শনিবার

২২ জানুয়ারি ২০২২


১০ মাঘ ১৪২৮,

১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

জাপানি ভদ্রলোক কেন বলেছিলেন অমন কথা?

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৩১, ১৪ নভেম্বর ২০২১   আপডেট: ২১:৪৬, ১৪ নভেম্বর ২০২১
জাপানি ভদ্রলোক কেন বলেছিলেন অমন কথা?

ফাইল ছবি

গত শতকের নয়ের দশকের গল্প- জাপান দেশের এক ভদ্রলোক বাংলাদেশে কাজের সূত্রে দীর্ঘদিন রইলেন। সেই জাপানি ভদ্রলোকের এ দেশে থেকে যে উপলব্ধ জ্ঞান তা হলো- বাংলাদেশ পয়সাওয়ালাদের জন্য স্বর্গ। বাইনারি অপজিটের এই দুনিয়ায় অপরাপর অর্থনৈতিক বর্গের জন্য সেই বাস্তবতাটা কেমন সেটা ধীমান পাঠকের বিবেচনা! কথাগুলো গত ১১ নভেম্বর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামালার রায়ের পর মনে এলো।

বিচারক কামরুন্নাহার এই মামলার আসামিদের খালাস দিয়ে-ই খ্যান্ত হননি, সঙ্গে ‘মুফতে’ দিয়েছেন কিছু পর্যবেক্ষণ। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, মামলার দুই ভিকটিম আগে থেকেই সেক্সুয়াল কাজে অভ্যস্ত।

অহেতুক তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছেন। এতে আদালতের ৯৪ কার্যদিবস নষ্ট হয়েছে। এরপর থেকে পুলিশকে এ বিষয় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়া এরপর থেকে ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর যদি কেউ মামলা করতে যায় তা না নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।

উল্লেখ্য, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের (ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার) পরিদর্শক ইসমত আরা এমি পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। একই ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। ওই বছরের ১৩ জুলাই ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক শফিউল আজম পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচারের আদেশ দেন। অভিযোগপত্রে আসামি সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফ ওরফে এইচএম হালিমের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়। মামলার অন্য তিন আসামি সাদমান সাকিফ, আলী ও বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধেও একই আইনের ৩০ ধারায় ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।

আসমিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযোগপত্র থাকার পরও বিচারক কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখালেন তা প্রশ্ন আকারে থাকলো। সময় নিশ্চয়ই এর জবাব দেবে।

রায়ে  আসামিরা দারুন বিরল প্রতিক্রিয়া দেখায়! সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আসামিরা বলে, আদালতের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে। এরপর তারা বিচারককে উদ্দেশ করে হাত তুলে বলেন, আসসালামু আলাইকুম!!

কিন্তু আসামিদের মতো জনগণ তার প্রতি শান্তি-বর্ষণের দোয়া করতে পারেনি। সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে থাকা আদালতের এহেন রায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় প্রায় সর্বমহলে। বাংলাদেশের নানা স্তরের অধিকার কর্মী থেকে শুরু করে আইনজীবী, মিডিয়াকর্মী, রাজনীতিবিদসহ সাধারণ মানুষ এমন রায় আর পর্যবেক্ষণে হতভম্ভ আর সংক্ষুব্ধ হন।

এই মামলাটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অন্যতম আলোচিত মামলা। এমন একটি জন-আগ্রহ থাকা মামলায় এমন হেন কাণ্ড প্রসব করাটা সহজ ব্যাপার নয়- পর্বতের মুসিক প্রসব কথাটি এখানে গৌন হয়ে গেছে যেন। অনেক কথা সাধঅরন্যে সহজে বলা যেতে পারে, চায়ের দোকানে সেসব বলাও যায়। কিন্তু সেসব কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা না গেলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া কিন্তু যায় না। বিচারক কামরুন্নাহারের অসাংবাবিধানিক এবং সহজ কথায় বলা চলে নীতিবর্জিত ওই পর্যবেক্ষণ আপামর নারী সমাজের জন্য অবমাননা আর অসহায়ত্বের এক জগদ্দল পাথর হয়ে যেন চেপে বসে সবার অলক্ষ্যে। দায়ত্বশীলদের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, নানান বাধ্যবাধকতা আর বাস্তবতার নিরিখে প্রকাশ্যে সরবে এইসব কথা আলোচিত না হলেও তার অনুরণন বা প্রতিধ্বনি বিবেকবান মানুষ মাত্রেরই বিবেক আর বিচারবুদ্ধিকে দংশন করেছে- দাঁড় করিয়েছে কাঠগড়ায়।

তবে রায়ের মাত্র দুই দিনের মাথায় আইনমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জখমে অনেকটা মলমের প্রলেপের মতোই মনে হয়েছে। তিনি শক্ত অবস্থান নেন স্পর্শকাতর মামলার বিচার নিয়ে বিচারহীন পর্যবেক্ষণ প্রকাশকারী বিচারকের প্রতিকূলে। তার মতো দায়িত্বশীল মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম আইনজীবী স্পষ্ট করে বলেন, এ রায় অসাংবিধানিক! 

