শনিবার

০৪ ডিসেম্বর ২০২১


২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৮,

২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

জানালা পথে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন জ্বলার তামাশা দেখা এবং...

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১৪, ১৯ নভেম্বর ২০২১  
জানালা পথে প্রতিবেশীর ঘরে আগুন জ্বলার তামাশা দেখা এবং...

ফাইল ফটো

গেলো কয়েক বছর ধরেই দেশের অপরাধ জগতের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ‘কিশোর গ্যাং’। বৃহস্পতিবার দেশের একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবর- শুধু পুরান ঢাকাতেই গত এক বছরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ১০ জন খুন হয়েছে। এরইমধ্যে কিশোর অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। গত কয়েক মাসে সংবাদ মাধ্যমে বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবু তাদের দৌরাত্ম্য কমছেই না। বারবার আটক হলেও এরা আবার ফিরে আসে এবং ভয়াবহ সব অপরাধ কর্মে লিপ্ত হয়। 

অপরাধের পর পুলিশের হাতে আটক হলেও ‘কিশোর’ বিবেচনায় তারা দ্রুত ছাড়া পেয়ে যায়। এখানে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, যাদের আটক করা হচ্ছে তাদের প্রায় সবাই বাংলাদেশের আইনে শিশু। তাদের প্রচলিত আইনে বিচারের সুযোগ থাকে না। তাদের বিচার করা হয়ে থাকে কিশোর আদালতে। আটক রাখার বিধান কিশোর সংশোধনাগারে। ফলে এখানে তাদের অপরাধকে প্রথমেই ‘লঘু’ হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। সেটাই সঙ্গত। তারা দ্রুত মুক্তি পেয়ে ফের এসব অপকর্মে যুক্ত হয়ে পড়ে। বলা বাহুল্য দেশের কিশোর সংশোধনাগারগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। গতবছর ১৩ আগস্ট টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা সবারই মনে থাকার কথা। তবে ঘটনাটি নিয়ে প্রথমে গণমাধ্যমে প্রচার হয় যে সেখানে বিবাদমান দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়েছে। মারামারিতে তিনজন নিহত এবং পনেরোজন আহত হয়; কিন্তু পরবর্তী সময়ে আহত কিশোরদের বক্তব্যে জানা যায়, দুর্নীতি ও অপকর্মে জড়িত সংশোধনাগার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেধড়ক মারধরের ফলে ওরা মারা যায়।

কিশোর গ্যাং পুরান ঢাকায় চুরি-ছিনতাই, মেয়েদের লাঞ্ছিত করা ও মাদকের আসর বসানোর মতো অপরাধ করে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, লালবাগ, বংশাল, চকবাজার, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, ওয়ারী ও কামরাঙ্গীরচর এলাকায় গত এক বছরে এ চক্রের দৌরাত্ম্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েকজন বখাটে স্বভাবের ‘কিশোর’ কারাগারে বা সংশোধনাগারে থাকলেও অন্য সদস্যরা জামিনে বা প্রবেশনে বের হয়ে এসে মামলা তুলে নিতে ভিকটিমদের হুমকি দিচ্ছে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন ভুক্তভোগীরা।

স্থানীয়দের বরাতে দৈনিকটি জানায়, লক্ষ্মীবাজারের ভবনের ছাদে ছাদে চলে মাদকের আসর। বাংলাবাজার ও সদরঘাটে কর্মরত কম বয়সী কিশোর-যুবকরা স্থানীয়দের নিয়ে ছাদে মদ, গাঁজা ও জুয়ার আসর বসায় বলে অভিযোগ। নিজ বাসস্থানের আশপাশে এতসব অপকর্ম হরদম দেখে দেখে হতাশ এবং আতঙ্কিত ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। মাদকাসক্ত এসব কিশোর-যুবক সুযোগ পেলেই বাসার মধ্যে ঢুকে পড়ে চুরির মতো অপরাধে জড়ায়। তারা মাদকের টাকার জন্য ছিনতাইও করে।

গত জুনে পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ক্যাম্পাস থেকে বাসায় ফেরার পথে কবি নজরুল কলেজের পাশে লাঞ্ছিত করে এক কিশোর। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ছাত্রী মামলা করলেও এখন পর্যন্ত কেউ শনাক্ত হয়নি।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে- ফুটবল খেলার আলোচনাকে কেন্দ্র করে বংশাল থানার বাংলাদেশ মাঠের পাশে আকিব নামের একজনকে কুপিয়েছে উঠতি বয়সী ১০-১২ কিশোর। ঘটনার সময়ে বাবু নামের এক কিশোর আকিবের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলে- ‘তোর টিকটক বানানো ছুটাইয়া দিমু।’ এ সময় কালু নামের এক কিশোর পেছন থেকে রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাকে। একপর্যায়ে বাবু নামের ওই কিশোর চাকু দিয়ে তাকে উপর্যুপরি আঘাত করে। এতে ফুঁসফুঁস ছিদ্র হয়ে যায় আকিবের।

এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এদের শেলটার দিয়ে থাকে তথাকথিক কিছু ‘বড়ভাই’। নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে তারা এই কিশোরদের ব্যবহার করে (বলা উচিৎ অপব্যবহার করে)।

সন্দেহ নাই, একটি দেশ এগিয়ে যায় তার জনশক্তির ওপর ভর করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ কথা আরো প্রকটভাবে সত্য। কিন্তু তারুণ্যের শক্তির ওপর ভর করে দেশ যখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির সোপানে অগ্রসরমান তখন কিশোর অপরাধের এমন বাড়বাড়ন্তি বেশ দুশ্চিন্তার কারণ।

ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকা বাংলাদেশের অন্যতম ঘনবসতি অঞ্চল। যেকোনো ঘনবসতি অঞ্চলই আপরাধীদের পছন্দের ‘কর্মক্ষেত্র’ হয়ে থাকে। একিই কারণে, এমন এলাকায় অপরাধকর্মে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যাও বেশি হয়ে থাকে। পুরান ঢাকা দেশের অন্যতম প্রধান ‘বিজনেস হাব’। এর প্রভাব অর্থনীতিতেও বিরূপ আকারে পড়বে স্বাভাবিক কারণেই। কিন্তু এই এলাকাটিতে মাত্র এক বছরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ঘটা দশটি হত্যাও আমাদের টনক বিশেষ নাড়িয়েছে বলে মনে হয় না। সংশ্লিষ্ট মহলকে বলি- আর কত? নোংরা আত্মহননের পিচ্ছিল পথে আমাদের কিশোর-তরুণ-যুবা আছাড় খেতে খেতে ধেয়ে চলছে ধ্বংসের অতল গহ্বরের দিকে। তাদেরকে থামান। এখনই সময় শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার। নইলে পুরো দেশ আর জাতি এর বিষাক্ত ছোবলে নিরাময় অযোগ্য অবস্থায় পৌঁছাতে বেশিদিন লাগবে না। কারণ, এর প্রভাব শুধু পুরান ঢাকাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না- পুরান ঢাকা থেকে অনেক দরকারি নিত্য ব্যবহার্য পণ্য যেমন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, কিশোর অপরাধের মতো অপসংস্কৃতিও তেমনি ছড়িয়ে পড়বে মহামারি আকারে, এখান থেকেই। এটাই বাস্তব। 

কিন্তু মাঝে মধ্যে টুকটাক পুলিশি অভিযান ছাড়া বৃহৎ পরিসরে সরকার বা সমাজপতিরা, তথাকথিত সুশীলরা, কিশোর অপরাধ দমনে তেমন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে বলে চোখে পড়ে না। আমরা মনে করছি, কিশোর আপরাধ দমনে সরকারের উচিৎ বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করে দ্রুত কাজে নেমে পড়া। এর সমান্তরালে সমাজের চিন্তাশীল নেতৃস্থানীয় মহল ও ব্যক্তি যেমন মসজিদের ইমাম, মন্দির-প্যাগোডার পুরোহিত, গীর্জার পাদ্রি থেকে নিয়ে শিক্ষক, সামাজিক সংগঠনের নেতা, ব্যবসায়ী নেতা, সাহিত্য-সাস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সর্বমান্য মুরুব্বি এবং সর্বোপরি স্থানীয় সত্যিকারের জনদরদি রাজনীতিকদের এখনি তৎপর হতে হবে। নইলে যে আগুন দু’চার ঘর দূরে অন্যের ঘরে এখন জ্বলতে দেখছি নিজ ঘরের জানালা পথে- সেই আগুন আমার ঘরসহ আমাকেও গ্রাস করতে খুব বেশি সময় নেবে না যদি না প্রতিবেশীর ঘরে আগুন জ্বলার তামাশা দেখা বন্ধ না করে এখনি তা নেভাবে তৎপর হই- এই কথাটা যত দ্রুত আমরা বুঝবো, ততই মঙ্গল।

দিনবদলবিডি/কে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়