শনিবার

২২ জানুয়ারি ২০২২


১০ মাঘ ১৪২৮,

১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখতে সচেষ্ট হোন 

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৭, ২৬ অক্টোবর ২০২১  
ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখতে সচেষ্ট হোন 

সংগৃহীত ছবি

টানা ২২ দিন বন্ধ থাকার পর আজ (মঙ্গলবার) মধ্যরাত থেকে পদ্মা-মেঘনাসহ নদনদীতে ইলিশ ধরা শুরু হচ্ছে। জেলেদের মুখে হাসি ফোটার দিনে এর বিপরিত ধরনের এক খবর গণমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে।  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ইলিশের মোট উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। 

 গত ৫০ বছরের পদ্মা নদীর গতি পরিবর্তন ও সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ‘আমেরিকান জার্নাল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যানথ্রোপজেনিক ইন্টারফিয়ারেন্স ফর দ্য মরফোলজিক্যাল চেঞ্জেস অব দ্য পদ্মা রিভার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ও বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিরি) ৬ জন গবেষক যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেন। 

গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘটা কারণের দিকে প্রধান ফোকাস থাকলেও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণ বিশেষ করে নানা অবকাঠামোগত প্রকল্প এবং দখল-দূষণ পদ্মা নদীকে পরিবেশগতভাবে ধ্বংসের মুখে নিয়ে গেছে বলেও জানান। সাম্প্রতিককালে পদ্মা নদীতে ভাঙনের মাত্রা বেড়েছে, যা নদী তীরবর্তী জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। স্থানে স্থানে নদী সংকুচিত হয়ে পড়ায় মাছের পরিমাণ ক্রমেই কমছে। তাদের মতে ইলিশের উৎপাদন যে হারে বাড়ার কথা ছিল, সে হারে তো বাড়েনি বরং কমেছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতেও দেখা যাচ্ছে এ নদীর চ্যানেল অস্বাভাবিক হারে পরিবর্তিত হয়েছে। গবেষকরা আশঙ্কা করেছেন যে হারে পদ্মা নদী পরিবর্তিত হচ্ছে, তা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ইলিশ উৎপাদনের ওপর ব্যাপকহারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। 

যদিও মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব ভিন্ন কথা বলে।  মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা যায় গত ৩০ বছরের আধিক সময় ধরে ইলিশ উৎপাদন বাড়ছে। ১৯৮৭-৮৮ অর্থবছরে এক লাখ ৮৩ হাজার ৫০১ টন, ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে এক লাখ ৯১ হাজার ৯৫২ টন ইলিশ আহরণ করা হয়। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরে উৎপাদন ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ কমে হয় এক লাখ ৮২ হাজার ১৬৭ টন। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন, সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন। এ সময়ে উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার টন। একইসঙ্গে ১০ বছরে (২০০৮ থেকে ২০১৮)  ইলিশ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। 

বাংলাদেশ সরকার ইলিশ রক্ষা ও  উৎপাদন বৃদ্ধিতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রজননকালে বন্ধ রাখা হয় ইলিশ আহরণ। জেলেদের আর্থিক সহায়তাও প্রদান করা হয়ে থাকে। সরকারের এসব উদ্যোগের ফলে গত ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে উত্তরোত্তর উপাদন বেড়ে চলেছে। 

এখানে আরেকটি বিষয় আমলে নেওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে দেখা গেছে- ভারতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঙ্গায় দূষণের মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে, মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ইলিশের দল। তাদের গন্তব্য এখন বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে। প্রজননের জন্য গঙ্গার পরিবর্তে বাংলাদেশ কিংবা মিয়ানমারের বড় নদীগুলো বেছে নিচ্ছে ইলিশ। অর্থাৎ দূষণের ফলে ইলিশ তার গন্তব্য পরিবর্তন করে বা করতে বাধ্য হয়।  ভারত বিষয়টি অনুধাবনের পর গঙ্গায় দূষণ কমানোর চেষ্টা করছে, বাধ্য হচ্ছে ইলিশ রক্ষায় নানা উদ্যোগ নিতে। 

ভারতের গঙ্গার দূষণ আমাদের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে, হতে পারে সতর্কবার্তা। 

মনে রাখা ভালো, ইলিশ কিন্তু শুধু একটি মাছ নয়; ইলিশ আমাদের সংস্কৃতির একটি অনুসঙ্গ। মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ডফিশের হিসাবে বিশ্বের মোট ইলিশের ৮৬ শতাংশ এখন বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। চার বছর আগে সংখ্যাটি ছিল ৬৫ শতাংস। এই সময়ের মধ্যে এখানে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে ইলিশের উৎপাদন। সে তুলনায় প্রতিবেশী ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। কমার পেছনে প্রধান কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও নদী দূষণ। ফলে এখনি আগাম প্রস্তুতি না নিলে  আখেরে আমাদের জন্যও অপেক্ষায় থাকবো হতশাপূর্ণ অন্ধকার। 

তবে আশার কথা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈশ্বিক পরিসরে নেতৃত্ব এরইমধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। আমাদের সুযোগ ও সক্ষমতা রয়েছে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় জোরদার পদক্ষেপের।

পদ্মা নদীকে ঘিরে মানুষের জীবনযাত্রার নানা বৈশিষ্ট্যও খুঁজে এ নদীর অন্যতম প্রধান মাছ ইলিশের আবাসস্থল ও মাছকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের জীবনযাত্রার স্বরূপও আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। মৎস্য অধিদপ্তরের উৎপাদন বৃদ্ধির হিসাবকে ধ্রুব না ধরে বাকৃবির গবেষণার তথ্যগুলো ব্যবহার করে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে ইলিশ উৎপাদন আরো বাড়াতে কাজ করবে বলেই আশা করি। এই অবস্থায় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে আমলে নেওয়া প্রয়োজন; প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতির। পদ্মা নদী থেকে শুরু ইলিশ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নদীগুলোকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানো ছাড়া যার কোন বিকল্প নাই।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়