শনিবার

২২ জানুয়ারি ২০২২


১০ মাঘ ১৪২৮,

১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

‘ভাইরাল বাসনা’ ও সামাজিক অস্থিরতা

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৪:২৯, ১৯ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ০৪:৩১, ১৯ অক্টোবর ২০২১
‘ভাইরাল বাসনা’ ও সামাজিক অস্থিরতা

মানুষের ম্লান মুখের চেয়ে ভারী কিছু যে হয় না, তা কি ভাইরাল বাসনার জনতা জানে! - প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত ছবি

গত বুধবার কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে কোরআন পাওয়ার পর ওই ঘটনার জের ধরে কুমিল্লা, চাঁদপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিশের গুলিতে ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চলমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ সাম্প্রতিক অতীত বিবেচনায় সবচেয়ে বড় সামাজিক সমস্যা মোকাবেল করছে। এরমধ্যে দেখা গেছে মানবিক অনেক দৃষ্টান্তও। সেটাই স্বাভাবিক। কিছু ব্যতিক্রম বাদে স্বাধীন বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল মানবিক উদাহরণ। 

বাংলাদেশ হচ্ছে সেই বিরল দেশ যার গৌরবদীপ্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের একটি বড় অনুষঙ্গ ছিলো সাম্প্রদায়িকতামুক্ত একটি দেশ গড়া। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও সেই স্বপ্ন পূর্ণ মাত্রায় বাস্তবায়ন হয়নি। কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের ধর্মীয় 'ওয়াইল্ড কার্ড' খেলার বাসনা ও এবং কার্যত সুযোগ পেলেই সেই খেলা খেলে যাওয়া এর অন্যতম কারণ। এবং তারা সাধারণ মানুষকে উন্মত্ত  'তৌহিদি জনতা' বানানোর কাজ সারাক্ষণ করে যান। সেটা রাজনৈতিকভাবে যেমন তাদের ফর্মুলায় 'ঠিক' তেমনিভাবে অরাজনৈতিক বাতাবরণেও (রাজনৈতিক অপইচ্ছা হাসিল করতে) বেঠিক বলে মনে করেন না তারা। গুটিকয়েক বাদ দিয়ে দেশের হাজারও ওয়াজ মাহফিলের দিকে তাকালে তা খুব সহজেই বোঝা যায়। 

কিন্তু আমাদের পেছনে ফেরার সময় নেই, সুযোগ নেই। বাংলাদেশ বিনির্মাণের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সরকার সেটা করে চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে বড় বড় অন্যান্য স্থাপনা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, হাতে হাতে ডিজিটাল ডিভাইস। কিন্তু এইসব বাহ্য অবকাঠামোর সঙ্গে কি আমাদের মন-মননের উন্নতি হচ্ছে? 

সামাজবিজ্ঞানী অগবার্ন কালচারাল লেগ নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন। যার মূল কথা হলো, বস্তুগত সংস্কৃতি ও অবস্তুগত সংস্কৃতির পার্থক্য (The difference between material culture and non-material culture is known as cultural lag. The term cultural lag refers to the notion that culture takes time to catch up with technological innovations, and the resulting social problems that are caused by this lag. In other words, cultural lag occurs whenever there is an unequal rate of change between different parts of culture causing a gap between material and non-material culture.)। অগবার্ন এর সূত্র মতে আমরা দেখবো যে আমাদের প্রযুক্তি, অবকাঠামো যতটা এগিয়েছে আমরা ততটা মননের দিক দিয়ে এগিয়ে যেতে পারিনি। অনেকের হাতে সর্বশেষ প্রযুক্তি পৌঁছে গিয়েছে। সেটা সরকার করে দিয়েছে, ডিজিটাইজেশনে বাংলাদেশ দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু যাদের হাতে সেই প্রযুক্তি গিয়েছে- তারা এখনো সেন্সর করতে শেখেননি। তাই চাঁদে রাজাকার দেখে তারা মাঠে নেমে যান! যা ইচ্ছা তাই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। অনেকে সত্য ও মিথ্যার গ্যাপ ধরতে পারেন না। জানেন না, আসলে কি ঘটছে? নয়া কালচারে বেখাপ্পাভাবে প্রতিক্রিয়া করেন। 

দুদোল্যমান এই ভোক্তা শ্রেণিকে আবার আরেক দল কৌশলে ব্যবহার করে থাকে। তা করে থাকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে। এরা দেশে বিদেশে ছড়িয়ে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ করতে এরা লাখ লাখ ডলার খরচ করে এই 'তৌহিদী জনতার' মত উৎপাদন করতে থাকেন। তাদের হেজিমোনাইট করতে থাকেন। কোন ঘুষ বা অর্থ নয়, 'জিহাদি জোশ' ঢুকিয়ে দিয়ে রাস্তায় ঠেলে দেন। 

