মঙ্গলবার

২৬ অক্টোবর ২০২১


১১ কার্তিক ১৪২৮,

১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

বইচুরি

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ০১:৪৩, ১৪ অক্টোবর ২০২১  
বইচুরি

ছবি: ইন্টারনেট

"রুটি - মদ ফুরিয়ে যাবে,
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,
কিন্তু বইখানা অনন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।"- ওমর খৈয়াম 
বই সম্পর্কে পারস্যের কবি ওমর খৈয়ামের উপরের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন এডওয়ার্ড ফিট্জেরাল্ড। ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়ে বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক মাহবুবুল আলম স্যারের কাছ থেকে প্রথম শুনেছিলাম। স্যার নিজেও কবি। এখনও কবিতা লেখেন। কবিতার বই প্রকাশ করেন। ক্লাসে পড়ানোর সময়ে উদ্ধৃতি হিসেবে খুব রোম্যান্টিক কিছু কবিতার লাইন আমাদেরকে নিয়মিত শোনাতেন। যেমন, কবি জন ডান (John Donne) এর কবিতা থেকে বলতেন,
"For God's sake hold your tongue, and let me love." ( দোহাই তোদের একটু চুপ কর, ভালোবাসিবারে দে আমায় অবসর।) 
তার মুখে শোনা ওমর খৈয়ামের কবিতার এডওয়ার্ড ফিট্জেরাল্ড কর্তৃক  অনুবাদ করা কবিতাটির ইংরেজী অনুবাদ ছিল নিম্নরূপ-
“Here with a Loaf of Bread beneath the Bough,
A Flask of Wine, a Book of Verse -and Thou
Beside me singing in the Wilderness –
And Wilderness is Paradise e now.” 
আমাদের মুখে মুখে তখন কবিতার চরণগুলো ঘুরত। যদিও প্রেম, ভালবাসা, এমনকি বই সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান ছিল খুবই সীমিত। কান্তি চন্দ্র ঘোষের নীচের অনুবাদটাও আমাদের পছন্দের ছিল- 
“সেই নিরালা পাতায় ঘেরা
বনের ধারে শীতল ছায়
খাদ্য কিছু, পেয়ালা হাতে
ছন্দ গেঁথে দিনটা যায়!
মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে
গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর –
সেইতো সখি স্বপ্ন আমার,
সেই বনানী স্বর্গপুর!” 
কবিতাটি মূলত ওমর খৈয়াম কর্তৃক বেহেশত অথবা স্বর্গের বর্ণনা। কবি বেহেশতের সরঞ্জামাদির মনোজ্ঞ বর্ণনা দিতে গিয়ে বই বা কিতাবের অন্তর্ভুক্তি করতে ভুলেননি।
লেখার শুরুতে দেওয়া কবিতার উদ্ধৃতি আমি প্রথম পড়ি সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ নামক প্রবন্ধে। বর্তমানের মতো সৈয়দ মুজতবা আলী’র যুগেও বই কেনা ও পড়ার ব্যাপারে বাঙালিদের অনাগ্রহের কমতি ছিল না। তিনি তাঁর এই প্রবন্ধে আঙুল দিয়ে বইকেনা বিষয়ে আমাদের অনাগ্রহগুলো দেখিয়েছেন। এর সমান্তরালে আঁদ্রে জিদ, ফ্রান্সিস বেকন, জর্জ বার্নার্ড শ এবং আরও বিখ্যাত মনীষীদের বরাত দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন বইয়ের নানা উপকারের কথা। লিখেছেন, “বই কিনে কেউ কখনো দেউলিয়া হয় না”। 

