বুধবার

২৬ জানুয়ারি ২০২২


১৩ মাঘ ১৪২৮,

২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

যাদুকরের জন্মানন্দের দিনে

মোস্তফা মামুন || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:৩১, ১৩ নভেম্বর ২০২১  
যাদুকরের জন্মানন্দের দিনে

হুমায়ূন আহমেদ

সালটা ঠিক মনে নেই। ২০০৪-০৫ হবে হয়তো। হুমায়ূন আহমেদ মেলায় এসেছেন। সেই সময় হুমায়ূনের আসা মানে ভীড়-লাইন-ধাক্কাধাক্কি অবধারিত। অন্য প্রকাশের সামনে লাইন আঁকাবাঁকা হচ্ছে। বই হাতে অটোগ্রাফের নেশায় মরিয়াদের মরণ লড়াই দেখছি উল্টোদিকের স্টলে বসে। সেখানে আরও কয়েকজন লেখক উপস্থিত। 

লেখকদের সবাই বিনয়ী হবেন এমন কোনো কথা নেই। দুর্বিনীত ধরণের একজন ক্ষেপে গেলেন, ‘এসব হচ্ছেটা কী? অদ্ভুত ব্যাপার। পুলিশ কী করছে?’
‘সমস্যা কী?’ আরেকজন জানতে চান। 
‘এরকম হলে আমাদের বই বিক্রি হবে কী করে? আমার পাঠকরা তো আসতেই পারবে না।’
ওখানে বসেছিলেন বই বিক্রিতে হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দবী ইমদাদুল হক মিলন। সবার কৌতূহল তিনি কী প্রতিক্রিয়া দেখান! তীব্রই তো হওয়ার কথা। 
মিলন ভাই হেসে বললেন, ‘আমার কিন্তু ভালোই লাগছে।’
ভালো লাগছে! কেন?
মিলন ভাই ব্যাখ্যা করলেন, ‘একজন লেখককে নিয়ে এই উত্তেজনা আমাদের সব লেখকের জন্যই আনন্দের।’
বই বিক্রি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়া লেখক আনন্দ পেলেন না। মুখ ভার করে সরে গিয়ে স্টলের কর্মীদের ধমকাতে থাকলেন।

ওদিকে ভীড় তখন মাত্রা ছাড়াচ্ছে। হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে পুলিশকে। বাঁশি বাজছে। দুএকটা লাঠিও উঠল। কয়েকজন উল্টে পড়ে ‘আমাকে চেনেন..’ ‘হলের ছেলে আমরা..’ জাতীয় হুংকার দিয়ে চলছে। 

এরকম দৃশ্য এমন হরহামেশার চিত্র যে বাড়তি কোনো মনযোগ তৈরি করে না। কিন্তু সেই বিকালে হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, এই ছবিটা যদি অন্য দেশের পত্রিকায় ছাপা হয়! বই কেনার জন্য মার খাচ্ছে মানুষ! তাহলে ক্যাপশনে নিশ্চিতভাবে লেখা হবে, ‘কী পড়ুয়া জাতি। বই কেনার জন্য জান কোরবানে তৈরি...’
বিষয়টার মধ্যে বিস্ময়কর বৈপরীত্য। এমনিতে আমরা বইবিমুখ, পাঠাভ্যাসবিরোধী। সেই উদাসীন জাতির ছবিই বদলে দিচ্ছে তাঁর কলমের যাদু। যাদুকর! যাদুকর! 

আমাদের সেই কথার-লেখার-বিনোদনের-বিষাদের যাদুকরের আজ জন্মদিন। জন্মের হিসাব ধরলে ৭৩তম। মৃত্যুর হিসাব করলে মারা যাওয়ার পর নবম। কিন্তু মৃত্যুর অঙ্ক করতে ইচ্ছে হয় না। সাহিত্য ক্লাসের তুচ্ছ ছাত্ররাও জানে, লেখকের শারীরিক মৃত্যু একটা ঘটনাক্রম মাত্র। তাঁর জীবনের বিস্তৃতি লেখার টিকে থাকার সমান্তরাল। লেখা হারিয়ে গেলে তবেই তিনি মারা যান। এবং সেই হিসাবে হুমায়ূন মারা যাননি। আজ নয় বছর পরও জন্মদিনে জীবিত থাকার সময়ের মতোই জন্মানন্দে উজ্বল। 

