শনিবার

২৮ মে ২০২২


১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,

২৬ শাওয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

পুলিশের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে যখন ইয়াবাওয়ালা...

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৩৪, ১৯ জানুয়ারি ২০২২   আপডেট: ১০:২৯, ২০ জানুয়ারি ২০২২
পুলিশের গাড়ির ড্রাইভিং সিটে যখন ইয়াবাওয়ালা...

দুর্ঘটনা কবলিত পুলিশের গাড়ি -ফাইল ছবি

পাঠান মুলুকের ইংরেজ আমলের গল্প। এক সর্দারজি থানায় দৌড়ে এলেন হাঁপাতে হাঁপাতে। দারোগা সাহেব জিজ্ঞেস করলেন: কেইস কি?

সর্দারজি বললেন, চোর ধরেছি, হুজুর!

দারোগা : কোথায় তোমার চোর?

সর্দারজি : হুজুর, বাড়িতে রেখে এসেছি।

দারোগা : বাড়িতে রেখে এসেছো! কার জিম্মায়?

সর্দারজি : বেঁধে রেখে এসেছি খাটিয়ার পায়ার সঙ্গে।

দারোগা : দুই হাত শক্ত করে বেঁধে রেখে এসেছো তো?

সর্দারজি : জ্বী না, হুজুর। ওর ডান হাত শক্ত করে বেঁধে রেখে এসেছি।

ইংরেজ দারোগার মুখ হাঁ হয়ে গেল। বলে কি? চমক সামলে তিনি ফের প্রশ্ন করেন-

এক হাত বেঁধে রেখে এসেছো? চোর অন্য হাত দিয়ে দড়ি খুলে পালিয়ে যাবে এটা মাথায় আসেনি?

এবার কিছুটা বোকা বোকা ভাব নিয়ে তাকায় সর্দারজি। চিন্তিত ভাব ফোটে চোখেমুখে। তবে কয়েক সেকেন্ড মাথা চুলকেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে-

হুজুর চোর ভাগবে না।

দারোগা : কেন?

সর্দারজি : হুজুর, আমিও পাঠান, চোরও পাঠান। আমার মাথায় যখন এই বুদ্ধি আসে নাই, তাহলে চোরের মাথায়ও এই বুদ্ধি আসবে না, নিশ্চিত!

ইংরেজ পুলিশ কর্তার মন বিশ্বাস করতে চায় না এমন কথা। তারপরও সর্দারজির পীড়াপীড়িতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন- কথা সত্য! খাটিয়ার পায়ার সঙ্গে একহাত বাঁধা চোর শান্ত ভাব নিয়ে বসে আছে। আর মুক্ত হাতটি দিয়ে কান চুলকে চোখ মুদে বিনে পয়সার বিনোদন সুখ উপভোগ করছে... 

পাঠান সর্দারদের সরলতা (কারও কারও মতে বোকামি) নিয়ে প্রচলিত এই গল্পটি অনেকেরই জানা। অবশ্য আজকাল এসব চুটকি ধরনের গল্প শুনে কেউ আর হাসে না, আমিও না।

তবে পুলিশ বাহিনীর কিছু ঊর্দ্ধতন এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দায়িত্বজ্ঞানহীনতার জের ধরে পরিতাপ ও আফসোসসহ গল্পটি মনে করিয়ে দিলেন ‘ইয়াবা পাচারকারী আলমগীর হোসেন’। ঘটনাটি বেদানাদায়ক ও শোকাতুর একটি সংবাদের সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। এ সংক্রান্ত প্রথম সংবাদটি ছিল এমন-

‘সোনারগাঁয়ে পুলিশের গাড়ি খাদে, ২ এসআই নিহত

 

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানা–পুলিশের একটি গাড়ি খাদে পড়ে দুই উপপরিদর্শক (এসআই) কাজী সালেহ আহাম্মেদ ও শরীফুল ইসলাম নিহত হয়েছেন। সোমবার (১৭ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাতটার দিকে সোনারগাঁ পৌরসভার দত্তপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ওই দুই এসআই হলেন সালেহ আহাম্মেদ ও শরীফুল ইসলাম। এ ছাড়া এএসআই রফিকুল ইসলাম আহত হয়েছেন।

