শুক্রবার

১৪ মে ২০২১


১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮,

০১ শাওয়াল ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ
Eidul Fitor

তুমি আমি

বোরহান মাহমুদ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২৩:৪২, ২ মে ২০২১   আপডেট: ২৩:৫৪, ২ মে ২০২১
তুমি আমি

১ 

জসীম সাহেবের হাঁটার আওয়াজটা বেশ অদ্ভুত। সব মানুষের যেমন হয়, তেমনটা নয়। জসীম সাহেব যখন হাঁটেন, তখন অল্প পা ঘষে যাবার মত শব্দ হয়, আবার মাটিতে পা দাবিয়ে চলার মতোও শোনায়। সন্ধ্যার আগে আগে নাজমা বেগম এ শব্দটা শোনার অপেক্ষায় ফ্ল্যাটের মেইন গেটের পাশে দাঁড়িয়ে সময় গোনেন আর ঘড়ি দেখেন। এটা উনার নিয়মিত অভ্যাস, যেমনটা জসীম সাহেবের প্রতিদিন হাঁটতে যাওয়া। জসীম সাহেবের হার্টের অবস্থা ভাল না। ছয় মাস পর পর এপোলোতে যান, যাবতীয় টেস্টগুলো নিয়ে হার্ট সার্জনের সাথে আড্ডা মেরে আসেন। সেখানেই নানান ঔষধের সাথে নিয়মমতো হাঁটার উপদেশ দেয়া আছে। নাজমা বেগমেরও নানান সমস্যা। তার জন্যেও রুটিন বানানো আছে। তবে উনার অবশ্য সেসব রুটিনের বালাই নেই। বরং নির্দিধায় বলা যায়, এসব ব্যাপারে উনি বেশ বেখেয়ালী।  

সংসারজীবনের তেতাল্লিশ বছর হলো জসীম সাহেব আর নাজমা বেগমের এ বছর জানুয়ারিতে। অনুষ্ঠান তেমন বড়ভাবে হয়নি, উনারা তো স্রেফ দুজন মানুষ সংসারে। দিনের বেলা বাসায় ঝাড়ামোছা রান্নাবান্নার জন্য রহিমা নামে মাঝবয়েসী মেয়েটা আসে। সেও আসছে প্রায় আট বছর হলো। সন্ধ্যার আগে আগে রহিমা চলে যায়। সন্ধ্যার এ সময়টার নির্জনতা বেশ ভাল লাগে নাজমা বেগমের। জসীম সাহেব হেটে আসলে দুজন চা খেতে বসেন। এ সময়টা নাজমা বেগমের খুব নিজের সময়। সারাদিনের সংসার সামলানোর পর এই চা খাওয়াটার সময়ের জন্য অদ্ভুত মোহে নিজ হাতে চা বানিয়ে নেন তিনি। জসীম সাহেব বাসায় এসেই হাত মুখ ধুয়ে ড্রয়িং রুমে  টিভিটা ছেড়েই সোফায় বসেন। পাশের সোফায় নাজমা বেগম। সন্ধ্যায় পাশাপাশি বসে এ চা খাওয়ার অভ্যাসটা দুজনেই বানিয়ে নিয়েছেন বিয়ের পর হতেই।  

আজও দুজন বসেছেন চা খেতে। নাজমা বেগমের বানানো চায়ে জসীম সাহেবের অদ্ভুত নেশা হয়ে গেছে। বউয়ের চা ছাড়া তিনি অন্যের বানানো চা খেতেই পারেন না। জসীম সাহেব চা নিয়ে বেশ আয়েশি ভঙ্গীতে টিভি চ্যানেলে মন দিলেন। খবর দেখাচ্ছে। খবর দেখলেই ইদানীং মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সারা বিশ্বে অদ্ভুত এই রোগ এসে হাজার হাজার মানুষ মরে যাচ্ছে। জসীম সাহেবের মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। ছেলে দুটো বিদেশে। সেখানেও এই রোগ মহামারী রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন হাজারের উপর মানুষ মারা যাচ্ছে সে দেশে। এত মৃত্যুসংবাদ সে দেশে, ভাবতেই মন খারাপ হয়ে গেল জসীম সাহেবের। ছেলেরা দুজনেই অবশ্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও মেসেজিং এ দেখা হয় তাদের সাথে। তাদের ওখানেও মহামারির জন্য ব্যাবসা অফিস সব বন্ধ হয়ে গেছে। ওরাও বাড়িতেই সবসময়। দুই ছেলের বউ আর তাদের বাচ্চাদের সাথেও ভিডিও তে দেখা হয়। এটা ওটা গল্প হয়। ওরা তো সবসময় উপদেশ দিয়েই যায়। গরম পানি খেতে হবে, ভাপা নিতে হবে, ঐ ঔষধ বাসায় রেখো, মশলা দেয়া চা খেয়ো ইত্যাদি ইত্যাদি । 
 