মারা গেলেন ২০১২ সালে। ২০১৩ সালে বইমেলা নিয়ে নানান সমীকরণ। তাঁর প্রকাশকেরা নানান বিষাদের রং মাখিয়ে বই বিপননের চেষ্টা করছেন। জনপ্রিয় ধারার লেখকদের কেউ কেউ আবার ধরে নিলেন, এবার হুমায়ূন আহমেদ নেই। ফাঁকা মাঠে পাঠককে নিজেদের দিকে টেনে নিতে ভীষণ আশাবাদী।  

মেলা শুরুর সপ্তাহ দুয়েক পর অন্য চিত্র। প্রকাশকদের এক আড্ডায় একজন চিন্তিত গলায় বললেন, ‘অন্য জনপ্রিয় লেখকদের বই বিক্রি তো কমতির দিকে।’
‘বলেন কী? উল্টোটা তো হওয়ার কথা।’
‘আমিও তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু হচ্ছে না’
আরেকজন বললেন, ‘এবার বরং নানামুখী বই বিক্রি হচ্ছে। গল্প-উপন্যাসের চেয়ে ভ্রমণ-বিষয়ভিত্তিক বই এগুলোর দিকেই বেশি ঝোঁক যেন মানুষের।’
প্রথমজন একটু ভেবে বললেন, ‘আমার মনে হয় ঘটনাটা বোধহয় এরকম। মেলায় বই কিনতে আসা মানুষদের একটা বড় অংশ হুমায়ূনের নতুন বইয়ের জন্যই আসতেন। এদের একটা অংশ এ বছর আসছে না। এরা আসলে হুমায়ূনের পাশাপাশি অন্যদেরও দুটো একটা বই কিনত। হুমায়ূন নেই, তাই ওরা অনুপস্থিত, অন্য জনপ্রিয়রাও তাই সুবিধা পাচ্ছেন না।’

হয়ত পুরো ঠিক নয়। কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও নয়। এখন অনলাইন প্রচারণার ভিত্তিতে অন্য অনেকে জায়গা করে নিচ্ছে বটে কিন্তু হুমায়ূনের অনুপস্থিতি প্রচলিত ধারার গল্প-উপন্যাসের বিক্রির ক্ষেত্রে এক ধরণের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে। হুমায়ূনের বিশাল ছায়াকে তাঁর সময়ের অনেক চালু লেখক বাধা মনে করতেন। যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সেই ছায়া তাদের ঢেকে রাখত না। বরং ছায়াতলে আশ্রয় দিত। 

এমনকি বিরোধীরাও স্পষ্ট সুবিধা পেতেন। এক প্রকাশক একবার বইমেলায় প্রবন্ধ-কলাম এসব বই প্রকাশের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিচ্ছেন একে একে। অবাক হয়ে বললাম, ‘আপনার তো টাকার অভাব নেই। তাহলে...’
হেসে বললেন, ‘এবার হুমায়ূন আহমেদ পাচ্ছি না।’
‘তাহলে তো এগুলো আরও বেশি করা উচিত।’
‘আরে বোকা, হুমায়ূন আহমেদের বই পেলে যে ব্যবসা হয় তাতে অন্য অলাভজনক-সম্মান বাড়ানোর কিছু বই করে ফেলা যায়। হুমায়ূন না পেলে চলে না। বিরাট লস।’

সাধারণ ব্যবসায়িক চিন্তা মাথায় বড় একটা টোকা দিয়েছিল। সিরিয়াস ধারার লেখকরা হুমায়ূন আহমেদকে না উড়িয়ে দেন! অপসাহিত্য-অপন্যাস এসব বলে বাতিল করেন। অথচ আদতে তাদের জন্যও তিনি ছিলেন উপকারী।

