সোমবার

২৩ মে ২০২২


৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯,

২১ শাওয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

এসব অগ্নিসংযোগে যদি শ্রীলঙ্কার সমস্যার দানবটা ভষ্মিভূত হতো!

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:০৬, ১০ মে ২০২২   আপডেট: ১৬:৩২, ১১ মে ২০২২
এসব অগ্নিসংযোগে যদি শ্রীলঙ্কার সমস্যার দানবটা ভষ্মিভূত হতো!

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ শ্রীলঙ্কা -ফাইল ফটো

বিক্ষোভকারীদের গুলি ছোড়ার পর নিজ অস্ত্রে লঙ্কার এমপির আত্মহত্যা। এই সংবাদটি এখন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম। খুবই জনপ্রিয় এবং ক্ষমতাসীন সরকারি একটি দলের এমপি কোন অবস্থায় তাকে ঘিরে ধরা বিক্ষোভাকারীদের দিকে শটগানের গুলি ছুড়তে পারেন (যাতে একজন নিহত হয়) তা সহজেই অনুমেয়।

এরপর তিনি গাড়ি ছেড়ে দৌড়ে একটি ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু মুহূর্তেই ভবনটি ঘিরে ফেলে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। এই অবস্থায় মানসিক চাপ সামলাতে না পেরে চরম আতঙ্কিত এমপি অমরাকীর্তি আথুকোরালা গণপিটুনিতে নির্মম মৃত্যুর ভয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

এই ঘটনা ঘটছে দক্ষিণ এশিয়ার এমন একটি দেশে যেখানে শিক্ষার হার ৯৫ শতাংশ এবং কিছুকাল আগেও যাদের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৪ হাজার ডলারের বেশি। তাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে গণমুখী। স্বাস্থ্যব্যবস্থায়ও এতদঞ্চলের সেরা ছিল তারাই।   

কিন্তু এমন একটি দেশের একজন আইন প্রণেতা কেন বিক্ষোভকারীদের গুলি করে নিজে আত্মহত্যা করলেন তার পটভূমি সম্পর্কে কমবেশি আমরা সবাই অবগত। জাতীয়ভাবে চরমতম অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখে দেশটির জনগণ এখন রাস্তায় নেমে এসেছে। 

১৯৪৮ সালে বৃটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে লঙ্কান প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে আজ (মঙ্গলবার, ১০ মে) পদত্যাগ করেছেন।

তবে জনগণ চাইছে মাহিন্দার ছোট ভাই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের পদত্যাগ। প্রেসিডেন্টশাসিত দেশটিতে তিনিই সরকার প্রধান। এই দাবিতে গত ৩১ মার্চ প্রেসিডেন্টের বাসভবনে হামলার চেষ্টা করে শত শত বিক্ষোভকারী। এরপর পুরো এপ্রিল মাসের ৩০টি দিন পার হয়ে গেছে। পরের মাস চলতি মে মাসেরও ১০ম দিন আজ।

কিন্তু অনেকটা যেন- ‘দেশ জাহানান্নামে যাক’ কিন্তু শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নন্দসেনা গোতাবায়া রাজাপাক্ষে ক্ষমতা ছাড়তে রাজি নন।

৩১ মার্চ গোতাবায়ার পদত্যাগ দাবিতে বিরোধীদের কর্তৃক প্রেসিডেন্ট ভবন ঘেরাওয়ের পর থেকে গতকাল ৯ মে পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় চলমান সংকটের আলোচিত ঘটনাগুলো এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক।

৩১ মার্চ- শত শত বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের পদত্যাগের দাবিতে তার বাসভবনে হামলার চেষ্টা করে।

১ এপ্রিল- দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন গোতাবায়া। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার ও আটক রাখার ক্ষমতাও দেন আইনপ্রয়োগকারীদের।

২ এপ্রিল- দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে ৩৬ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনা মোতায়েন।

৩ এপ্রিল- গভীর রাতে লঙ্কার মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্যই পদ থেকে সরে দাঁড়ায়। এতে ক্ষমতার শীর্ষ আঁকড়ে থাকা দুই সহোদর গোতাবায়া ও মাহিন্দা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

৪ এপ্রিল- রাজাপক্ষে ভাইয়েরা ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয় বিরোধী দলগুলোকে। কিন্তু এই টোপ গিলতে বিরোধীরা কেউ রাজি হয়নি। এদিন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও পদত্যাগ করেন।