চারপাশে সারাদিন শুধু খারাপ খবর। দেশেও অসুখটা দিনে দিনে মহামারির রূপ নিচ্ছে। এখানে ওখানে মানুষ অসুখে পড়ছে। জসীম  সাহেব ভেবেই পাননা, এ অদ্ভুত অসুখের শেষ হবে তো! চিন্তায় চিন্তায় তিনি নিজে মাঝে মাঝে অস্থির হয়ে যান। নাজমা বেগম মাঝে মাঝেই বলেন, এসব নিয়ে ভেবো না আর। এসবেও জসীম সাহেব মাথা হতে এ ভাবনাগুলো তাড়াতে পারেন না। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে নাজমা বেগমের সাথেও এ নিয়েই গল্প হয়। নাজমা বেগম বোঝানোর চেষ্টা এখন ছেড়ে দিয়েছেন। শুধু বলেন এসব চিন্তা ছেড়ে দাও। 

নাজমা বেগম ভাবেন, জসীমের এ অভ্যাসটা শুরু হতেই তিনি দেখে আসছেন। হঠাৎ নতুন ভাবনা নিয়ে নিজে নিজে অস্থির হয়ে যায়। এ অস্থিরতা নিয়েই জসীম সাহেব তিন চার মাস পার হয়ে যায়। এখন এ অসুখের ভাবনা নিয়েও ওই অবস্থাই হবে। নাজমা বেগম জসীম সাহেবের আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তিনি নিজেও যে এটি নিয়ে ভাবনায় পড়েননি,তা নয়। মাঝে মাঝে তার নিজেরও চিন্তা হচ্ছে। এই অদ্ভুত অসুখে পৃথিবী হয়ত শেষ হয়ে যাবে। টেলিভিশনে বিভিন্ন দেশের অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন দেখায়। সেগুলো দেখেও মন খারাপ হয়ে যায়। ছেলেদুটো বিদেশে পড়ে আছে। নাতি নাতনীরাও সেখানে। সবার জন্য চিন্তা হয়। চোখ ভিজে আসে। ওদের সাথে বুঝি দেখা হবেনা আর! নিজের ভাবনা গুলো জসীম সাহেবের সাথে আলাপচারীতাতেও আনেন না। পাছে উনি আরো চিন্তায় পড়ে যান!  সব বিষয়ে জসীম সাহেবের সাথে আলোচনা এড়িয়ে যান তিনি। জসীম সাহেব হঠাৎ হঠাৎ বিবিধ ইস্যুতে চিন্তায় পড়ে যান। অদ্ভুত বিচিত্র অতিমারীতে পৃথিবী বুঝি শেষ হয়েই যাবে। ভাবতে ভাবতে চোখ মোছেন নাজমা। 

বড় ছেলে বলেই যাচ্ছে। হোয়াটসএপ এ ভিডিওতে এসেছে। হাসপাতালে যাওয়া হয়নি এখনো- এ নিয়ে খুব বলল। বাসায় ভ্যাপার মেশিন এনেছে তো? সব নিয়ে বলছে। বাবা মা দুজনে যেন দুইবেলা ভাপ নেয়। প্রেশার মেশিন ভাল আছে তো? অন্যান্য এইড মেশিনগুলো আছে তো? জসীম সাহেব হুঁ হ্যাঁ বলে যাচ্ছেন। তার ভাল লাগছে না। নাজমা বেগম বিছানায় শুয়ে আছেন। জ্বর, গা ব্যাথা।
 
