শনিবার

২৮ মে ২০২২


১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,

২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

এত মুখোশ, এত ছদ্মবেশী অপরাধী!

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:২৭, ১৫ জানুয়ারি ২০২২  
এত মুখোশ, এত ছদ্মবেশী অপরাধী!

সেলিম ফকির -ফাইল ফটো

ভাঙা তরী ছেঁড়া পালগানেরমডেলহয়ে সোশাল মিডিয়ায় পরিচিতি পাওয়া সেলিম ফকির ওরফে হেলাল হোসেনকে পাকড়াও করার পর ্যাব জানায়, বাস্তবে ছদ্মবেশধারী এক খুনি এবং একাধিক হত্যা মামলার পলাতক আসামি এই  সেলিম ফকির। ২০ বছর ধরে ফেরারি ছিল এই ঘাতক।

গত বুধবার রাতে তাকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, নিজের পরিচয় গোপন করতেই বেশভূষা পরিবর্তন করে বড় চুল দাড়ি রাখেন সেলিম। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি মিউজিক ভিডিওতে বাউল বেশে হাজির হয়ে পরিচিতি পান। এর মধ্যেভাঙা তরী ছেঁড়া পালগানটি বেশ জনপ্রিয়তাও পায়।

বগুড়ায় একটি খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সেলিম ফকির ফেরারী অবস্থায় সিলেটে শাহজালাল (.) এর মাজারহ দেশের বিভিন্ন মাজার বা রেলস্টেশনকে নিজের আশ্রয় বানিয়ে আসছিলেন।

সর্বশেষ ছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে। এখানে নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্টেশনের ভবঘুরে বাসিন্দা খুদেজা বেগম ওরফে খুদি নামের ভিক্ষুকের সঙ্গে সংসার পাতেন। সর্বশেষ পৌর এলাকার আমলাপাড়া এলাকায় থাকছিল তারা ভাড়া বাসায়।

বুধবার সন্ধ্যায় সেলিম ্যাবের হাতে ধরা পড়লে হতভম্ব হয়ে যান স্ত্রীসহ আশপাশের মানুষ। বিষয়টি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারেনি তারা। কিন্তু পরদিন বৃহস্পতিবার টিভি বিভিন্ন অনলাইনের নিউজ পোর্টালের সংবাদে ভুল ভাঙে তাদের।

ভৈরব স্টেশন কেন্দ্রিক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, সেলিম কারো সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলতো না। হাঁটতো আর গান গাইতো। বেশভুষায়সংসার বিরাগী আধ্যাত্মিকএই ব্যক্তি বাউল গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো।

২০০১ সালে বগুড়ার চাঞ্চল্যকর মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হেলাল ওরফে সেলিম ফকির। এছাড়াও আরো ২টি হত্যা মামলায় তার জড়িত থাকার কথা ্যাবের কাছে স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে।

তাকেভয়ঙ্কর এক সিরিয়াল কিলারহিসেবে উল্লেখ করে ্যাব কর্মকর্তা জানান- সেলিম ফকির, হেলাল, হেলাল হোসেন- এরকম নানা নাম ব্যবহার করে নিজেকে আড়াল করতেন তিনি। সেলিমের বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে, তার মধ্যে অন্তত দুটি উত্তরবঙ্গ এলাকার। কোনো কোনো মামলায় সাজাও হয়েছে তার।

তার বাসার পাশের চায়ের দোকানদার বিস্মিত কণ্ঠে বলেন, এত বড় খুনি আমাদের পাশে থাকতো তা আমরা জানতামই না!

প্রশ্নটা এখানেই। ভয়াবহ ঠান্ডা মাথার এই ধরনের খুনিরা ছদ্মবেশ নিয়ে আমাদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে। সেলিম ফকির একাধিক খুন করে ছদ্মবেশ নিয়েছেন আমাদের আবহমান বাংলার মফস্বল গ্রামীণ জনপদে কমবেশি আদরণীয় নিপাট নিরীহ বাউলের। এখজন খুনি বাউল গান গেয়ে স্টেশনের লোকজনের মনোরঞ্জন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন- ভাবা যায়? গাইছেন ভাঙা তরী ছেঁড়া পালএর মতো মন উদাস করা বিবাগী গান

