শনিবার

২৮ মে ২০২২


১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,

২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

ঢাক-গুড় গুড় তদন্ত আর মামলা-মোকদ্দমা : যোগফলটি কি?

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৫৫, ২৭ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট: ২৩:০২, ২৭ ডিসেম্বর ২০২১
ঢাক-গুড় গুড় তদন্ত আর মামলা-মোকদ্দমা : যোগফলটি কি?

ফাইল ছবি

দীর্ঘ ৪৫ বছরের মরচে ধরা পুরনো এবং দুর্বল আইনেই দেশে চলছে নৌ-দুর্র্ঘটনা মামলার বিচার। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরে ২০ হাজারের বেশি নৌযাত্রীর প্রাণহানি হলেও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি একটিও। এর মধ্যে গত ৯ বছরের মধ্যে চলতি ২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৩৯টি নৌযান দুর্ঘটনা ঘটেছে। এগুলো  খাতায় ওঠা হিসাব। এর বাইরে ছোট-খাটো আরো দুর্ঘটনা থেকে যায় হিসাবের বাইরে। এসব দুর্ঘটনায় সরকারি তথ্যমতেই নিহত হয়েছেন ১৪০ জন। নিখোঁজ অর্ধ শতের বেশি।   

বরিশালের সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ নামক লঞ্চের ভয়াবহ আগুন দুর্ঘটনার সূত্রেই এখন ওপরের এইসব তথ্য বিভিন্ন শিরোনামে মিডিয়ায় আসছে। হয়তো সামনে আরো কয়েকদিন এ নিয়ে কথাবার্তা চলবে। এরপর পত্রিকার শিরোনাম যেমন মানুষ সহজে ভুলে যায় তেমনি সংশ্লিষ্ট মহলগুলোও, যাদের দায়িত্ব এইসব ভয়াবহ দুর্ঘনার নির্ভুল কারণ সন্ধান ও এর যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করা- তারাও ভুলে যাবেন। যাতে ভবিষ্যতে এমন বিপুল প্রাণনাশকারি হৃদয়বিদারক এবং অনেক পরিবারকে তচনচ করে দেওয়া দুর্ঘটনা আর না ঘটে- এই চেষ্টা সংশ্লিষ্ট নৌযান মালিকদেরও নেওয়া উচিৎ। কিন্তু পরিহাসের বিষয় যে, এই বিষয়ে তারা যেমন আগে থাকেন পরেও তেমনি ভাবলেশহীন থাকেন। দুর্ঘটনার পর তথাকথিত ‘পুলিশি ঝামেলা’ মেটানোর নামে ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্থদের নানা কায়দায় বঞ্চিত করে নিজেরা নিরাপদে থাকার জন্য কিছু অর্থকরি আর দৌরাদৌরি করতে হয় তাদের- এই আরকি।

জানা গেছে, বাংলাদেশ নৌ পরিবহণ অধিদপ্তরের অধীন দেশের একমাত্র নৌআদালতে গত ১৮ বছরে নৌ দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে ২৫২টি। দীর্ঘ দেড়যুগে এসব মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১০৬টি। এখনো বিচারাদীন ১৪৬ মামলা। নিষ্পত্তি হওয়া ১০৬ মামলায় দোষীদের সাজা হয়েছে ৮৮টিতে, অভিযুক্ত আসামিরা খালাস পেয়েছেন ১৮টি মামলায়।

মামলা, মামলার রায় হতে দীর্ঘ সময়, প্রতিকূল পরিবেশ ঠিকমতো তথ্য না পাওয়া, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদন (ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত), দুর্ঘটনা সংঘটনাকারীদের পক্ষে তথা মালিকদের পক্ষে প্রভাবশালী মহলের অপতৎপরতা এবং ভিকটিমদের সঙ্গে আপসরফা ইত্যাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বা খামখেয়ালির কারণে ভয়াবহসব দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটিয়েও পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। ভুক্তভোগী এবং নৌ দুঘটনাজনিত মামলা-মোকদ্দমায় অভিজ্ঞদের মতে, একের পর এক দুর্ঘটনায় একাধিক নিরীহ যাত্রী হত্যার পরও দায়ীরা নামমাত্র বা অল্প সাজাতেই পার পেয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক দণ্ড ঘোষিত হয়।   

আইনবিদদের মতে, এসব নির্মম মৃত্যুকে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বলা হলেও এগুলো আসলে ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু কঠোর শাস্তির ধারাযুক্ত হালনাগাদ আইন না থাকায় দায়ীদের ঠিক ঠিক শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছে না। নৌ-আদালত (মেরিন কোর্ট) সংশ্লিষ্টদের মতে, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হয়। এর ফলে বিচারের সময় প্রায় ক্ষেত্রেই সাক্ষীও পাওয়া যায় না। এর অন্যায় ও অবৈধ সুফল ভোগ করে নৌ-যান মালিক তথা নৌ-মাফিয়ারা। দেখা গেছে, অনেক নৌ-দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানির ঘটনার ক্ষেত্রেও জড়িতদের শাস্তি হয়েছে নামমাত্র- কারণ মান্ধাতার আমলের ঔপনিবেশিক ধারার আইনি বিধানেই শাস্তি রয়েছে নামমাত্র।