গতকাল (শনিবার) মন্ত্রী বলেন,  আমি উনার রায়ের বিষয়বস্তু নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। আমি শুধু বলছি উনার অবজারভেশন, যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক। এ কারণে আমি আগামীকাল (আজ রবিবার) প্রধান বিচারপতির কাছে তার বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়ে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেজন্য একটা চিঠি লিখছি।

আইনমন্ত্রীর সেই চিঠি সাপেক্ষে সুপ্রিম কোর্টের অদেশে আজ বেগম মোছা. কামরুন্নাহারকে বিচার কাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যৌক্তিক বিবেচনায় কেড়ে নেওয়া হয়েছে তার বিচারকি ক্ষমতা।

কামরুন্নাহারের রায়ের পর্যবেক্ষণে শুধু ভিকটিমরাই যে ক্ষতিগ্রস্ত হতো- তা নয়। বরং নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে একটি অনাস্থাজনক পরিবেশ তৈরিরও নিয়ামত হতো তা। ৭২ ঘণ্টা গেলে ধর্ষণ মামলা পুলিশ না নিলে অপরাধীরা আরো ভয়াবহ হয়ে উঠতো!

জাপানি ভদ্রলোক সেই কথা কেন বলেছিলেন? বলেছিলেন কারণ এখানে বিত্তবানরা যা ইচ্ছা তা করে পার পেয়ে যায় এমন ধারার একটা ‘হৃদয়বিদারক সংস্কৃতি’ প্রকাশ্যে বা সন্তর্পণে বিরাজমান রয়েছে। সুশীল মন স্বীকার করতে চায় না, কিন্তু বাস্তব হচ্ছে এমন বহু নমুনা এই দেশে আছে- যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী এর নির্লজ্জ চর্চা চলে আসছে এই সবুজ-শ্যামল মানবিক জনগোষ্ঠীর চারণভূমিতে। এ যেন শান্তির প্রতিক শুভ্র পায়রার কোমল বুকে শবভোজী শকুনের হিংস্র নখের আঁচড়।

একদিকে এই দেশে শান্তি ও মর্যাদাপ্রিয় সিংহভাগ মানুষ মানবিক আবহের বাঙালি সংস্কৃতি আর জীবনবোধের চর্চা করে যাচ্ছে আর এর সমান্তহরালে অল্পসংখ্যকের একটি মহল তাদের ভেতরকার শিয়াল-শকুনের মনস্তত্ত্ব নিয়ে উল্টোদিকে নাও বেয়ে চলেছে। সবকালেই সংখ্যায় অল্প হলেও এই চার্বাক চ্যালারা প্রবল হয়ে ওঠে অপকর্ম সংগঠনের বিচারে। শান্তিপ্রিয় সদাচারী বৃহৎ জনসংখ্যাকে কিভাবে যেন নগদ নারায়ণ লোভী এই দুর্বৃত্তচক্র হামেশাই মাত দিয়ে দেয়! বড়ই কষ্টকর এই পরাভব।

তবে স্বস্তির কথা যে, সময় অনেক এগিয়েছে। আমাদের দেশ সম্পর্কে এমন অপ্রিয় ‘স্টেরিও টাইপ’ ধারনার ভিত্তি ভেঙ্গে দিতে সচেষ্ট হচ্ছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে- সামনের দিনগুলোতে এই প্রচেষ্টা আরো প্রবল-সবল হবে বলে আমরা আশা করি। একই সঙ্গে অশুভ দমনের এই প্রচেষ্টাটা চালাতে হবে সব দিক, সব বিভাগ থেকেই। শতাব্দী ধরে চলে আসা সময়ের ভাঁজে ভাঁজে নির্লজ্জ-অশুঁচি অপকর্মের ওই জঙ্গল সাফ-সুতরো করাটা শুধুমাত্র কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংস্থা, বিভাগ বা গোষ্ঠীর কাজ নয়। সবাইকে সম্মিলিতভাবে কোমড় বেঁধে নামতে হবে সকল নেতিবাচকতার বিরুদ্ধে। নগদ নারায়ণের কাছে বিবেক বিক্রি করে দেওয়া আর নয়। এতেই হবে মানবিক বাংলাদেশের জয়। আজকে সরকারের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সমন্বিত সিদ্ধান্ত যেন সে সুবাতাসেরই আরেকটি নমুনা। তাদের পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাই।

দিনবদলবিডি/এমআর

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়