বড় ছেলে হাল ছেড়ে দিয়ে অফ হয়ে যেতেই ছোট ছেলে হাজির। তারও জিজ্ঞাস্য সব হুবহু। জসীম সাহেব এবারও ঐ হুঁ হাঁ বললেন, শুধু। 

 ফোনটা রেখে দিয়ে তিনি উঠে এলেন নাজমা বেগমের বিছানার পাশে। চেয়ারটা টেনে এনে বসলেন তার পাশে। 

নাজমা বেগম চিঁ চিঁ করে বললেন, আজ দুপুরে রান্না হলোনা যে! আমার জ্বর শুনে আজ মেইড সারভেন্টটাওতো এলোনা।

জসীম সাহেব নাজমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, সে নিয়ে তুমি ভেবো না। আমি আনিয়ে নেব। ফুড পান্ডা হতে এনে ফেলব। দাঁড়াও ফোনটা নিয়ে আসি। এই বলে তিনি উঠে গিয়ে ফোনটা এনে আবার বসলেন চেয়ারটায়। বসেই বললেন- 

বলো, তোমার পছন্দের মেন্যু। সব এসে যাবে। 

নাজমা বেগম ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে দেখলেন, এই মানুষটাই তার স্বামী! সেই বহু বছর আগে, সংসার শুরু হতে আজ পর্যন্ত মানুষটা এমনই রয়ে গেল। মানুষ প্রেম ভালবাসার গল্প বলে। সংসারের চেয়ে বড় প্রেম, বড় ভালবাসা আর হতে পারে না। 

জসীম সাহেব আয়নার মতো জানেন, তার স্ত্রী এখন যা ভাবছে, তা তিনি বুঝতে পারেন। তিনি আবার বললেন- বলো, তোমার পছন্দের মেন্যু বলো। আমি খাবার অর্ডার দেব এখন। 

নাজমা বেগম শুধু বললেন, তোমার যা ইচ্ছা। 

জসীম সাহেব গভীর মনোযোগ দিয়ে মোবাইলে খাবারের অর্ডার দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। 

 সন্ধ্যার আগে আগে জসীম সাহেব আবার ব্যাস্ত হয়ে পড়লেন। চারটা হাসপাতালে ফোন দিলেন। ভর্তির জন্য খালী নেই চারটাতেই। ছোটবেলার বন্ধু সেলিমের আত্মীয়ের নাম্বার নিয়ে সেখানে ফোন দিলেন। ল্যাব এইডে দুই তিনজন তার পরিচিত আছে। তারাও জানালো, সেখানে ভর্তির সুযোগ নেই এখন। 

নাজমা বেগম বিছানা হতে উঠতেই পারছেন না। দুর্বল লাগছে তাঁর। তার নিজেরও ভাল লাগছে না। সারা গায়ে ব্যাথা, জ্বর এসেছে। নিচের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী মোহাম্মদপুর হতে সিলিন্ডার আনিয়ে দিলেন। বললেন যেন বাসায় রেখে দেয়া হয়। প্রয়োজন হতে পারে। এও বলে গেলেন যে, তিনি মাঝে মাঝে খবর নেবেন। তাড়া যেন টেনশনে না পড়েন। সমস্যা হলেই ফোনে দিতে যেন না ভুলেন।  জসীম সাহেব ভাবছেন, সিলিন্ডারের প্রয়োজন হবেনা বোধহয়। তারা দুজনেই সেরে উঠবেন। 

সিলিন্ডারটা বাসায় আনার পর সেটার গায়ের লেখা পড়তেই ছোটবেলার লেখাপড়ার দিনগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। তখন তারা সব বাংলায় পড়তেন। এখন সবাই ইংরেজিতে বলে এসব শব্দ। অথচ তাদের সময়ের বাংলা শব্দগুলো এত যে মধুর ছিল! অম্লযান, অঙ্গার দি অম্লজ, উদযান এসব। আহা, হারিয়ে গেছে দিন, চলে গেছে সময়।     

নাজমা বেগমের শরীরটা দ্রুতই খারাপ হচ্ছে। তিনিও যেন আর পারছেন না। ভাল লাগছে না। চা বানিয়ে আনলেন নিজেই। চায়ে আদা দিয়েছেন। নাজমা বেগমের মুখে চামচ দিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে খাইয়ে দিলেন। নাজমা বেগম তখন শুধু বললেন,

 আমাদের জীবনটা এভাবেই যাবে- আল্লাহ বোধহয় এভাবেই লিখে রেখেছেন, তাই না?