সোনারগাঁ থানার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, এসআই সালেহ আহাম্মেদ ও শরীফুল ইসলাম এবং এএসআই রফিকুলকে নিয়ে একটি গাড়ি সোনারগাঁ পৌরসভার দত্তপাড়া এলাকা দিয়ে থানার দিকে আসছিল। পথে দত্তপাড়া এলাকায় পৌঁছলে গাড়িটি একটি রিকশাকে সাইড দিতে গিয়ে পাশের পুকুরে পড়ে যায়। খবর পেয়ে আশপাশের লোকজন ও সোনারগাঁ ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা এসে তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক কাজী সালেহ ও শরীফুলকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত রফিকুলকে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।’ (প্রথম আলো)

পরেরদিন মঙ্গলবার (১৮ জানুয়ারি) অপর জাতীয় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে একই সংবাদের ফলোআপ ছিল এরকম-

‘গাড়ি চালাচ্ছিল ৪২ হাজার পিস ইয়াবাসহ আটক আসামি

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও পৌরসভার দত্তপাড়া এলাকায় পুলিশের দুই উপপরিদর্শক (এসআই) নিহত হওয়ার ঘটনায় পালিয়ে যাওয়া সেই আসামিকে (আলমগীর) ধরতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই আসামিকে দিয়ে গাড়ি চালানো হচ্ছিল। এ সুযোগে ওই আসামি গাড়ি খাদে ফেলে পালিয়ে যায়।

মঙ্গলবার দুপুরে জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোস্তাফিজুর রহমান  জানান, আসামিকে এখনও ধরা যায়নি। হতাহতরা সোনারগাঁও থানায় কর্তরত ছিলেন।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, সোনারগাঁওয়ের মেঘনা টোলপ্লাজায় তল্লাশি চৌকিতে একটি গাড়িকে থামার জন্য সংকেত দেওয়ার পর সেটি এক কনস্টেবলকে আহত করে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরে ধাওয়া করে ইয়াবা পাচারকারী আলমগীর হোসেনকে গাড়িসহ ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ।

এ সময় তার কাছ থেকে ৪২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এরপর আলমগীরকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আনা হয়। এ সময় সে গাড়ি চালিয়েছে। এসপি অফিসে সংবাদ সম্মেলনের পর তাকে নিয়ে থানায় যাওয়ার জন্য রওয়ানা দেন দুই এসআই ও এক এএসআই। তবে তিন পুলিশ কর্মকর্তার কেউই গাড়ি চালাতে পারতেন না। ফলে তারা আসামিকে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেন। এ সুযোগে সোনারগাঁওয়ের দত্তপাড়া এলাকায় গাড়ি থেকে কৌশলে লাফ দিয়ে তা খাদে ফেলে দিয়ে চালক পালিয়ে যায়। এতে দুই এসআই নিহত হন ও গুরুতর আহত হন এক এএসআই।’

আগেই বলেছি, এ ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশের যে দুজন এসআই নিহত হয়েছেন তাদের আত্মার শান্তি কামনাসহ শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য রইলো আন্তরিক সমবেদনা। আশা করছি পুলিশ প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দুটির যথার্থ ক্ষতিপূরণ দানে তৎপর হবে দ্রুত।

পাঠক নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন প্রথম সংবাদে বলা হয়েছে, পুলিশের গাড়িটি একটি রিকশাকে সাইড দিতে গিয়ে খাদে পড়ে যায়। এই সংবাদ ঘটনার দিন প্রায় সব মিডিয়ায় একই তথ্য নিয়ে একইভাবে এসেছে।

 

পরেরদিনের আপডেট সংবাদে দেখা যায়, ওই গাড়িটি আসলে চালাচ্ছিল পুলিশের হাতে আটক কথিত ইয়াবা পাচারকারী আলমগীর। এই সংবাদগুলো পরিবেশন করেছেন সংশ্লিষ্ট পত্রিকাগুলোর স্থানীয় রিপোর্টাররা। তারা সংবাদের সূত্র পেয়েছেন প্রথমত থানা-পুলিশ থেকে। মাসুদ রানা বা জেমস বন্ডের কাহিনী নিয়ে নির্মিত থ্রিলার মুভির মতো এখানে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে এক ধূর্ত-স্মার্ট চোরের পালিয়ে যাওয়ার কাহিনীটি প্রথমদিকের সংবাদে এমন ছিল- পুলিশের গাড়ি একটি রিকশাকে বাঁচাতে গিয়ে পাশের ডোবা বা পুকুরে পড়ে গেছে। দুজন পুলিশ কর্মকর্তা মারা গেছেন। কিন্তু রিকশা আরোহীদের বাঁচাতে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে- এইরকম সংবাদে পুলিশের প্রতি এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ কিন্তু জেগে ওঠে। আর এটা হলে সমগ্র পুলিশ সমাজসহ সবাই কষ্টের মাঝেও এক ধরনের গৌরবজনক সন্তুষ্টি অনুভব করতো।

কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। এর থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার প্রমাণিত হলো যে অনেক সংবাদ যা আমরা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল সূত্রে জানতে পারি তা পরবর্তীতে ঠিক নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ঘটনা সম্পূর্ণ উল্টো ঘটেছে। আবার এমন সম্ভাবনাও আছে যে, আগামীকাল বা তার পরের কোনো একদিন হয়তো এ সংক্রান্ত আরেকটি সংবাদ ছাপা হবে যাতে দেখা যাবে, আসলে আলমগীর নামের কথিত ব্যক্তি কোনো ইয়াবা পাচারকারী-ই নন, তিনি হয়তো অন্য কোনো ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি। অথবা এমনও হতে পারে সেখানে আলমগীর নামে কোনো ব্যক্তি-ই ছিলেন না। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন পুলিশেরই কোনো সদস্য।

ইয়াবা যেখানে ইস্যু সেখানে অতি সাবধানতার জন্য অনেক কিছুই হতে পারে। এগুলো শুধু ঘটনার ধারাবাহিকতা সূত্রে কিছু সম্ভাব্যতার বিচারে তুলে ধরা হলো। আশা করছি সংশ্লিষ্টরা এর গুরুত্ব অনুধাবন করবেন।

এখন আসা যাক গাড়ি চালনা প্রসঙ্গে। একটি থানায় একটি বিশেষ দায়িত্বে থাকা তিনজন পুলিশ কর্মকর্তার কেউ-ই গাড়ি চালাতে জানেন না- এবং তারপরও এসপি অফিসে কথিত ওই ইয়াবাওয়ালাকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষে তাদেরকে গাড়িতে করে পাঠানো হয়েছে ইয়াবা পাচারকারীকেসহ!

এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ঊর্দ্ধতন কোনো কর্মকর্তা কি ছিলেন এ ধরনের কর্মবণ্টনের দায়িত্বে যেখানে পুলিশের গাড়ি যাবে কিন্তু চালক থাকবে না! পুলিশ রুলসের কোথাও কি এরকম কাণ্ডের পক্ষে বিধি-বিধান কিছু আছে?

এবং ওই পুলিশ কর্মকর্তারা সেই গাড়ি চালানোর দায়িত্ব সঁপে দিলেন তাদেরই বন্দিকে! কেন?

এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে সংশ্লিষ্টদেরকে। পুলিশকে হতে হবে পুলিশের মতো স্মার্ট- এবং অপরাধীর মনস্তত্ত্ব তাদেরকে বুঝতে হবে। সেই পাঠান সর্দারজির মতো ভাবলে এখানে চলবে না যে- ইয়াবাওয়ালাও বাঙালি আর আমরাও বাঙালি। তাই আমরা যখন গাড়ি পুকুরে ফেলে পালানোর কথা চিন্তা করছি না তাই ইয়াবাওয়ালাও তা করবে না!

এই কথাগুলো ভাবতে হবে মহাশয়বৃন্দকে।

পুনশ্চ : পুলিশের ট্রেনিংয়ে অন্তত অফিসারদের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা উচিৎ। আমাদের জানা মতে সশস্ত্র বাহিনীতে এই ব্যবস্থা আছে। শুধু গাড়ি চালনাই নয়- নদীমাতৃক এই দেশে সম্মানিত পুলিশ সদস্যদের চাকরি শুরুর আগে সাঁতার জানাটাও বাধ্যতামূলক করা উচিৎ।

প্রশিক্ষণকালেই অস্ত্রচালনা ও ডিসিপ্লিন শেখানোর মতো সাঁতার এবং ড্রাইভিং শেখাটাও তাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি- আশা করছি এ ধরনের অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি ঠেকাতে বৃহত্তর স্বার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়টায় একমত হবেন।  

দিনবদলবিডি/আরকে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়