৫ এপ্রিল- নতুন অর্থমন্ত্রী আলী সাবরিও শপথ নেওয়ার পরপরই পদত্যাগ করলে গোতাবায়ার সংকট আরও জটিলতর হয়। এসময় সাবেক মিত্ররা পদত্যাগের আহ্বান করলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান প্রেসিডেন্ট।

৯ এপ্রিল- রাজাপক্ষে সরকারের পদত্যাগ দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে হাজারো বিক্ষুব্ধ মানুষ।

১০ এপ্রিল- লঙ্কান চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালগুলোতে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মজুত প্রায় শেষ। তারা সতর্ক করে জানান, ওষুধের সংকটে করোনাভাইরাস সংক্রমণের চেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে দেশটিতে।

১২ এপ্রিল- ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ খেলাপির ঘোষণা দেয় সরকার। অতি জরুরি পণ্য কিনতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শেষের দিকে বলে জানায় তারা।

১৮ এপ্রিল- মন্ত্রিসভায় নতুন সদস্য নিয়োগ করা হলেও নতুন সরকারে নিজের বড় ভাই ও সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাখেন গোতাবায়া।

১৯ এপ্রিল- কয়েক সপ্তাহ ধরে সরকারবিরোধী টানা বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় পুলিশের গুলিতে প্রথম একজন বিক্ষোভকারী নিহতের ঘটনা ঘটে।

২৮ এপ্রিল- দেশব্যাপী ডাকা সাধারণ ধর্মঘটে থমকে যায় দ্বীপরাষ্ট্রটি। এরপর ৬ মে আবার ধর্মঘট ডাকা হলে রাজাপক্ষে আবারও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।

৯ মে- ক্ষমতাসীন দল ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের পর অবশেষে মাহিন্দা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একইদিন নিত্তামবুয়া শহরে বিক্ষোভকারীদের কবলে পড়ে বিক্ষোভকারী জনতার একজনকে গুলিতে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন এমপি অমরাকীর্তি।

মোট কথা গত প্রায় দেড়মাস ধরে শ্রীলঙ্কায় যা ঘটে চলেছে তা এখন একটা টার্নিং পয়েন্টে এসে উপনীত হয়েছে বলা যায়। এরপর সম্ভবত প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ে রাজাপাক্ষেও পদত্যাগ করবেন এবং কোনো একটি পক্ষ দেশটিতে দ্রুত সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিবে এবং সেটি সম্পন্নও হবে।

তবে নির্মম আর কড়াল সত্য হচ্ছে- সেসব ইতিবাচক পরম্পরা সংঘটিত হওয়ার পরও দেশটি সংকটের যে কর্কশ আবর্তে নিপতিত হয়েছে তার থেকে সহসাই মুক্তি মিলবে না।

যেমন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, লোভে পড়ে শ্রীলঙ্কার শাসকরা ‘চীনা ঋণের ফাঁদে’ আটকে গেছে। তবে আরও মারাত্মক হলো, প্রায় একযুগ আগে ‘সভরেন বন্ড’ ছেড়ে শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক অর্থবাজার থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার পুঁজি সংগ্রহ করেছিল যেগুলো পরিশোধের ম্যাচিউরিটি ২০২২ সাল থেকেই শুরু হতে চলেছে। কিন্তু বিরামহীন বেপরোয়া লুটপাট আর অপরিণামদর্শী অব্যবস্থাপনার ফলে এখন অবস্থা এমন যে নেংটি বাঁচানোই মুশকিল- টুপি তো অনেক পরের কথা। অর্থাৎ সুদাসলে ওই বন্ডের অর্থ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য শ্রীলঙ্কার একেবারেই নেই। অথচ পরিস্থিতি বলছে দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কোথা থেকে? এর জবাব নেই আপাতত।

এখানে কারও কারও কাছে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটি বিষয়ের অবতারণা ভিন্ন চিন্তার খোরাক দিতে পারে বলে মনে হচ্ছে। হা হলো শ্রীলঙ্কার বহুল আলোচিত গৃহযুদ্ধ। পুরো শ্রীলঙ্কা দ্বীপ জুড়ে সংঘটিত ভয়াবহ সশস্ত্র এই সংঘাত ১৯৮৩ সালের ২৩ জুলাই  শুরু হয়ে চলেছিল প্রায় সিকি শতাব্দীকাল ধরে। কলম্বো সরকারের বিরুদ্ধে বিরতিহীন এই বিদ্রোহটি ছিল লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই)সহ বেশ কয়েকটি তামিল সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপের ভয়াবহ লড়াই।

অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবহলোর অভিযোগে শ্রীলঙ্কাবাসী তামিলরা চাইছিল দ্বীপের উত্তর ও পূর্ব অংশের তামিল প্রধান এলাকা নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে। সুদীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তামিল টাইগারদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার পর শ্রীলঙ্কার সশস্ত্র বাহিনী ২০০৯ সালের মে মাসে এলটিটিই বস ভিলুপিল্লাই প্রভাকরকে হত্যার মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে সক্ষম হয়।

এরমধ্যে প্রতিবেশী বৃহৎ রাষ্ট্র ভারত কয়েকবার তামিল বিদ্রোহ দমনে বা উভয়পক্ষে মীমাংসাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চেয়ে সুবিধা এবং অসুবিধা দুই ধরনের পরিস্থিতিরি মুখেই পড়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে বড়ভাইসুলভ মোড়লগিরি করে সুনাম আর সুবিধা লাভ করতে গিয়ে ভারত তামিলদের কাছেও বিরাগভাজন হয়েছে আবার সংখ্যাগুরু লঙ্কান বৌদ্ধদের কাছেও অপছন্দনীয় হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় তামিল আত্মঘাতি বোমা হামলায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী নিহত হয়েছেন, টাইগারদের হামলায় নিহত হয়েছেন শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসাও। 

সিকি শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে দেশটির জনসংখ্যা, পরিবেশ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের ক্ষতি হয়েছে, যা প্রাথমিক হিসাব অনুসারে ৮০,০০০-১,০০,০০০ জন মানুষের জীবনহানির কারণ হয়েছে। ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কায় জাতিসংঘের সফরকারী দল অভিযোগ করে, শেষপর্যায়ে ওই গৃহযুদ্ধে একতরফা বিজয় অর্জনের সময় প্রায় ৪০ হাজার বেসামরিক তামিল জনগণকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করে শ্রীঙ্কান বাহিনী। এছাড়া এ প্রসঙ্গে অন্যান্য সংস্থার দাবি ছিল ১ লাখের বেশি তামিলকে হত্যা করা হয়েছে। মোট কথা তামিল দমনের শেষ পর্যায়ে লংকান সেনাবাহিনীর বেপরোয়া ও মাত্রাতিরিক্ত নৃশংসতা তখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।

এই ঘটনার ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতীচ্যের বেশির ভাগ দেশের কাছে অনেক বিষয়ে শ্রীলঙ্কা ‘অস্পৃশ্য’ অবস্থানে চলে যায়। গৃহযুদ্ধে বিজয় এসেছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের শাসনামলে, যিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের বড় ভাই।

এই গোতাবায় আবার সাবেক সেনাকর্মকর্তা, তিনি শ্রীলঙ্কান সশস্ত্রবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল। মোটকথা একটা সময়ে দুনিয়ার ভয়াবহতম গেরিলা দলের তকমা পাওয়া তামিলদের নৃশংতা, ভয়াবহতা, বেপরোয়া মনোভাবের কাছে জিম্মি হয়ে পড়া পুরো শ্রীলঙ্কাকে তামিল টাগারমুক্ত করতে জেনারেল ফনসেকার অধীনে শ্রীলঙ্কান বাহিনী চূড়ান্ত সফল যে অভিযান চালায় (এই অভিযানও ছিল গা শিউড়ানো নৃশংতায় পূর্ণ) তার রাজনৈতিক সুবিধা পুরোটাই বগলদাবা করে নেয় রাজাপাক্ষে পরিবার। এই সূত্রে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বৌদ্ধ মোলবাদী রাজনীতির বীজ যা উর্বর ভূমি পেয়ে সফলও হয়। 

