শনিবার

০৪ ডিসেম্বর ২০২১


২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৮,

২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

বাগধারাও যেখানে লজ্জা পায়...

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:১৫, ২২ নভেম্বর ২০২১  
বাগধারাও যেখানে লজ্জা পায়...

বজ্রাহত, চক্ষু ছানাবড়া-চক্ষু চড়ক গাছ, বাকরুদ্ধ- এমন আরো কিছু বাংলা বাগধারার ব্যবহার কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে রূপক হিসেবে ব্যবহার এখন যেন খুবই বেমানান মনে হয়! আপনাদের বালিশকাণ্ডের ঘটনা মনে থাকার কথা। গতকালও একটি জাতীয় দৈনিক তাদের প্রধান সংবাদে এ ধরনেরই এক কাণ্ডের পর্দা ফাঁস করেছে। বাংলা ভাষার ওই উল্লেখিত বাগধারাগুলো আজ যেন লজ্জা বোধ করে হাল আমলের এসব অপকর্মের উপস্থাপনে তাদের ব্যবহার দেখে! দৈনিকটির খবরে প্রকাশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি প্রকল্পে একেকটি গাছের গোড়া কংক্রিট দিয়ে বাঁধাই করতে গড়ে ব্যয় করা হয়েছে ৪৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকার মতো। আর সব মিলিয়ে ছোট-বড় ৪১টি গাছের গোড়া বাঁধাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১৬ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকা! 

ডিএসসিসির ‘ওসমানী উদ্যান উন্নয়ন’ প্রকল্পে এমন অর্থ ব্যয়ের অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে। তবে এখানেই শেষ নয়, যেন দুর্নীতি ধরা না পড়ে তাই ব্যয়ের হিসাব প্রকল্পের কাগজপত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে কোনো প্রকল্পের কাগজপত্রে যা হয় না। যাতে একটি গাছের জন্য যে কমবেশি প্রায় অর্ধ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে তা যেন সহজে চোখে না পড়ে। গাছরক্ষার নামে এমন অবাস্তব খরচ দেখে খোদ নগর ভবনেরই অনেকে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন।

প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়- ওসমানী উদ্যানে ডিএসসিসির গাছরক্ষার ওই প্রকল্প এলাকায় ছোট, বড় ও মাঝারি আকারের ৪০/৪২টি গাছ পড়েছে। এর বেশিরভাগই সাধারণ মানের রেইন ট্রি। এর সঙ্গে আম, কৃষ্ণচূড়া আর মেহগনিও আছে কিছু। এসব গাছের জন্য তৈরি করা হয়েছে কংক্রিটের ব্লক। ছোট-বড় প্রত্যেকটি ব্লকের জন্য খরচ হয়েছে ৬৬ লাখ ১৩ হাজার টাকা। সেখানে একেকটি গাছের পাড় বাঁধানোর কাজে ব্যয় করা হয়েছে ৪৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকার মতো। সংশ্লিষ্টরা সব মিলিয়ে এ বাবদে খরচ দেখিয়েছে ১৬ কোটি ২৪ লাখ ২০ হাজার টাকা।

ওসমানী উদ্যান উন্নয়নকাজের তিনটি প্যাকেজের প্রথমটি থেকে ইতোমধ্যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সবমিলিয়ে ২৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা তুলেও নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানায় যে, প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে রাজধানীর এ উদ্যানের উন্নয়নকাজে তিনটি প্যাকেজে মোট ৮৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছিল। প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজের কাজের বিপরীতে সবমিলিয়ে ৪৯ কোটি টাকার মতো বিল ইতোমধ্যে তুলে নিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন ঠিকভাবে হিসাব পাওয়া না যায়। বাঁধাইয়ে কতটা পুরু হবে, ঢালাই কেমন হবে, পাইল কতটা হবে এসব হিসাব নির্দিষ্টভাবে নেই। এই কায়দাটা করা হয়েছে সরকার তথা  টাকা লোপাট করার জন্য তথা পাবলিকের টাকা অন্যায়ভাবে এবং চৌর্যবৃত্তিক কৌশলে ঠিকাদারের পকেটে ভরে দেবার জন্যই এসব করা হয়েছে। অকেনেই অবশ্য মনে করছেন, এতে অবাক হওয়ার কিছেই নাই, কারণ এই প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দি বিল্ডার্সের মালিক বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীমের ব্যবসায়িক অংশীদার ফজলুল করিম চৌধুরী ওরফে স্বপন। তো কাকের ঘরে তো কাক-ই জন্মাবে, কবুতর বা ময়ূর নয়! 

