শনিবার

২২ জানুয়ারি ২০২২


১০ মাঘ ১৪২৮,

১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

এই ‘হারামখোরদের’ সর্বনাশ হয় না কেন!

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:০৬, ২৮ অক্টোবর ২০২১   আপডেট: ২২:০৮, ২৮ অক্টোবর ২০২১
এই ‘হারামখোরদের’ সর্বনাশ হয় না কেন!

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশ ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর পার করছে। জাতি হিসেবে এই অর্ধ শতকে আমরা অনেক সংহত। অনেক এগিয়ে গিয়েছি। আদতেই দেশে খাদ্যাভাব নেই, শ্রম দিলে অর্থ মেলে, শিক্ষায় হয়েছে অভাবনীয় উন্নতি, স্বাস্থ্য সেবায় গুণগত পরিবর্তন, হয়েছে অবকাঠামোর বৈপ্লবীক পরিবর্তন। কিন্তু কিছু বিষয় যেন ধ্রুব করে আমাদের ভাগ্যের মতো গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলাদা করে কোন স্টাডি নয় বরং সাম্প্রতিক অতীতের কয়েকটি ঘটনার সুতো জোড়া দিলেই এই দুর্লঙ্ঘনীয় জালটি স্পষ্ট দেখতে পারা যাবে। 

গতকাল মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে যানবাহন নিয়ে আমানত শাহ নামের একটি রো রো ফেরি ডুবে গেছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাট থেকে যানবাহন লোড করে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটে নোঙর করে বড় আকারের রো রো ফেরি আমানত শাহ। ফেরি থেকে দুই থেকে তিনটি যানবাহন নামার পরপরই ফেরিটি ডুবে যায়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচলকারী আমানত শাহ ফেরিটির আয়ুস্কাল আগেই শেষ হয়েছে। তারপরও জোড়াতালি দিয়ে প্রমত্ত পদ্মায় চালানো হচ্ছিল এটি। এ ক্ষেত্রে পদে পদে ছিল উদাসীনতা আর অবহেলা। কয়েক মাস মেরামত করা হলেও সম্প্রতি এর তলদেশে ছিদ্র হয়। এ অবস্থায় মেরামত ছাড়াই ছোট-বড় ৩৩টি যান নিয়ে বহু মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে গতকাল সেটি যাত্রা করেছিল। 

এটি একটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলা ফেরি। সংশ্লিষ্ট সবাই ফেরির ফিটনেসের ব্যাপারে অবগত ছিলো। তাহলে কেন এমন হলো? অবহেলায়? ইচ্ছা করে? যারা ফেরি চলাচলের সঙ্গ সরাসরি যুক্ত তাদের কথা বাদই দিই, উনারা না হয় কিছুই জানেন না, থাকেন সপ্ত আসমানে কিন্তু গত আগস্ট মাসেও দেশের একটি প্রধান দৈনিক ফিটনেসবিহীন ফেরি নিয়ে প্রধান সংবাদ করেছে। 

দৈনিকটির অনুসন্ধানে জানা যায় দেশে চলাচল করা ফেরিগুলোর মধ্যে ২৬ টির-ই মেয়াদ নেই! মেয়াদোত্তীর্ণ ফেরিগুলোর মধ্যে বড় ফেরি আটটি। এগুলো হলো আমানত শাহ, এনায়েতপুরী, শাহ আলী, খানজাহান আলী, শাহ পরান, শাহ মখদুম, কেরামত আলী ও শাহজালাল। ফলে শাহ আমানত চালানো যে জানমালের জন্য অনিরাপদ তা আম মানুষ পর্যন্ত জানতো! তাহলে এর দায় কে নেবে? তীরে ডুবায় কেউ মারা যায়নি, এটা সৌভাগ্য বলা যেতে পারে! 