জসীম সাহেব ঠোঁট চেপে হাসির ভঙ্গী করে বললেন, আমাদের তো এভাবেই লেখা ছিল হয়ত। ছেলেরা দুজনেই  দেশের বাইরে। মন চাইলে আসতে পারবেনা। জীবনের শুরু ছিল আমাদের দুজনের। এখন বহু বছর বাদে দেখো, ঐ আমরা দুজনেই শুধু। আমাদের জীবন শুধু তুমি আমি জীবন। তুমি আমি। তুমি আমিই আমাদের পৃথিবী।

নাজমা বেগম নিশ্চুপ শুনলেন। তার দুচোখ বেয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। জসীম সাহেব চুপচাপ তার চোখ দুটো মুছে দিলেন। 

৩ 

আজ পাঁচদিন হয়ে গেল। শহরের যত হাসপাতাল ছিল প্রায় সবগুলোতেই ফোন দিয়েছেন জসীম সাহেব। তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন, এই অদ্ভুত শহরে তিনি এতদিন রইলেন, যেখানে অসুস্থতায় ভর্তি হবার সুযোগ পেলেন না। টেলিভিশন খুললেই শুধু এতজন অসুস্থ  আর এতজনের মৃত্যুর খবর। ফোন দিয়ে বলাতে নতুন হেলথ সার্ভিস টাইপের প্রতিষ্ঠান হতে দুজন এসে তাদের টেস্টের জন্য স্যাম্পল নিয়ে গিয়েছিল। পরদিন তারা এসে রিপোর্ট দিয়ে গেছে। রিপোর্ট দেখেই তার মন খারাপ হয়ে গেছে। মহামারি তাদের দুজনের শরীরেও বাসা বেঁধেছে। নাজমা বেগম সেটা জেনে শুধু হাসলেন। আর বললেন,  আমি জানতাম, যদি আমাদের অসুখ হয়ও, সেখানেও তুমি আমি। এটাই তো ভবিতব্য ছিল আমাদের। ডায়াগনোসিস রিপোর্ট এসেছে সেও আজ চারদিন হলো। 

এর মধ্যে দুজনেই বেশ দুর্বল আর নিস্তেজ হয়ে পড়ছেন। নাজমা বেগমের শ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে আজ দুপুর হতে। ঐ সিলিন্ডারটাই ভরসা। জসীম সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছেন না। জ্বর, গায়ে ব্যথা সাথে ডায়রিয়া। নাজমা বেগমেরও জ্বর আর মাঝে মাঝে তার ফুসফুস দুটো আর পারছে না। ছেলেরা বারবার ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিতে চাইছে। তিনি শুধু লিখে দিয়েছেন, ভাল আছি। ভিডিওতে বসতেও মন চাইছে না। ভাল্লাগছে না। 

নাজমা বেগম বিছানায় প্রায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছেন। তার পাশেই বসে আছেন তিনি। জীবনটা অদ্ভুত রঙ্গমঞ্চে নিয়ে এসেছে তাদের। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছে, হয়ত দুজনেই সেরে উঠবেন। নিচতলার বাসিন্দা কিছু ঔষধ দিয়ে গেছেন। সেগুলো খাচ্ছিলেন দুজনেই। ভাল হবার নিশানাই নাই। নাজমার মুখ হা হয়ে আছে দেখে মনে হলো মুখ খুলে শ্বাস নিতে চাইছে। তিনি তাড়াতাড়ি সিলিন্ডারটার পাইপ এনে মুখে লাগিয়ে দিলেন। নাজমা বেগম যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন এমন ভঙ্গীতে শ্বাস নিচ্ছেন। বিছানার পাশের চেয়ারটায় বসে আছেন তিনি। চোখের পাতা না ফেলেই বোধহয় তিনি চেয়ে রইলেন। নাজমা বেগমের শরীরটা খুব দ্রুত খারাপ হয়ে গেল। ওর শরীরটা এত তাড়াতাড়ি খারাপ হবে ভাবেননি তিনি। মনখারাপ নিয়েই পাশে বসে রইলেন। 

এখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আজ রাতটা যদি ভালভাবে পার হয়ে যায়, ভাবছেন তিনি। অবশ্য তিনি নিজেও জানেন না, এই রাত পার হলে তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবেন এমনটা আশা করছেনও না তিনি। রাতে খাওয়া হবে না নাজমার। তারও হবে না। নাজমা বেঘোরে ঘুমুচ্ছে না চুপ হয়ে আছে দুর্বলতার জন্য, বুঝতে পারছেন না। নাজমা নাজমা বলে তার গা ছুঁয়ে দিলেন। 

নাজমা বেগম যেন গভীর ঘুমের মধ্যেই উঁ বললেন। 

তার মধ্যে আশ্চর্য ধরণের অচেনা নির্ভার অনুভূতি এসে হাজির হলো। নাহ, নাজমা ভালো আছে। মাঝে মাঝে বুঝতে পারছেন শুধু বেঁচে আছে- এটাই পৃথিবী। অসীম অসহায়ত্বে মানুষ ছোট ছোট প্রাপ্তিতেও নির্ভার হয়ে যায়। জসিম সাহেবের এখন ঐ অবস্থা চলছে।  

 তার নিজের খারাপ লাগছে। ওয়াশরুমে যেতে হবে। চেয়ারের হাতল ধরে দাঁড়াতে চাইলেন। এটাও এখন অসম্ভব লাগল। শরীরের মোটেই জোর পাচ্ছেন না। এত দূর্বল হলেন, টেরই পাননি। ভালমতো দাঁড়াতেও পারছেন না তিনি নিজে নিজে। নিজের পাজামাটাই হঠাৎ নোংরা হয়ে গেল। নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গেছে। অসহায় বৃদ্ধ মানুষটা নিজের সাথে হতভম্ব এবং লজ্জিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। 

৪ 

পরদিন দুপুর বেলা। পা চলছে না জসীম সাহেবের। পা টেনে টেনে এগোলেন পাশের রুমে। পাশের রুমে বিছানায় নাজমা শুয়ে আছে। ওর নিঃশ্বাসের হাঁসফাঁস আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। জসীম সাহেব বুঝে ফেলেছেন, নাজমার ফুসফুস আর মানতে চাইছে না। তার নিজের সাথেও  নিজের ফুসফুসের জোরাজুরি হচ্ছে। নিজে হাঁটতেও পারছেন না। আস্তে আস্তে পাশের রুমে গিয়ে নাজমার বিছানার পাশে বসলেন। নাজমা নিঃশ্বাস নেবার চেষ্টায় খাবি খাচ্ছে। আস্তে আস্তে নাজমার বিছানার পাশটায় রাখা সিলিন্ডারের পাইপটা এগিয়ে এনে নাজমার মুখে পরিয়ে দিলেন। জসীম সাহেবের মনে হলো,নাজমার বুঝি ভাল লাগছে পাইপটা মুখে পেতেই। 

নাজমার মাথার পাশে বসে ওর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলাতে লাগলেন জসীম সাহেব। বসে বসে মনে হলো তিনি নিজে খাবি খাচ্ছেন। সেটা নাজমার চোখ এড়ালোনা। নাজমা নিজের মুখ হতে পাইপটা খুলে এগিয়ে দিলেন। ম্লান হাসি নিয়ে তিনি ব্যাপারটা দেখলেন। তিনি মাথা নাড়ালেন দুর্বলভাবে। মানে বলতে চাইলেন, যে তিনি সেটা মুখে লাগাবেন না। তিনি তার দুর্বল হাতে পাইপটা আবার নাজমার মুখে বসিয়ে দিলেন। নাজমা জসীম সাহেবের চোখে চোখ রেখে শুয়ে আছে। নাজমার দুচোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। 

জসীম সাহেবের বয়েস এখন বাহাত্তর চলছে আর নাজমার পঁয়ষট্টি। জীবনের সফলতার সব গল্প তাদের আছে। সন্তান গৌরবে দিন পনের আগেও তাদের গর্ব ছিল। অথচ আজ সেসব তাদের মাথায় নেই, মাথা হতে সব মুছে গেছে। দুই ছেলে বিদেশে। মহামারীতে তারা সেখান হতে আসতে পারছেনা, আর এ শহরেও সব বন্ধ এখন। 