সেলিম ফকিরের এমন ঘটনা গাঁ শিউড়ানো নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার (বর্তমান বিজয়নগর উপজেলা) নিদারাবাদ গ্রামে নৃশংসভাবে খুন হন একই পরিবারের ছয় সদস্য। সেই কালরাতে গ্রামের শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী বিরজাবালা পাঁচ সন্তানকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করে কেটে ড্রামে ভরে বিলের পানিতে ডুবিয়ে রাখে খুনি তাজুল ইসলাম তার সঙ্গীরা। এই হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পায়নি দুই বছরের শিশুও।

নিরীহ শশাঙ্কের জমিজমা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য নৃশংসতম জঘন্য ঘটনাটি ঘটায় একই এলাকার কসাই তাজুল। তার আগে শশাঙ্ক দেবনাথকেও ডেকে নিয়ে হত্যা করে সে। শশাঙ্ককে হত্যার দুই বছর পর তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার পর মরদেহগুলো কেটে দুটি ড্রামভর্তি করে গ্রামের আড়াই কিলোমিটার দূরের ধুপাজুড়ি বিলের পানিতে ডুবিয়ে দেয় ঘাতকরা। লাশগুলেনা যাতে দ্রুত গলে পানিতে মিশে যায় সেজন্য ড্রামে চুন মিশিয়ে দেয়া হয়। তাজুল ভেবেছিল ভয়াবহ ওই হত্যাকাণ্ডের খবর কেউ জানবে না। কিন্তু দিন দশেকের মধ্যেই এলাকার শিক্ষক মোবারক বিল পারাপারের সময়ে নৌকার তলায় শক্ত কিছুতে ধাক্কা লাগে টের পান। তার নির্দেশে মাঝি বৈঠা দিয়ে খোঁচা দিতেই লাশভর্তি একটি ড্রামের সন্ধান মেলে। এরপর আরেকটি।

পাওয়া যায় মোট ৬টি লাশ। কেঁপে ওঠে সারাদেশের মানুষের অন্তরাত্মা। ওদিকে লাশ উদ্ধারের খবর জানার পর কসাই তাজুল গা ঢাকা দেয়। সে চুল-দাঁড়ি লম্বা করে তবলিগ জামাতের সঙ্গে মিশে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সিআইডি পুলিশ রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ ঘটনায় ৩৮ জনকে দায়ী করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়।  ১৯৯০-এর জুনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জজ আদালত এক রায়ে নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ড মামলায় জনের ফাঁসি, ২৭ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দুজনকে বেকসুর খালাস দেন। পরে উচ্চ আদালত খুনি তাজুল ইসলাম, বাদশা মিয়ার ফাঁসি আটজনের যাবজ্জীবন দণ্ড বহাল রাখেন। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে আবুল হোসেন নামে একজন এখনো পলাতক।

১৯৯৩ সালের ১১ আগস্ট রাত ২টা মিনিটে কুমিল্লা জেলা কারাগারে তাজুল বাদশার ফাঁসি কার্যকর হয়। খুনি কসাই তাজুলের প্রতি মানুষের ঘৃণা-ক্ষোভ এতটাই প্রকট ছিল যে, তার ফাঁসি কার্যকরের পর অনেক এলাকায় ঘরে ঘরে মিষ্টি বিলায় মানুষ। তার লাশ কারাগার থেকে বের করার সময় ক্ষুব্ধ মানুষ থুথু ছিটিয়েছে। ছুঁড়ে মেরেছে জুতাও।

নিদারাবাদের কসাই তাজুলের রোমহর্ষক নৃশংসতা এবং এরপর তার অতি ধূর্ত কায়দায় আত্মগোপন তৎকালীন পুরিশ প্রশাসনকে অস্থির করে তুলেছিল। সরকারের উচ্চমহল খুনি তাজুলকে ধরার জন্য সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিচ্ছিল। কারণ বিষয়টি জনদাবিতে পরিণত হয়েছিল তখন। শেষ পর্যন্ত তবলিগ জামাতের সঙ্গে মিশে যাওয়া তাজুলকে ঠিকই পাকড়াও করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

তিনটি খুনে জড়িত সেলিম ফকিরকে ্যাব গ্রেপ্তার করে প্রশংসনীয় দক্ষতা দেখিয়েছে। এজন্য তাদের সাধুবাদ। ৩৩ বছর আগের নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ডের নায়ক কসাই তাজুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ জনমানুষের প্রশংসাধন্য হয়েছিল। ধরনের আরো অনেক জটিল কঠিন চাঞ্চল্যকর কেসের সমাধানে আইনশৃংঙ্খলাবাহিনীর দেশপ্রেমিক নিবেদিতপ্রাণ সদস্যদের কাছে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। 