যেকোন ঘটনার পরেই তদন্ত কমিটি হয়। একই ধরনের কারণ আসে। ফিটনেস ছিলো না, চালকের অবহেলা ইত্যাদি। কোন প্রজেক্ট ব্যর্থ হলেই বলা হয় আগে সম্ভব্যতা যাচাই হয়নি বা আরও কোন উদ্ভট কারণ। শুধু আজকের পত্রিকয় চোখ বুলালেও এমন দায়সারা কাজের নমুনা পবেন বেশ কিছু। 

কয়েক বছর আগে মহাসমারহে চালু হওয়া ডেমু ট্রেন এরই মাঝে বিকল হয়ে গেছে। মেয়াদকাল ৩৫ বছর হলেও সাত বছরেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে ২০টি ডেমু ট্রেনের ১৬টি। বাকি চারটির অবস্থায় নড়বড়ে। যেকোনো সময়ই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। চালু হওয়ার দুই বছর না যেতেই চীন থেকে আনা ‘অত্যাধুনিক’ ডেমু ট্রেনগুলোতে নানা সমস্যা দেখা দেয়। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে সব ডেমু। 

সংশ্লিষ্টদের আরও অভিমত, ক্রয় থেকে পরিচালনা পর্যন্ত অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডেমু কেনার আগে অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তা চীনে দুই মাস অবস্থান করেন। কিন্তু তারা বাংলাদেশের উপযোগী ট্রেন নির্মাণে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেননি চীনের দায়িত্বপ্রাপ্তদের। ফলে ৬৪৫ কোটি টাকা কেনা ডেমু এখন, ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। 

আরেকটা নমুনা দেওয়া যাক- অব্যাহত লোকসানের মুখে ওয়াটার বাস বিক্রি করে দেওয়ার চিন্তা করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি সংস্থাটির বোর্ড সভায় এ সংক্রান্ত প্রস্তাব তোলা হয়েছে। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে এসব ওয়াটার বাস বিক্রির জন্য নিলাম বা টেন্ডার করা হবে। যাত্রীসেবার যে উদ্দেশে নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য অর্জন না হওয়া, আয়ের কয়েকগুণ বেশি লোকসান হওয়া এবং সামনের দিনগুলোয় এসব ওয়াটার বাস কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ না থাকায় এগুলো বিক্রির আলোচনা চলছে।

কোনো ধরনের সমীক্ষা না করেই তড়িঘড়ি করেই এসব ওয়াটার বাস কেনা হয়। এ কারণেই এসব ওয়াটার বাস চালুর শুরু থেকেই নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। ঘাটগুলোর সঙ্গে ওয়াটার বাসের উচ্চতার মিল ছিল না। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর বাঁকের সঙ্গে এ আকারের ওয়াটার বাস চলাচল সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। গাবতলী থেকে সদরঘাট ওয়াটার বাসে আসতে যে পরিমাণ সময় লাগত, এর চেয়ে কম সময়ে বাসে যাতায়াত করা যায়। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদীর পানি থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ আসে। এসব বিষয় বিবেচনা ছাড়াই ওয়াটার বাসগুলো কেনা হয়। ওয়াটার বাসের কারণে বছরে দুই কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিনবদলবিডি.কম প্রায় ৩০০ বিআরটিসি বাস ভাঙারি হিসেবে বিক্রয় বিষয়ে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেখানেও সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া বাস কিনে সরকারের টাকা দরিয়ায় ঢালার প্রতিকারহীন মচ্ছব নিয়ে বিস্তারিত বয়ান করা হয়।  কিন্তু পত্রপত্রিকায় এসব জনস্বার্থমূলক এবং দুর্নীতিবিরোধী লেখাজোখা আজকাল ‘অরণ্যে রোদন’ হিসেবে-ই যেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কারণ সরকারের আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শক্তপোক্ত হয়ে আসন গেড়ে বসে থাকা এইসব উইপোকাদের বিনাশ করার শক্তি সম্ভবত কেউই রাখেন না। তাই পরগাছার মতো আসল গাছের রস চুষে খেয়ে এরা নিজেরা তরতাজা হয় ঠিকই, কিন্তু যাদের রস খায় সেই জনগণকে, রাষ্ট্রকে- এরা কাহিল করে দেয়। এই হারামথেকো দুর্বৃত্তদের সর্বনাশ সবারই কাম্য- কিন্তু হয়না, আফসোস!

রাস্তা নেই তবু সেতু, ডেমু ক্রয় বা জামালপুরের ফেরিঘাট থেকে শুরু করে উপযোগিতা নেই তবু প্রকল্প বাগিয়ে নেওয়ার কাজ কিছু লোকে করেই যায়। আর প্রায়শ এরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। অনেক জায়গায় বাংলাদেশ উন্নতি করলেও গিরগিটির মতো নয় ছয় কায়দায় আদল অদল বদল করে এরা বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে আর প্রতিনিয়ত সর্বনাশ করে যাচ্ছে। আর কত?

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়