নয়া এসব মাধ্যেমে সবাই স্টার হতে চায়, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে দাঁড় করাতে চায় নয়া আইডেন্টিটি- হতে চায় ভাইরাল। 

কিন্তু 'ভাইরাল' হওয়ার ক্ষেত্রে গঠনমূলক পজেটিভ জিনিস খুব দ্রুত ক্রিয়া করে না। বরং ধ্বংসাত্মক কিছু দারুণ কাজে দেয়। তাই এই সকরুণ ভাইরাল ভাইয়ারা যা ইচ্ছা তা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। লাভ বা ক্ষতি গোল্লায় যাক! এবারের কুমিল্লাকাণ্ড থেকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করা যাক, একটি সামান্য নমুনা হিসেবে। 
 
কুমিল্লাকাণ্ডের পর কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ারুল আজিম বলেন, আমি কোরআন উদ্ধারের সময় ভিডিও করা হয়। অনেক লোকের মধ্যে কেউ ভিডিও করলে আমি থামাবো কীভাবে। তবে যে ব্যক্তি ভিডিও করে ফেসবুকে দিয়েছেন তাকে আটক করেছি।

তিনি জানান, ফয়েজ উদ্দিন নামে একজন আছেন যিনি ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে দিয়েছেন।

এই যে কুমিল্লাকাণ্ড এত ডালপালা বিস্তার করলো, এর মূল কোথায়? আরো দশটা ব্যাপার হয়তো বের করা যাবে। কিন্তু এই ভিডিওটা আলোর বেগের চেয়ে বেশি বেগে ছড়িয়েছে। আর উত্তেজিত করে তুলেছে সাধারণ মানুষ ও তথাকথিত তৌহিদী জনতাকে। যার ফলে পূজার আনন্দকে রূপান্তরিত করা হয়েছে আতঙ্কে। 

রাজনৈতিক বিভক্তি থাকবে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে রাজনীতির জন্য রাজনীতি না করে মানুষের জন্য কাজ করা লাগবে। নইলে সেইসব দলের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। মনে রাখা ভালো, এসব করে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করা যায় কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধিক্কার ছাড়া আর কিছু জোটে না। 

আমাদের এই জায়গাগুলো এড়িয়ে গেলে চলবে না। শুধু আইন বা আটক দিয়ে হবে না। যারা উস্কানি দেয়, যারা মানুষের জান নিয়ে রাজনীতি করে- তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটা সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। 

বিভক্ত সিভিল সোসাইটিকে ভূমিকা নিতে হবে, শিক্ষাক্ষেত্রে এসব ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্কতার শিক্ষা দিতে হবে। মূলধারার গণমাধ্যমকে আরো বেশি স্বাধীনতা দিতে হবে। নইলে ভাইরাল বাসনার উন্মাদরা সেই ফাঁক কাজে লাগাবে।  

আমাদের বিনোদন অনেক বেশি ব্যক্তিক হয়ে গেছে। কাজী নজরুল ইসলাম শিখিয়েছিলেন, ভোগ করতে হয় একা, আর সবাই মিলে যে আনন্দ করা যায় তাই উপভোগ। আনন্দ বলে যে ব্যাপার আছে- তাকে বলা হয় পরম। ভোগে আনন্দ কই! একার উল্লাস, কখনো তা পৈশাচিক। 

আমাদের জনসংস্কৃতি এখন অনেক বিচ্ছিন্ন, সামাজিকতা ভার্চুয়াল। গ্রামে বা শহরে কনসার্ট হয় না, বাউল গানের অনুমতি পাওয়া যায় না। নাটক নাই, যাত্রা নাই... মানুষ কি করবে? খালি উস্কানির ওয়াজ শুনবে? ফল কি? আগে তো এক রাতে যাত্রা, একদিন নাটক, একদিন গান... সমস্যা তো হয়নি। এগুলোর ব্যাপারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আরো উদার হতে হবে। গণপরিমণ্ডলে সাংস্কৃতিক চর্চার দ্বার বন্ধ করা যাবে না। যদি করা হয় তাহলে শুধু রাজনৈতিক নয় এইসব ভাইরাল বাসনার বিষেও আমাদের দংশিত হতে হবে, বারবার। এইসব বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সাবধান হওয়ার সময় সম্ভবত পেরিয়ে যাচ্ছে- এখন যারা বোঝার তারা যদি বোঝেন...

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়