কিন্তু হতাশা পরিতাপের বিষয় যে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালে সেলিম ফকির বা  তাজুল ইসলামের মতো ছদ্মবেশি পিশাচ খুনীদের অপকর্মের সংবাদ আজকাল অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে যেন। আগে ধরনের ঘটনা মাসে বা ছয় মাসে এক আধটা ঘটতো। এখন দেখা যায় সপ্তাহে সপ্তাহে ঘটছে গা শিউড়ানো বিবেক চাবকানো নৃশংস ঘটনা। একের পর এক ঘটে চলেছে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা, ডাবল-ট্রিপল মার্ডারের গঠনা। কোনো কোনো দিন এমন হয় মিডিয়ায় একইদিন ঘটে যায় ধরনের একাধিক সংবাদ- আমরা এখন নির্বিকার চিত্তে নাশতা করতে করতে বা চায়ের পেয়ালায় চুমুক তে দিতে সেসব প্রতিবেদন দেখে যাই। 

অনেক সময়ে কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক যে সংবাদ প্রকাশিত হয় এবং প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যগুলো কিন্তু পরবর্তীতে সঠিক নাও হতে পারে। আবার সঠিকও হতে পারে। কিন্তু মিডিয়া এই ধরনের খবর তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করে থাকে- এতে অনেক সময়েই মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হয়ে অনেক নিরপরাধ ভুক্তভোগীর জীবন কণ্টকময় হয়ে পড়ে। নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও কম হয় না, এবং সেটা যৌক্তিকও।  তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ্যাব, পুলিশ, পিবিআই, ডিবি, সিআইডির এইসব তথ্যসূত্রে প্রকাশিত সংবাদগুলো সঠিক হয়। পরবর্তীতে তার ভিত্তিতে আদালতে কার্যক্রম চলে।

আমরা জানি, সুস্থ মস্তিষ্কের সুনাগরিকদের কেউ চাইবেন না এইসব সংবাদ বারবার পড়তে অর্থাৎ এইসব ঘটনাই যাতে না ঘটে আর। আমরাও কায়মনোবাক্যে এটাই চাই।

কিন্তু ঘটনা তো ঘটনা তো ঘটেই চলেছে। ক্রমশ নাগরিক জীবনাচারে বদলাতে থাকা বিশ্ব-জগত জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। অপরাধের কর্মকৌশল বদলাচ্ছে। তবে যারা এসব অপরাধ করছে তারা কিন্তু সেই আগেরই লোকগুলো- আমাদের আশপাশের মানুষজন। এরা কিন্তু কেউ ভিনগ্রহ থেকে আসেনি।

আসুন, সবাই মিলে মানসিক বিকারগ্রস্থ, পিশাচের অন্তর নিয়ে চরাচরে বিচরণ করা এই মানুষরূপী দানবগুলোকে প্রতিরোধ করি। এদের ছদ্মবেশ ছিঁড়েফুঁড়ে প্রকাশ্যে নিয়ে আসি। সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, সমাজের ওপর আমরা সবাই নির্ভরশীল পারষ্পরিক নিরাপত্তার প্রয়োজনে। কিন্তু এই অপরাধীগুলোকে শক্তহাতে এক্কেবারে প্রথম পর্যায়ে চিহ্নিত এবং প্রতিরোধ করতে হবে আপনার এবং আমারই।

মাদকাসক্ত, তুচ্ছ ঘটনায় হাতে ছুরি-পিস্তল  নিয়ে চোখেমুখে জীঘাংসা জেগে ওঠা ইয়াবাখোর খুনি, নারীলোলুপ লম্পট-ধর্ষক স্বভাবের মানুষগুলো কিন্তু আপনার আমার বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী, সহকর্মী, অধঃস্থন বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এদের মুখ চেয়ে এড়িয়ে যাওয়া এবংঝামেলায় না জড়ানোরমানসিকতা ত্যাগ করে সোচ্চার হতেই হবে আমাদের। কাজে বিশ্ব কাঙ্খিত নয়।

নইলে দুনিয়ার সবচেয়ে উন্নত পুলিশ দল, প্রশাসন, আইন দিয়েও আত্মরক্ষা করা যাবে না। এই আহ্বান সবার জন্য- যারা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দায়িত্বে আছেন এবং যারা অতি সাধারণ নাগরিক, সবার জন্য।     

দিনবদলবিডি/আরকে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়