মাঝখানে এক মেয়াদের জন্য মাহিন্দা রাজাপক্ষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাইথ্রিপালা সিরিসেনার কাছে হেরে যাওয়ায় বিরোধী দলের নেতার আসনে বসেছিলেন। কিন্তু ওই সময়ে শ্রীলঙ্কার ভোটের রাজনীতিকে মৌলবাদী চক্করে দলীয় জোরজবরদস্তির প্রতিযোগিতায় ভেল্কিবাজি করে রাজাপাক্ষে পরিবার পরবর্তী নির্বাচনে আবারও জয়লাভ করে ক্ষমতায় ফিরে আসে।

এরপর তাদের আর ঠেকায় কে? একভাই প্রেসিডেন্ট, একভাই প্রধানমন্ত্রী যিনি আগে ছিলেন প্রেসিডেন্ট, আরেকভাই কৃষিমন্ত্রী- মোট কথা পরিবারটির প্রায় দুই ডজন ব্যক্তি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে শেকড় গেঁড়ে বসে। তাদের লেজ ধরে পরের স্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলি কব্জা করে নেয় মোসাহেব আর

তপ্লিবাহকরা। একদিকে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের জোয়ারে ক্ষমতার গোড়া জনপ্রিয়তার রেশমি সুতোয় আপাত মজবুত অবস্থায় অপরদিকে একান্ত অনুগত সামরিক বাহিনী, চীনের মতো বড় শক্তি সব ধরনের সহায়তার জন্য পাশে দাঁড়ানো, আবার ভারতও চীনকে টেক্কা দিয়ে নিজ স্বার্থ রক্ষায় হরদম সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে কৌশলী ভূমিকায়- তো রাজাপাক্ষে পরিবারকে আর পায় কে। তখন তারা দেখতে পায়নি বা চায়নি দুনিয়ার অন্যান্য শক্তি বা দেশ বা সংস্থার অস্তিত্ব যেগুলোলেক কোনো ক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। প্রমাণ করা হয়তো শক্ত, তবে আমরা মনে করতে পারি যে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্যভাবে সেইসব দেশ, শক্তি বা সংস্থার সঙ্গহীনতাও শ্রীলঙ্কার আজকের এই চরমতম দুর্গতির কারণ হয়ে থাকতে পারে।

ক্ষমতার মধ্যগগনে রাজাপাক্ষে পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিজেদেরকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর ভাবা শুরু করে যেন। এর অনিবার্য পরিণতি যে কোনো বিষয়ে যা ইচ্ছা তা সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সাহসী করে তোলে তাদেরকে। হঠাৎ এককথায় কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে কৃষিক্ষেত্রে জৈবসার ব্যবহার বন্ধের ঘোষণা ও বাস্তবায়ন এর অন্যতম একটি উদাহরণ। এরফলে দেশটির কৃষি উৎপাদন এক মৌসুমে কমে যায় এক চতুর্থাংশ।

এরকম তুঘলকি কাণ্ডের ভুড়ি ভুড়ি উদাহরণ আছে। দেশকে এগিয়ে নেওয়ার অপরিণামদর্শী ‘মহান’ ওই কর্মযজ্ঞে একদার নিষ্পেষিত হয়ে নির্মূল হওয়ার দ্বারপ্রান্তে থাকা তামিলরা থেকেছে গড়হাজির, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মনপ্রাণ দিয়ে সামিল হতে পারেনি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলিও। ফল যা হবার তাই হয়েছে।   

যাহোক, শ্রীলঙ্কার বর্তমান সঙ্কটের গোড়া খুঁজতে গেলে এখানে একটি সত্য মেনে নিতে হবে। তা হলো, দেশটির সংখ্যাগুরু সিংহলিরা গৃহযুদ্ধের কারণে ভারতের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। সুযোগটা কাজে লাগান সুচতুর রাজনীতিক তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে। তিনি সংখ্যাগুরু জনগণের মনোভাব আর সমর্থন নিজের দিকে টানতে ভারতকে বাদ দিয়ে গণচীনের দিকে অনেকখানি ঝুঁকে পড়েন। একসময়ের কলজে কাঁপানো দোর্দণ্ড প্রতিপক্ষ তামিলরা সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকভাবে তখন মিসমার অবস্থায়, দেশটির অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যেমন মুসলমান, খিস্টানরাও কোনো ধর্তব্যের মতো প্রতিপক্ষ ছিল না। ছোট ভাই মাহিন্দার পরে ক্ষমতায় আসেন বড়ভাই গোতাবায়া। দীর্ঘ  দশক জুড়ে রাজাপাক্ষেদের প্রতিপক্ষ বলতে তেমন কেউ ছিল না।