 সব হাসপাতাল এখন ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মানুষ বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ’র সামনে বসে বসে চোখের জল ফেলছে। আইসিইউ-গুলো হতে যেই বের হচ্ছে, তাদের বলছে- ভাই, আর মারা যায় নাই এখনো আর? বেড লাগবে আমার ভাইয়ের বা বোনের বা বাবার বা মায়ের জন্য। 

 শহরের ঘরে ঘরে হাহুতাশ আর আহাজারি। স্রস্টার নাম ধরে ধরে মাঝে মাঝে তীব্র আওয়াজ শোনা যায় রাত গভীর হলেই। রাতের নির্জনতা খান খান হয়ে যায় সে আওয়াজে।  

-আল্লাহ, ও আল্লাহ , আমাদের বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও। আমাদের রহমত দাও, ওহ আল্লাহ। 

জসীম সাহেব আর পারছেন না। নিজের অজান্তে তার ডান হাত নাজমার মুখের উপর চলে গেল। সিলিন্ডার হতে তার অল্প শ্বাস লাগবে। ফুসফুসগুলো আর মানতে চাইছে না। নাজমার মুখে তার হাতের স্পর্শেই নাজমা চোখ মেলে চাইলো। আর পারছেন না জসীম সাহেব। 

 আস্তে আস্তে তিনি শুয়ে পড়লেন নাজমার পাশে। দুজনের মাথা দুটো পরসস্পরের স্পর্শ ঐ বালিশেই। নাজমার মুখ হতে পাইপের মাথাটা নিয়ে নিজের মুখে লাগালেন। দুটো শ্বাস নিতেই মনে হলো, আহা, বেঁচে যাওয়ার এত আনন্দ! পরম শান্তির বোধে নাজমার মুখে চোখ পড়তেই সাথে সাথে পাইপটা নিজের মুখ হতে সরিয়ে নাজমার মুখে পরিয়ে দিলেন। 

 নাজমা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। পাইপটা নাজমার মুখে লাগিয়ে তিনি নিজের মুখটা কাছে এনে নাজমার গাল ছুঁয়ে শুয়ে রইলেন, যেন ঐ পাইপের মুখটা হতে ছিটেফোঁটাও তার শ্বাসে আসে। 

 এভাবে দুজন দুজনের স্পর্শে শুয়ে রইলেন। হয়ত আনমনা হয়ে গিয়েছিলেন জসীম সাহেব। মাথা তুলেই তার মনে হলো নাজমার খুব হাঁসফাঁস ভাব হচ্ছে। তিনি নাজমার মাথাটা ধরে নাড়াতে চাইলেন। নিজের শরীরে জোরই পাচ্ছেন না। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলতে চাইলেন- তোমার খারাপ লাগছে, প্রাণ? বলেই বুঝলেন, তিনি মনে মনে বলেছেন। তার গলা দিয়ে আওয়াজই বের হয়নি। নাজমার মাথাটা স্রেফ ধরেই আছেন। নাজমার মুখটা হা হয়ে গেল, চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। সিলিন্ডারের মিটারে চোখ রেখে বুঝলেন, আর নাই, খালী হয়ে গেছে। তবু নাড়িয়ে দেখা যেতে পারে। এই ভেবে আস্তে আস্তে বিছানার উপর উঠে বসলেন জসীম সাহেব। শরীরে জোর পাচ্ছেন না। খাট হতে দু পা নামিয়ে ডান পা দিয়ে সিলিন্ডারে লাথি মারতে চাইলেন। সেটা লাথি হলোনা, স্পর্শের মতো হলো। পৃথিবীর সমস্ত আশা ভরসার মুখে সেই স্পর্শটাই লাথির মত হয়ে গেল। সিলিন্ডারটা ঐ অল্প স্পর্শেই ধড়াম শব্দে মাটিতে পড়ে গেল। সাথে সাথে তিনি নাজমা, নাজমা বলে বলতে চাইলেন। নাজমার মুখটা হা হয়ে আছে, স্থির, চোখদুটো বড় হয়ে স্থির হয়ে আছে। 