মবিডিক চিত্র: ডেভিয়ান্ট আর্ট

প্রত্যেকেরই শৈশব, কৈশোর বা যৌবনে চুরির ইতিহাস থাকে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে হরিহরের স্ত্রী সর্বজয়া দুই সন্তান দুর্গা ও অপু এবং হরিহরের দূর সম্পর্কের বিধবা পিসি ইন্দির ঠাকরুণের দেখাশোনা করেন। দরিদ্রের সংসার বলে নিজের সংসারে বৃদ্ধা ন্যুব্জদেহ ইন্দির ঠাকরুণের ভাগ বসানোটা ভাল চোখে দেখেন না সর্বজয়া। দুর্গা তার ধনী প্রতিবেশীর বাগান থেকে ফলমূল চুরি করে আনে ও ইন্দির ঠাকরুণের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খায়। একদিন, সেই প্রতিবেশীর স্ত্রী এসে দুর্গাকে একটি পুঁতির মালা চুরির দায়ে অভিযুক্ত করেন ও এই চুরির প্রবণতাকে উৎসাহ দেওয়ার অপরাধে সর্বজয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেন। দুর্গা যথারীতি সেই অভিযোগকে অস্বীকার করে। দুর্গার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার কাশী যাওয়ার সময়ে গোছগাছ করতে গিয়ে দুর্গার একান্ত সংগ্রহের ঝাঁপিতে চুরি করা মালাটিকে আবিষ্কার করে অপু। দুর্গার লজ্জাকে ঢাকার জন্যে অপু মালাটিকে ছুড়ে ফেলে পুকুরের কচুরিপানার ভেতরে। বিস্মৃতির অতলে ডুবে যায় দুর্গা ও তার মালা।

‘পথের পাঁচালী’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, জুল্ভার্নের ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ’, চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট  এক্সপেকটেশনস’, ‘এ টেল অফ টু সিটিস’, টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ বা ‘রিজারেকশন’, দস্তয়েভস্কির ‘ইডিয়ট’– এগুলো আমি প্রথমে  বই হিসেবে পড়েছি। পরে এগুলোর ওপরে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো দেখেছি। একই গল্প বা উপন্যাসের শাব্দিক ও ভিসুয়াল ইমপ্যাক্ট ভিন্নভাবে বোঝার জন্যে। আমার কাছে বই ও চলচ্চিত্র এই দুটো মাধ্যমের মধ্যে বইকেই শ্রেষ্ঠতর মনে হয়।  

এবার আমার বই চুরির গল্প বলি। ১৯৮৩ সাল। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার অব্যবহিত আগের সময়। পড়াশুনার শেষ প্রস্তুতি চলছে। এই সময়ে একদিন রাতে টিভিতে হারম্যান মেল্ভিলের ‘মবিডিক’ দেখানো হলো। কোনো এক শনিবারে। দিনে অথবা রাতে। স্পষ্ট মনে নেই। মনে আছে ডিউক, সাহেল ও আমি তিনজনে মিলে ছবিটা দেখেছিলাম। হাউজের চিত্তবিনোদন কক্ষে। অসাধারণ ছবি। কিন্তু শুধু মুভি দেখে মন ভরল না। পরীক্ষার শেষ দিনে আমি কলেজ লাইব্রেরিতে চলে গেলাম। বইটা খুঁজে বের করলাম। ১৮৫১ সনে প্রকাশিত। শতাব্দী পুরনো। শেষের দিকে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে গেছে। তবুও বইতে লেখা প্রথম শব্দাবলী "Call Me Ishmael." আমার মধ্যে সম্মোহনের সৃষ্টি করল। মনে হলো, উপন্যাসের শুরু হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বাক্য এইটি। A Tale of Two Cities এর “It was the best of times, it was the worst of time” এর মতো। বইটিকে নিজের করে পাওয়ার প্রবল বাসনা চেপে বসল আমার ভেতরে। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষে সবাই চিরদিনের মতো ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যাব। আর কখনই ফিরে আসা হবে না। বইটি বাইরের দোকানে পাওয়া যাবে কিনা সে সম্পর্কেও আমি নিশ্চিত নই।  সুতরাং শৈশব ও কৈশোরের সমস্ত পবিত্রতা বিসর্জন দিয়ে জানালা দিয়ে সবার অলক্ষ্যে বইটিকে লাইব্রেরির বাইরে ফেলে দিলাম।  

