বুধবার

২৬ জানুয়ারি ২০২২


১৪ মাঘ ১৪২৮,

২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

ধন্য হে নির্মল মল!

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:১৮, ৭ জানুয়ারি ২০২২  
ধন্য হে নির্মল মল!

দিনবদলবিডি গ্রাফিক্স

ত্যাগের আনন্দ তুলনাহীন...’ কিংবা ‘জনাব, ভালই তো দিয়া গেলেন...’ এ ধরনের দ্বৈত অর্থবোধক রম্য বাক্যযুক্ত কার্টুন স্টিকার একসময়ে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল রসিক বাঙালি তরুণ-যুবাদের মাঝে। বিদ্রুপ ম্যাগাজিন ‘উম্মাদ ও ‘কার্টুন প্রকাশকদের তৈরি এসব স্টিকার বিক্রি হতো দেদার।

রঙচঙে স্টিকারগুলো বাড়ি, অফিস, গাড়ি বা স্কুল-কলেজের এখানে সেখানে সাঁটানো থাকতো। ওইসব স্টিকারে উল্লেখিত বাক্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকতো একটি হাই-কমোডের ছবি। অর্থাৎ এখানে ‘ত্যাগ বা ‘ভালই তো শব্দগুলোর দ্বারা আসলে মলত্যাগকেই বোঝানো হতো। প্রাকৃতিক এই কাজটি নিয়ে তীর্যক আর রসবোধক বাক্যগুলো পড়ে বাঙালিমাত্রই একবার হেসে উঠতেন।     

তবে মল, বিশেষ করে মনুষ্য বিষ্ঠার মতো আপাত অর্থহীন-মূল্যহীন বস্তু কিন্তু আসলেই অমূল্য হয়ে উঠতে যাচ্ছে বা গেছে বলা যায়। তাই মল নিয়ে আর আগের মতো ইঙ্গিতবাহী হাস্য-কৌতুক করার দিন হয়তো শেষ হয়ে এলো।

গার্ডিয়ানের এক রিপোর্ট মোতাবেক, এবার বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলছেন- হ্যাঁ, রক্ত বা শরীরের অন্যান্য অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতোই মলও দান করা যাবে এবার থেকে। সেই মোতাবেক আগামীতে ক্রমশ বাড়তে থাকবে মলদানের চাহিদা। তবে সেই মল বা বিষ্ঠাকে হতে হবে নির্দিষ্ট পর্যায়ের উচ্চ গুণ-মান সম্পন্ন। 

কিন্তু কেন? হঠাৎ এই বর্জ্য পদার্থটি এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো ‘দানসামগ্রী হিসেবে?

আসলে, কোনো একজনের ভাল (যথাযথ গুণ-মানসম্পন্ন) মল এখন রোগগ্রস্ত অন্য কারো অন্ত্রের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। সে কারণেই এ ধরনের মলদাতাদের ডাকা হচ্ছে ‘সুপার পু ডোনার ‍(Super বা GOOD POO DONORS) হিসেবে। এ ধরনের মলদাতাদের ইউকির্ন নামেও ডাকা হচ্ছে। কারণ, রূপকথার ইউনিকর্ন নামক একশিংওয়ালা ভেড়ার দর্শন পাওয়া যেমন দুষ্কর, তেমনই বিরলদর্শন এই সুপার মলদাতারাও।

তবে বিরল হলেও তাদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। এ সূত্রে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া সমস্যাজনিত চিকিৎসায় নতুন দিশা খুঁজে পাচ্ছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে ডিজাইনার ব্যাকটেরিয়া তৈরি করার কাজেও আসবে ওই মল। যাতে পেটের বিশেষ ধরনের রোগের চিকিৎসা হয়।