 নাজমা, নাজমা, নাজমা বলতে লাগলেন জসীম সাহেব। তার ফুসফুস দুটো যেন যুদ্ধে নেমেছে। শরীরের সমস্ত সামর্থ  দিয়ে নিজের ফুসফুসদের বাগে আনতে চাইলেন। পাঁজরের পেছনে অন্তিম লড়াই তখন। নাজমার মুখখানা বা  চোখদুটোর স্পর্শ লাগবে তার। ফুসফুসদুটো আর মানতে চাইছেনা। পৃথিবীর বাতাসে আর তাদের বিশ্বাস রইল না হয়ত। বাম হাতটা বাড়িয়েই রেখেছেন নাজমার চোখদুটো বা মুখটা স্পর্শের আশায়। তিনি বুঝে ফেলেছেন, তিনি এই বিশাল দূরত্ব পেরোতে পারবেন না। সব যেন আঁধার লাগছে? তার মনে হলো তিনি পড়ে যাচ্ছেন। মৃদু হাসির রেশ লাগলো যেন তার ঠোঁটের পাশটায়।  তার শরীর হেলে যাচ্ছে নাজমার পেট বরাবর। বিড়বিড় স্বরে বলতে লাগলেন 

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ... 

হেলে পড়লেন জসীম সাহেব। গভীর ঘুমে হারিয়ে যাবার আগমূহুর্তে তার মনে হলো, দরজায় ধুম ধাম আওয়াজ হচ্ছে। বেলটা বেজেই চলেছে। অসীম ভরসায় তিনি যেন জেগে উঠতে চাইছেন। পারলেন না। শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে নাজমার গায়ে আঁচড় দিয়ে দিলেন দুবার, আবার দিলেন। আবার দিলেন। তার মনে হলো নাজমা যেন নড়ে উঠল। বহু দূরে মানুষের গলা শুনতে পেলেন তিনি। 

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, এইতো দুজনেই। ফোনে বলে যাচ্ছে মনে হলো। জ্বী স্যার দুজনেই। এখানেই আছেন। পেয়েছি উনাদের। এই পোর্টেবল সিলিন্ডারগুলো লাগিয়ে দাও দুজনের মুখেই। 

তীব্র আলোর রেখার মতো দুরে দেখছিলেন জসীম সাহেব। সে আলোটা হঠাৎ হারিয়ে গেল। তাকে নাড়িয়ে দিলো ওরা। মুখে স্পর্শটা টের পেলেন তিনি। 

-হ্যাঁ, উনার মুখেও দাও। 

অসীম অতলের ভেতরেও তিনি টের পেলেন, নাজমার শরীরটা যেন আবার নড়ে উঠল। আহা, এ পৃথিবী মানেই শুধু তুমি আমি। প্রেম ভালবাসা সব এই সংসারেরই নাম, যার অন্য নাম, তুমি আমি। 
 

(গল্পকার এই গল্পটি বিশেষ একটি শৈলীতে রচনা করেছেন যার নাম লিপোগ্রাম। বর্ণমালার কোনও একটি বা কয়েকটি বিশেষ বর্ণকে বাদ দিয়ে রচিত পাঠ্যকে লিপোগ্রাম বলা হয়। লিপোগ্রাম গ্রিক শব্দ lipagrammatos থেকে এসেছে, যার অর্থ missing letter । বাংলা পরিষদ পর্যাভিধান অনুসারে লিপোগ্রামের বাংলা পরিভাষা হলো বর্ণবিরান। ইংরেজিতে আর্নেস্ট ভিনসেন্ট রাইট-এর গ্যাডসবি উপন্যাসটি লিপোগ্রামের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।আমেরিকান এই লেখক ইংরেজি বর্ণমালার E অক্ষর বাদ দিয়ে তার ২৬৭ পাতার (৫০০০০ এর বেশি শব্দ) উপন্যাস Gadsby লিখেছিলেন ১৯৩৭ সালে।

তুমি আমি গল্পে লেখক বোরহান মাহমুদ ‘ক’ বর্ণ বাদ দিয়ে লিখেছেন।)

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়