চুরি-বাটপারির এতসব মচ্ছবের পরও প্রকল্পটি তারা নির্ধারিত সময়ে শেষ করেনি বা করতে পারেনি। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় পাবলিক প্রকিউরম্যান্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮ অনুযায়ী ডিএসসিসি সম্প্রতি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের এ প্রকল্পটি পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে বরাদ্দ বাড়ার সঙ্গে মেয়াদও বাড়িয়ে ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু জিকে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর ঠিকাদার স্বপন গা ঢাকা দেয়। এরই মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে ওসমানী উদ্যানসহ তার প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ডিএসসিসির আরো কয়েকটি প্রকল্প।

মানে দাঁড়ালো, এ প্রকল্পে সরকারি অর্থ হাওয়া হওয়া ও উন্নয়নের নামে বিশৃঙ্খলা ছাড়া তেমন কিছু হয়নি। 

সব উন্নয়ন কাণ্ডেই অন্তত তিনটি বিষয় খেয়াল রাখার কথা বলে থাকেন পরিবেশবাদীরা। এই উন্নয়নের তিন নীতি হলো-  যা করা হচ্ছে তাতে কী সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে? কাজটি কি পরিবেশবান্ধব? এটি কি ‘টেকসই’? এই তিন প্রশ্নের উত্তর পজেটিভ হলেই শুধু কাজটি করা! 

এখন আমরা মনে করি, ধীমান পাঠক সিদ্ধান্ত নেবেন  ওসমানী উদ্যানে ডিএসসিসির গাছরক্ষার ওই প্রকল্প কেমন ছিলো! 

আমাদের মনে রাখা দরকার, এই দেশকে পিছিয়ে দিতে একদল দুর্নীতিগ্রস্থ লোক এখনও কাজ করছে- মনে হয় সবসময় করবে। এদের ‘বদান্যতা’য় বাংলাদেশ একদা দুর্নীতিতে বারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে! এইসব বিষবৃক্ষ এখনও তাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে চলেছে। বর্তমান সময়টায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানোর দাবির অন্যতম নেতা হয়ে উঠেছেন। এই ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ছাড়িয়ে যেটা স্বীকার করতেই হয় তা হচ্ছে, দেশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সূদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও এই রাষ্ট্রপ্রধানের দক্ষতা আর বিচক্ষণতা প্রশংসনীয়। কিন্তু এর সমান্তরালে ঘরের শত্রু বিভীষণরা ইঁদুরের মতো তাদের ক্ষতিকারক দাঁতে কুটুস কুটুস কেটেই চলেছে উন্নয়নের ভিত্তিমূল। এদের সামলানো যায় কীভাবে?  

দুনিয়া ইডেন গার্ডেন বা স্বর্গোদ্যান নয়। আর ভুলে গেলে চলবে না যে ইডেন গার্ডেনেও তো ইবলিশ থাকে। আর পরমশক্তি কখনো সরাসরি চূড়ান্ত অভিশপ্ত ইবলিশ না বরং প্রিয় ইভ (হাওয়া) আর অ্যাডামকেই (আদম) শাস্তি দিয়ে থাকেন। দুনিয়া নামক কপটবাজির বালাখানায় পাঠান৷ এখানে এই কথাটা বলা এইজন্য যে এসব নীতিহীন, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী অসৎকর্ম অনেক সময় দলীয় লোকেরাই করে থাকে। তবু তারা কেমন করে যেন স্বর্গের বাগানেই থেকে যায়৷ আর জনগণের মাথায় রেখে বারবার কাঁঠালরূপ গন্ধম খেয়েই যায়। কারণ এইটা নিষেধ হওয়া সত্ত্বেও নিষিদ্ধ এই বস্তু  ভোগে পৈশাচিক আনন্দ! তারা সেটা পায়। দেশ-দুনিয়ার যা ইচ্ছা হয় হোক, তাদের সিন্দুক তো ভরে যায় ‘কালোটাকা, মন্দটাকায়’৷ তবে তারা হয়তো মনে মনে আমাদের উদ্দেশে চোখ টিপে টিটকিরি দেয় আর বলে- ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে!’ তাদের কাছে কালো টাকা আর সাদা টাকায় বিভেদ নাই। আফসোস, এভাবেই ইডেন গার্ডেনে রাজত্ব করে শয়তান! এটা বন্ধ করতে হবে। করতেই হবে। তাদের রচিত স্বর্গের সেই বাগান থেকে তাদের ছুঁড়ে ফেলতে হবে। সোনার বাংলায় এদের ঠাঁই থাকতে পারে না। এদের ঝেঁটিয়ে দূর করতে সবাইকে একাট্টা হতে হবে।

দিনবদলবিডি/এমআর

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়