ওদিকে উদীয়মান অন্যতম বিশ্বমোড়ল ও বৃহৎ প্রতিবেশী চীনও শ্রীলঙ্কার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বের বিবেচনায় দেশটিকে নিজেদের প্রভাববলয়ে টেনে নেওয়ার জন্য বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় হামবানটোটায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, কলম্বোয় সমুদ্রবন্দরের কাছে চায়নিজ সিটি নির্মাণসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে যখন হামবানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ সম্পন্ন হয়, তখন দেখা গেল অদূরদর্শিতা আর অব্যবস্থাপনার কারণে বন্দর ব্যবহারের যথেষ্ট চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

বন্দরের আয় বাড়াতে চরমভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটিকে চীনের কাছে লিজ দিতে বাধ্য হয়। একই রকম বিপদে পড়তে হচ্ছে কলম্বোর চায়নিজ সিটি ছাড়াও নবনির্মিত কয়েকটি বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পও। যথাযথ ‘প্রকল্প মূল্যায়ন’ পদ্ধতি অবলম্বনে এসব প্রকল্প গৃহীত না হওয়ায় কোনোটাই যথেষ্ট আয়বর্ধনকারী প্রকল্প হয়ে উঠবে না- এটা অনেকটাই নিশ্চিত এখন। এই বিষয়গুলোই ঠিক সময়ে নজরে আনতে পারেনি উগ্র বৌদ্ধধর্মীয় জনপ্রিয়তার শাপদের পিঠে সওয়ার রাজাক্ষেরা।

ওদিকে অনেকেই বলছে, লোভে পড়ে শ্রীলঙ্কা ‘চীনা ঋণের ফাঁদে’ আটকে গেছে। আসলে এখানে চীনের দোষ দেওয়ার চেয়ে শ্রীলঙ্কান শাসকদের অপরিণামদর্শিতাকেই দোষ নেওয়া উচিৎ বলে মনে করতে হবে। রাজাপাক্ষেদের ভ্রূক্ষেপহীন ভুলের আরও মারাত্মক নমুনা হলো, ‘সভরেন বন্ড’। এই বন্ড ছেড়ে শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক অর্থবাজার থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার পুঁজি সংগ্রহ করেছিল যেগুলোর ম্যাচিউরিটি ২০২২ সাল থেকেই শুরু হতে চলেছে। কিন্তু এখন তো সুদাসলে ওই বন্ডের অর্থ ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য শ্রীলঙ্কার নেই।

শ্রীলঙ্কার হালের অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বে চরম শিক্ষণীয় যে বিষয়টি বেড়িয়ে এসেছে তা হলো, রাজাপাক্ষে পরিবার রাজনীতিকে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের মোড়কে যেভাবে ‘পারিবারিক একনায়কত্বে’ পর্যবসিত করেছে, সেটা যে কোনো সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশকেও গভীর সংকটের তলানিতে নিয়ে দাঁড় করাতে পারে- এখানে শ্রীলঙ্কা তো তেমন সমৃদ্ধ দেশও না!

এর তাৎক্ষণিক ফল হিসেবে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি হামানটোটায় রাজাপক্ষেদের পারিবারিক বাসস্থানে উত্তেজিত জনতার অগ্নিসংযোগের ঘটনা, অগ্নিসংযোগ চলছে সরকার দলীয় অন্যসব নেতাদের বাড়িঘরেও। কিন্তু আসলে এসব অগ্নিসংযোগে যদি শ্রীলঙ্কার সমস্যার দানবটা ভষ্মিভূত হতো তবে সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচতো। কিন্তু নিজদেশের বিভীষণরা যখন বিপদ ডেকে আনে তখন গোনাগারি চরম ক্ষতির মাধ্যমেই পরিশোধ করতে হয়। আমাদের শুভকামনা একটাই- শ্রীলঙ্কার জনগণ যেন যে কোনো উপায়ে এই সঙ্কট থেকে পরিত্রাণ পায়। আর কোনো পরিবার যেন শ্রীলঙ্কা বা অন্য কোনো দেশকে এভাবে শনির আখড়ায় পরিণত না করতে পারে। এজন্য জনগণকে সতর্ক হতে হবে- দুনিয়ার সব দেশেই।

দিনবদলবিডি/আরকে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়