তবে চুরির পরবর্তী অবস্থা আমার জন্যে সুখকর হয়নি। হাউজে ফিরে যাবার পর রাতে সাহেল আর ডিউককে বইটা দেখালাম। দুজনেই মনে মনে খুশি। কিন্তু তারা দুজনেই বইটা আমার আগে বা পরে পড়বে বলে দাবি করে বসলো। আমি দিতে না চাইলে কলেজ কর্তৃপক্ষেকে চুরির কথা জানিয়ে দেওয়ার হুমকি দিলো। সুতরাং সিদ্ধান্ত হলো ডিউক কলেজ থেকে চলে যাবার আগেই বইটা পড়ে শেষ করবে। সেই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত পড়তে ও অনুধাবন করতে সক্ষম। সে পড়ার পর বইটা নিয়ে বাড়িতে যাবো আমি। আমার পড়া শেষ হলে ডাকযোগে সাহেলের কাছে পাঠাব। 

সাহেলকে আমি বইটা পড়তে দেইনি। কলেজ থেকে চলে যাবার পর আসলে তার সাথে আমার যোগাযোগই ছিল না। দুজনেই বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। সেখানে প্রশিক্ষণ ও শারীরিক শাস্তির কারণে সে বইটির কথা ভুলে গিয়েছিল। সুতরাং বইটা আমার কাছেই ছিল। অনেক বছর। আমি অনেকবার পড়ার চেষ্টা করেছি।  খুব কঠিন ভাষা। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের মতো। এতে  ‘সিটোলজি’ নামে একটা বিশাল  অধ্যায় আছে। বিভিন্ন ধরনের তিমি মাছের ভ্রূণ, প্রকার, বাইবেলে তিমি মাছের বর্ণনা ইত্যাদিতে ভরপুর। এটি পড়ে  শেষ করার আগেই আমি  ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অবশেষে ১৯৯৩ সনে বইটা আমার কাছ থেকে হারিয়ে যায়। 

উল্লেখ্য, উপন্যাসটি ছিল সম্পূর্ণ পুরুষালী ধাঁচের। এখানে কোনো নারী চরিত্র ছিল না। শুনেছি উপন্যাসটি মেল্ভিলের জীবদ্দশায় তার জন্যেও হয়রানীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাঠকরা নারীর ভালবাসাহীন এই উপন্যাসকে মূল্যায়ন করেনি। ফলে মেল্ভিলকে উপন্যাস লেখা বাদ দিয়ে কবিতা লেখায় মনোনিবেশ করতে হয়েছিলো। অথচ মেল্ভিল নিজেও জানতেন যে, তার লেখাগুলোর ভেতরে সর্বশ্রেষ্ঠ লেখা এটাই। শুধুমাত্র গত শতাব্দীর শেষের দিকেই স্বীকৃত হয় যে, ‘মবি ডিক’ শুধুমাত্র হারম্যান মেল্ভিলের নয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি। এটা রোমান্টিসিজম ও আমেরিকান রেনেসাঁর প্রতীক।

উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে মবি ডিক নামক বিশাল এক তিমি মাছকে  নিয়ে। লেখক ইসমায়েল নামের এক যুবক  নাবিক হিসেবে প্রথম পুরুষে বর্ণনা করেছেন তার সমুদ্র ভ্রমণ ও তিমি শিকারের কাহিনী। প্রধান চরিত্র ক্যাপ্টেন আহাব নামের জাহাজের নাবিক। সে মবি ডিক নামের প্রকাণ্ডদেহী এক সাদা তিমি শিকারের নেশায় ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রে। এই তিমির কাছে কয়েক বছর আগে তার একটি পা হারিয়েছে। সমুদ্রের জলরাশি তন্ন তন্ন করে সে খুঁজে বেড়ায় তিমিটিকে। প্রতিশোধ নেবার জন্যে। তার একগুঁয়েমিপনা নিজের ও জাহাজের অন্যান্যদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। বেঁচে থাকে শুধু ইসমায়েল। অন্যদেরকে কাহিনী শোনানোর জন্যে। 

২০০২ সনে সিয়েরালিওনে জাতিসংঘ মিশন করার সময়ে ছুটির যাত্রাবিরতিতে লন্ডনের এইচএমভি’র শোরুম থেকে পুনরায় বইটা কিনি। এখনো আছে আমার কাছে। অবোধ্য কোনো কারণে বইটির প্রতি আমার আসক্তি মবি ডিকের প্রতি ক্যাপ্টেন আহাবের আসক্তির মতো। 

(লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে) 

দিনবদলবিডি/এমআর

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়