মূলত যারা নৌযান ব্যবসা বিশেষ করে জাহাজ-লঞ্চে মানুষ ও মালামাল পরিবহনের ব্যবসায় বিশাল টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। তাই সাধারণত ধনাঢ্য ও প্রভাবশালীরা এই ব্যভসায় জড়িত হন। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে যা কিছুই ঘটুক বা হতে চাক তা তারা হতে দেয় না, তা যতই যৌক্তিক, নৈতিক বা আইন মোতাবেক হোক না কেন। এর অন্যতম প্রমাণ, গত আট বছর ধরে নৌ পরিবহন আইন সংশোধন আটকে থাকা। আইনটিতে নৌ দুর্ঘটনার দায়ে সর্বোচ সাজা ১০ বছর শাস্তির প্রস্তাব করা হলেও নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের চাপে তা কমিয়ে ফের পাঁচ বছর করা হয়। যদিও আর্থিক দণ্ডের পরিমাণ বাড়ানো হয়। তারপরও সেই আইনও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন সংশোধন থেমে নেই।

আইন সংশোধন থেমে থাকুক বা চলমান থাকুক, এখনকার বাস্তব হচ্ছে নৌ-আইনের ৭০ নম্বর ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর কারাদন্ড, সেই সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা। কিন্তু এই রায় দিতে হলেও আদালতকে একেকটি মামলা টেনে নিতে হয় বছরের পর বছর। তদুপরি নৌ-অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করছেন-এমন দৃষ্টান্ত বিরল।  

তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশে নৌ-চলাচল ও নৌ দুর্ঘটনা বিষয়ে গ্রহণযোগ্য কোনো জরিপ বা তথ্য পরিসংখ্যান নেই। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)র কাছেও এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য নেই।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে বিআইডব্লিউটিএ প্রকাশিত তথ্যে ১৯৬৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত নৌ দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও মোট সম্পদের ক্ষতির হিসাব তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, ৫০ বছরে নৌ দুর্ঘটনায় দেশে প্রাণ হারিয়েছেন ২০ হাজার ৫০৮ জন নৌযাত্রী।

তবে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র মতে, নৌযান দুর্ঘটনায় ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩৯২টি তদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে নৌ আদালতে ৩০৮টি মামলায় ২৬৫টিতে দন্ডাদেশ দেয়া হয়। এ ছাড়া পরিদর্শনকালে ত্রুটিজনিত কারণে ৫৭৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৭৫টি মামলা।

তবে এইসব ঢাক-গুড় গুড় তদন্ত আর মামলা-মোকদ্দমার সমান্তরালে যোগফলটি কি? এর উত্তর একটিমাত্র উদাহরণে মিলবে। ২০০২ সালের এপ্রিলে ঢাকা-ভোলা রুটে এমভি সালাউদ্দিন-২ লঞ্চ মেঘনা নদীর ষাটনল এলাকায় ডুবে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সাড়ে ৩ শতাধিক লোকের প্রাণহানি হয়। এ ঘটনায় অধ্যাদেশ অনুযায়ী দন্ড হয়। দন্ড বলতে লঞ্চমালিকের পরিবারের পাঁচ সদস্যের ১ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন বছর করে কারাদন্ড। তবে রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করে। আপিল রায়ে আসামিদের কারাগারেই যেতে হয়নি। গুণতেও হয়নি জরিমানাও। বহুল আলোচিত এমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনায় মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানায় ফৌজদারি আইনে মামলা হয়। তবে ‘মজার ব্যাপার’ হচ্ছে, নৌ-আইনে মামলা না হওয়ায় নৌ-আদালত এটির বিচার করতে পারেনি।

হয়তো বলবেন ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চ ডুবেছে- তাতে মালিকদের দোষ কি? নৌ আইনে মামলা হয়নি তাতে কার দোষ? কোনো কোনো চশমাওয়ালা চোখে হয়তো দোষ নেই, কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় আবহাওয়ার সতর্কতা উপেক্ষা করে, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ফিটনেসবিহীন নৌযানে যাত্রী বহন করা হয়। নিত্য ব্যবহার্য আনাজপাতি, শস্য, ফল-ফলাদিও এতটা বিচার-বিবেচনাহীনভাবে অমন দুর্যোগে বহন করা হয় না।

এমন কি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলও তারা এভাবে বহন করতো না। কিন্তু এদেশেরই নাগরিক জলজ্যান্ত মানুষদের এইসব অর্থগৃধ্নুরা ভয়াবহ বিপদজ্জনক আবহায় বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক নৌযানে করে পরিবহন করে জলন্ত বা ডুবন্ত লাশে পরিণত করছে বারবার।

এখন জানা যাচ্ছে, অভিযান-১০ লঞ্চে ইঞ্জিনরুমে আগুন লেগেছিল, ইঞ্চিনে আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখেও অন্য লঞ্চের সঙ্গে পাল্লা দিতে বাড়ানো হয় গতি, আগুন দেখে দ্রুত যে কোনো তীরে লঞ্চ না ভিড়িয়ে নদীর মাঝে লঞ্চ রেখে পালায় চালক! জানা গেছে, এ অবস্থায় জ্বলতে জ্বলতে লঞ্চটি ঘণ্টাখানেক নদীতে ভাসমান ছিল।

আচ্ছা বলুন তো- এসব কি কারও চোখ দেয় না। কেউ কি একটু সত্যিকারে নড়েচড়ে বসবেন না! আমরা সাধারণ মানুষদেরও এই বিষয়ে সচেতন হওয়াটা অতি জরুরি। সরকার এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সচেতন তৎপরতাই পারে প্রায় ‘প্রতিকারহীন’-এর পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া নৌ-অপরাধ তথা নৌ-হত্যাকাণ্ড বা নৌ-দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর কিছু একটা করতে।      

 

দিনবদলবিডি/আরকে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়