যত দিন যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা তত বুঝতে পারছেন, মানব শরীরের মাইক্রোবায়োম অর্থাৎ শরীরে বসবাসকারী আণুবীক্ষণিক জীবদের বিরাট প্রভাব রয়েছে শারীরিক সুস্থতার বিষয়ে। আসলে এই সব আদ্যপ্রাণীরা শরীর ও মনের স্বাস্থ্যের ওপরে প্রভাব ফেলে ব্যাপক। আজকের দিনে ফাস্ট ফুড ও অ্যান্টি বায়োটিকের বাড়াবাড়ি প্রয়োগে মানবদেহের বাসিন্দা  মাইক্রবসদের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। যার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে তাদের আবাস এই আমাদেরই শরীরে।

আশা করা যায়, ফাস্ট ফুড ও অ্যান্টিবায়োটিকের নেতিবাচক প্রভাবের দুর্যোগও ঠেকাবে ‘উচ্চ মানের মল! দেখা যাচ্ছে, ওই ধরনের মলে থাকা ভালো মানের ব্যাকটেরিয়া অসুস্থ ব্যক্তির শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে অন্ত্র ফের শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সেই কারণেই এই ধরনের মলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপার স্টুল। তবে সম্ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে কঠিন বাস্তব হচ্ছে- চাহিদা মতো (ধারণা করা যায়, ভবিষ্যতে এর ব্যাপক জরুরত দেখা দিবে) এই ধরনের দাতা খুঁজে বের করা কষ্টসাধ্য।

অবশ্য সেই কাজেই এখন অভিনিবেশ করেছে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড শহরের বায়োমব্যাংক (মল ব্যাংক)। তারা শুরু করেছে ‘ইউনিকর্ন তথা ভালো মলধারী ব্যক্তিদের ‘শিকার অর্থাৎ চিহ্নিত করার কাজ।

এই লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে মল বা স্টুল ব্যাংক। মল প্রত্যর্পণও (দান বা জমা) এখানেই করা হয়। দাতাদের মল সংগ্রহ করে সেখান থেকে ব্যাকটেরিয়া স্ট্রেন বের করে নিয়ে তাকে বিশেষ এক ধরনের তরলে রাখা হয়। সেখানেই তারা বাড়তে থাকে। তারপর তাদের আলাদা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে রেখে দেওয়া হয় নিরাপদ আধারে। পরে প্রয়োজন অনুসারে ব্যবহার করা হয়।

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার পরে হওয়া স্বস্তি আর আরাম বোধকে সন্তানের বাবা হওয়ার আনন্দের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন রসরাজ গোপাল ভাঁড়। কিন্তু যার সামনে তিনি খোশ মেজাজে এই ‘রাখ-ঢাক করে রাখার বিষয়টিকে ওভাবে উপভোগ্য করে পরিবেশন করেছিলেন, সেই মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে তা প্রীতিকর মনে হয়নি। কারণ, মলত্যাগ বিষয়টিকে কমবেশি সবাই একটু ‘নাক সিঁটকানো ভাব নিয়ে দেখে থাকেন।

তবে এর প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করারও কোনো উপায় কিন্তু নেই। ওদিকে বাস্তব ক্ষেত্রে গোপাল ভাঁড় এই সত্যের উপস্থাপন করতে গিয়ে কিন্তু রোষে পড়েছিলেন রাজার। ফলে তাকে শাস্তি পেতে হয়েছিল। শেষে অবশ্য গোপাল অন্য এক ঘটনার সূত্রে কৃষ্ণ চন্দ্রকে তার ভুল স্বীকারে বাধ্য করে মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন।

হয়তো গোপাল ভাঁড় এখন বেঁচে থাকলে পেটের কঠিন পীড়ার চিকিৎসায় মল ব্যবহারের এই খবর জেনে স্বস্তি পেতেন এবং আরো মজার কোনো রসগল্প তৈরি করে ফেলতেন। হয়তো তিনি বলতেন, ‘ধন্য হে নির্মল মল!’ কারণ, এই মলই মানুষকে রোগ নামক মল থেকে মুক্তি দেবে, করবে তাকে নিরোগ। 

দিনবদলবিডি/আরকে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়