মঙ্গলবার

১৯ জানুয়ারি ২০২১


৫ মাঘ ১৪২৭,

০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

ন্যাড়া বেলতলায় একবার যায়- আমরা কেন পটকা বারবার খাই!

সম্পাদকীয় ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২০:২৮, ২৪ ডিসেম্বর ২০২০   আপডেট: ১৫:২৩, ২৬ ডিসেম্বর ২০২০
ন্যাড়া বেলতলায় একবার যায়- আমরা কেন পটকা বারবার খাই!

ছবি: দিনবদলবিডি

মুরুব্বিরা বলে থাকেন, একবার ঠকলে ঠকের দোষ, দ্বিতীয়বার ঠকলে তোমার দোষ! অর্থাৎ প্রথমবার কোথাও ধোঁকা বা প্রতারণার শিকার হলে সেটা সেই প্রতারক বা ধোঁকাবাজের দোষ বলে মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু যখন একই ধরনের ধোঁকায় আপনি আবারো পড়বেন, তখন সেটার দায় কিন্তু আপনার ওপরেই বর্তাবে। মানুষ তার শিক্ষার বড় অংশটাই পায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। সেই সূত্রে ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায় অর্থাৎ একই ভুল সুস্থ মানুষের পক্ষে বারবার করা স্বাভাবিক বিষয় নয়।

কথাগুলো মনে পড়লো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বিষাক্ত পটকা মাছ খেয়ে পুত্রবধূ ও শাশুড়ির মৃত্যুর খবরটি দেখে। দিনবদলবিডি.কম-এ প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গতকাল বুধবার রাতে উপজেলার উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের জয়নাল আবেদিনের স্ত্রী সাহিদা বেগম (৪০) ও তার পুত্রবধূ নুরুননাহার (২৫) বিষাক্ত পটকা মাছ খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। একই ঘটনায় নুরুন্নাহারের শিশুপুত্র নাঈম (৮) গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।  

অনেকেই হয়তো জানেন না যে পটকা মাছের শরীরে থাকা নিউরোটক্সিন (টেট্রোডোটক্সিন) নামক বিষাক্ত প্রোটিনের প্রভাবে মানুষের মৃত্যু হয়। অনেক মৎস্য গবেষকের মতে-‘পটকা মাছ’ আসলে সে অর্থে মাছ নয়। এটি একটি বিষাক্ত জলজ প্রাণি। এর শরীরে থাকা নিউরোটক্সিন মানবদেহে প্রবেশের পর খুব সহজেই নার্ভাস সিস্টেম ও হৃদপিণ্ডকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। ফলে দ্রুতই আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়। জানা মতে এর তেমন কোনো অ্যান্টিডোটও নেই। 

দেশের সব নদ-নদী এবং সমুদ্রে এই মাছ পাওয়া যায়। বিষাক্ত আর প্রাণঘাতি জেনেও দেশজুড়ে মানুষ কেন বারবার এই মাছ রান্না করে খেতে যায়- এই প্রশ্নটি অনেক পুরনো। ২০১৫ সালে সিলেটের জৈন্তায় পটকা খাওয়ার ঘটনায় বড় ট্রাজেটি ঘটেছিল- সেবার একই পরিবারের ৬ জন বিষক্রিয়ায় মারা গিয়েছিল। গবেষকদের মতে, প্রাণি হিসেবে পটকা মানুষের পক্ষে এতটাই বিষাক্ত যে একটি মাছ খেয়ে মারা যেতে পারে অন্তত ৩০ জন। 

বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ জাপানে পটকা মাছ খুবই জনপ্রিয়। তবে জাপানিরা রান্নার আগে এর থেকে বিশেষ কায়দায় বিষযুক্ত অংশগুলো আলাদা করে নেয়। তবে সে প্রযুক্তি এখনো বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। তাই এ মাছের বিষক্রিয়া থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়- কোনোমতেই এই মাছটি আর না খাওয়া। এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না পটকা মাছ না খেলে। মনে রাখা দরকার যে, অনেক সাবধানতার সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশলে পটকা রান্না করার পরেও অতি উন্নত দেশ জাপানেও কিন্তু প্রায়ই পটকা মাছ খেয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সেটাও ওই অসাবধানতার (বিষাক্ত অংশ পুরোপুরি অপসারণ না করা) কারণেই। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে পটকা মাছের ১৩টি প্রজাতি আছে যাদের দুটি মিঠা পানিতে পাওয়া যায় এবং বাকিগুলো  লোনাপানির বাসিন্দা। পটকা মাছের বিষ টেট্রোডোটক্সিন (টিটিএক্স) একটি শক্তিশালী বিষাক্ত পদার্থ যা মানুষের উত্তেজক (এক্সাইট্যাবল) সেল মেমব্রেনের সোডিয়াম চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম।

আরো পড়ুন পটকা মাছ খেয়ে বউ-শাশুড়ির মৃত্যু

পটকা নামক জলজ প্রাণিটির সবচেয়ে বিষাক্ত অংশ অবশ্য এর লিভার বা কলিজার সঙ্গে থাকে। এখানে যে বিষের থলি রয়েছে- কারও কারও মতে তা ভয়াবহ বিষ হিসেবে খ্যাত পটাশিয়াম সায়ানাইডের চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষমতাধর। তাই এই বিষ কারও শরীরে ঢুকলে বলা যায়- মৃত্যু অবধারিত।

পটকা মাছের যকৃত, ডিম্বাশয়, অন্ত্র এবং চামড়া অন্য প্রাণি বিশেষ করে মানুষের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে থাকে। তবে এর শরীরের পেশীসমূহ সাধারণত বিষমুক্ত থাকে। এছাড়া সব পটকা মাছই বিষাক্ত নয়। তবে খুব ভালোভাবে জেনে পটকা মাছ থেকে এর বিষের থলে ও যকৃত, ডিম্বাশয়, অন্ত্র এবং চামড়া আলাদা করে নিয়ে রান্না করলে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হবার কথা নয়। 

তবে আমরা মনে করি- এত ঝুঁকি নিয়ে এই খাদ্যটি গ্রহণের কোনো যুক্তি-ই নেই। এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক উদ্যোগ ও প্রচারণা চালাতে পারে। এগিয়ে আসতে পারে এলাকাভিত্তিক সামাজিক সংগঠন, ক্লাব এবং এনজিওগুলোও। 

দিনবদলবিডি/একে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়