো রাশ নেই যার দ্বারা গুটিকয়েক সিন্ডিকেটবাজের কারসাজির রাশ টেনে ধরা যায়? 

ক্যাসিনো কাণ্ড দেশজুড়ে শোরগোল তোলার আগের দিকের পরিস্থিতি কিন্তু এমনই ছিল। দেশের ঐতিহ্যবাহী আর নামকরা ক্লাবগুলোয় জুয়াবাজি, মাদকসেবন আর অসামাজিক কার্যকলাপ আমার আপনার সবার নাকের ডগায় এবং যারা এসব দমন করার কথা- তাদের জ্ঞাতসারেই হয়ে চলছিল। এই যে ‘মঙ্গলগ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণির সন্ধান পাওয়া’র মতো ক্যাসিনোর খবর নিয়ে মিডিয়ায় ধুন্ধুমার শোরগোল তুলে আমরা দেশজুড়ে হৈ চৈ তুলে ফেললাম- সেই আমরাও আগে থেকে কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করিনি। কারণ প্রভাবশালীদের কায়দা-কৌশল আর দাপটে সবারই হয়তো এরকম একটা মানসিক স্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, এটা নিয়ে বলার কিছু নেই বা বললেও কিছু হবে না। তাই সবাই ‘স্পিকটি নট’ ভাব ধরে ছিলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্রণোদিত হয়ে শক্তহাতে যখন এর শেকড় ধরে টান দিলেন তখন দেখা গেল যেসব বিষয়কে আমরা এতদিন কেঁচো জ্ঞান করে অবহেলায় সময় পার করছিলাম- সেই কেঁচোর গর্ত থেকেই বেড়িয়ে আসতে শুরু করলো অপকর্মের একেকটা কেউটে, গোখরো, অজগর আর অ্যানাকোন্ডা। 

আমরা অনুভব করছি, এই সজল শ্যামল সোনার বাংলার সত্যিকারের পরিশ্রমী এবং শান্তিপ্রিয় নাগরিকরা দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এখন মনে মনে আশা করছেন যে সরকার গণদুশন ওইসব মুনাফাখোর মজুদদার গোখরো-অ্যানাকোন্ডাগুলোকেও এবার গলা টিপে ধরবে। হরদম একের পর এক ছুতো তুলে সাধারণ মানুষকে অসহায় করে অবৈধ মুনাফার পাহাড় গড়া সিন্ডিকেটবাজ-মুনাফাখোর দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একটা সর্বাত্মক এবং কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ার এখনি- আশা করছি বিষয়টি সরকারের ঠাহর হচ্ছে। এমনটা করতে পারলে পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মাসেতু, পায়রাবন্দর, মেট্রোরেলের মতো এই সরকারের অনেকগুলো অবিস্মরনীয় সাফল্য উদযাপনের পরিবেশটা বৃহৎ জনগণের জন্য খুবই অনুকূল এবং স্বতস্ফূর্ত হবে। এটা আগামী নির্বাচনে ভোটারদের মনের দরজায় ইতিবাচক কড়া নাড়ায় সহায়ক হবে, নিঃসন্দেহে। এতে করে কিছু স্বার্থান্ধ দুধের মাছির মুখ যদি গোমরা হয় হোক- তাতে ভ্রূক্ষেপ না করাটাই সময়ের দাবি বলে বিবেচিত হচ্ছে।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়