অনেকে যৌক্তিকভাবেই বলবেন, শুধু কি বিক্রি দিয়ে সাহিত্যের মূল্যায়ন হয়? হয় না মোটেও। বিক্রি অবশ্যই একমাত্র বিষয় নয়। কিন্তু একটা বিষয় তো। তাতেই তো মানুষের ভালোবাসা এবং তাঁর পর্যন্ত পৌঁছানোর খোজটা মেলে। মানুষের মন আর মনস্তত্বের সঙ্গে কলমের সেতু তাঁর মতো করে কেউ গড়তে পারেনি। তাঁর মতো করে বাংলাদেশের মধ্য-নিম্নমধ্যবিত্তকে কেউ ধারণ করতে পারেনি। বাজারের বাজে নিয়মের ফেরে তাই তাকে ফেলা যাচ্ছে না। বাজার ছাপিয়ে অনেক বড় বিস্তৃতি বোধহয় হুমায়ূনের। 

একটা সময় বাংলাদেশের পাঠকরা পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বই পড়ত। হুমায়ূন আহমেদ মানুষকে সেখান থেকে সরিয়েই আনলেন না, উপহার দিলেন নতুন ভাষা। যেটা খুব সম্ভব বাংলাদেশের বাংলা। মানুষ দেখল তাদের চিন্তা, তাদের আবেগ এই ভাষাতেই সবচেয়ে ভালো প্রকাশ করা যায়। কাজেই সেটাই হয়ে উঠল লেখার জন্য আদর্শ। বদলে গেল আমাদের লেখার ধরন। সাহিত্য তো বটেই, আজকে পত্রিকায় যে ধরনের ফিচার লেখা হয় সেই ভাষাও হুমায়ূন আহমেদের রাস্তাতেই তৈরি। তাঁর মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে তারুণ্যের আড্ডার আর রসিকতার ভাষাও। তাঁর নাটকের চরিত্ররা যেমন ভাষায় রসিকতা করে আমাদের মনে হলো সেটাই রসিকতার সবচেয়ে স্মার্ট ভাষা। সংগ্রামমুখর তরুণরা দেখল জীবনের কঠিনতম সময়টাকেও উপভোগ করা যায়। তরুণীরা দেখল বদ্ধ জীবনে তাদের যেসব স্বপ্ন বন্দি হয়ে থাকে সেগুলোতে রঙিন ডানা লাগিয়ে দিচ্ছেন তিনি। ঘরে বসেও তাতে দিব্যি উড়ে চলা যায়। 

আর তাই কলমটা হরফ শব্দ আর বাক্য তৈরির সাধারণ কোনো বস্তু নয়। এটা বিশাল দৈর্ঘ্যরে এক সেতু। যে সেতুতে চড়ে হিমু রহস্যময়তা নিয়ে, মিসির আলী রহস্যভেদ নিয়ে, শুভ্র শুভ্রতা নিয়ে, রূপা রূপেরও বেশি কিছু নিয়ে ঢুকে পড়ে হৃদয়ে। এভাবেই মৃত্যুর পবের যত দিন যাক, জন্মদিনের সংখ্যার ভার যত বাড়ুক হুমায়ূনের বয়স যেন আর বাড়ে না। চলে গিয়েও তিনি আছেন ভীষণভাবে। অনুপস্থিতির তীব্রতাতেই তাঁর প্রবল উপস্থিতি। 

বিদায়ের অত বছর পরও বাজারে থেকে যান সবার ওপরে। রয়ে যান বিরোধীদের সতর্ক সমীকরণে। আর মুগ্ধদের কীর্তনে তো অবশ্যই চিরন্তন। তখন মনে হয়, শুধু জন্মদিন নয়। হুমায়ূন সবসময়ই উদযাপনের। জন্মানন্দের দিনের বাড়তি গুরুত্ব এটাই যে তাঁর বেঁচে থাকার আওয়াজটা এদিন আরো স্পষ্ট করে শোনা যায়।

(লেখক- বিশিষ্ট ক্রীড়া লেখক ও কথাসাহিত্যিক। লেখাটি তার ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া।) 

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়