সোমবার

২৫ জানুয়ারি ২০২১


১২ মাঘ ১৪২৭,

১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

কোথায় ক্যাপ্টেন আমেরিকা? যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফের বাঁচান’

সম্পাদকীয় বিভাগ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:৩৮, ১৩ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ২১:৪২, ১৩ জানুয়ারি ২০২১
কোথায় ক্যাপ্টেন আমেরিকা? যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফের বাঁচান’

থানোসের আদলে ট্রাম্প

কুখ্যাত ক্যাপিটল  দাঙ্গা কাণ্ডের পর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি হাজির হয়েছে তা হলো,‘আমেরিকার গণতন্ত্র কেমন?’এবং ‘আমরা কেমন গণতন্ত্র চাই?’ পরিস্কার উত্তর হচ্ছে, আমরা অবশ্যই আমেরিকান মডেলের গণতন্ত্র চাই না। যেখানে নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রাচীন, যা অসংখ্য আইন লঙ্ঘনের সুযোগ করে দেয়, আর যেখানে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের আচরণ  ‘থানোস’-এর মতো  ( সুপার ভিলেন থানোস সহিংসতাপ্রবণ একটি কমিক চরিত্র, যে নতুন ধরনের শান্তি ও স্বাধীনতার জন্য পুরাতন সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়)। 

কাগজের শিরনামে “ক্যাপিটলের ঝড়”, “ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গা”, “ওয়াশিংটনে বিশৃঙ্খলা”-র ভেতর দিয়ে পৃথিবী সাক্ষী হলো ট্রাম্প সমর্থকদের ভয়াবহ হামলার। পুলিশের বাধা মাড়িয়ে তারা ক্যাপিটল হাউজে দাঙ্গা বাঁধায়। যেখানে বিশৃঙ্খলা দমনে পুলিশ টিয়ার শেল ও পরে এর অন্দরমহলে গুলি ছোঁড়ে। ওয়াশিংটন পোস্ট এই হামলাকে ২৪৪ বছরের গণতন্ত্রের সঙ্গে নাশকতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।  

ক্যাপিটল হিলে হামলা: মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর নাশকতা 

২০২০ সালের নির্বাচনের ফল বদলে দিতে বর্তমান প্রেসিডেন্টের নির্দেশে গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে হামলা করা হয়। হামলাকারীরা ট্রাম্পের ছবি সম্বলিত ব্যানার ও কনফেটারেট পতাকা নিয়ে ভবনে ঢুকে হাঙ্গামা শুরু করে যার ফলে ইলেকটোরালের আনুষ্ঠানিক গণনা পিছিয়ে যায়। ক্যাপিটল ভবনে এই আকস্মিক হামলার মূল হোতা প্রেসিডেন্ট নিজেই। নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবিতে আসা তার হাজার হাজার উত্তেজিত সমর্থকদের উদ্দশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তার পরাজয় ‘গণতন্ত্রের ওপর বিশাল হামলা’। তিনি জড়ো হওয়া জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ক্যাপিটলে আসুন, আমরা আমাদের সাহসী সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের সঙ্গে উল্লাস করবো এবং আমরা সম্ভবত এদের কারো-কারো সঙ্গে উল্লাস করবো না (ডেমক্র্যাট ও ভিন্নমতের রিপাবলিকানদের সঙ্গে)।  কারণ, আমরা আমাদের দেশকে ফের দুর্বল করে দিতে পারি না। 

ক্যাপিটলে যখন তাণ্ডব চলছিল তখন ট্রাম্প আরো বেশি আগ্রাসী হতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন, যদিও তিনি হোয়াইট হাউসে ঘরে বসে টিভিতে দেখছিলেন ঘটনা। ট্রাম্প  সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে খুশি হন, যখন এগুলো তার মহত্ব প্রচার করে। ২০১৫ সালে তার কিছু সমর্থক যখন একজন গৃহহীন ল্যাটিনকে বোস্টনে নিপীড়ন করে, তখন তিনি ‘অতি উৎসাহী’ বলে একপ্রকার লাই দেন। আটলান্টিক ম্যাগাজিনের বরাতে জানা যায়, ক্যাপিটল ভবন লণ্ডভণ্ড করার দৃশ্য দূর থেকে টিভিতে দেখার পর তিনি তাদের ক্যাপিটল ত্যাগ করতে একটি ভিডিও রিলিজ করেন, যদিও ভিডিওতেও ক্যাপিটল হামলায় অংশ নেওয়াদের ‘ভেরি স্পেশাল’ বলেন।  

ওয়াশিংটনের এমন বিশৃঙ্খলা আমেরিকান ইতিহাসে যদিও খুবই পরিচিত দৃশ্য। যদিও স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন বাতিলের জন্য এমন সশস্ত্র গণহামলা বর্তমানের অনেক আমেরিকানের কাছেই পরিচিত নয়। আমেরিকান রাজনীতির অন্ধকার দিক যারা অনুধাবন করতে পারেন না, তাদের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই প্রতিভা প্রদর্শন বর্তমান অবস্থা বুঝতে কাজে লাগবে। এই হামলা শুধুমাত্র গণতন্ত্রের ওপর হামলাই নয়, এই হামলায় অনেকেই গুরতর আহত হয়েছেন এবং ৫ জন আমেরিকান নাগরিকের প্রাণও গেছে।  

আরো পড়ুন>>> ভারতের কৃষক আন্দোলন: মোদি সরকারের মেকিয়াভেলিয়ান কৌশল! 

ক্যাপ্টেন আমেরিকা: নিজের চরকায় তেল দিন 

স্বঘোষিত বৈশ্বিক নীতি নির্ধারক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ‘আমেরিকান মডেল’ ও ‘মানবাধিকারের শ্রেষ্ঠত্ব’ সারা দুনিয়ার অন্যান্য দেশের ওপর ‘আরোপ করে’ থাকে। দুনিয়ায় এমন দেশ পাওয়া দুষ্কর যাদেরকে আমেরিকা ‘অবাধ নির্বাচন, গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, সন্ত্রাস-দমন ও মানবাধিকার’ নিয়ে মাগনা ‘উপদেশ’ ও ‘সতর্কতা’ প্রদান না করে! 

বিশেষত ওয়াশিংটন বিরোধী হিসেবে পরিচিত মস্কো, আংকারা, তেহরান, উত্তর কোরিয়াসহ এমন অনেক দেশের দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে রয়েছে বহু উপদেশ। আর এখন গোটা বিশ্ব ওয়াশিংটনের ভণ্ডামি ও মুরুব্বিয়ানার সমালোচনা করছে। শুধুমাত্র বিরুদ্ধাচরণ নয়, ওয়াশিংটন নিজেদের বৈশ্বিক নীতি-নির্ধারক প্রমাণ করতে প্রায়ই কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ‘নাক গলায়’। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভুটানের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে তাদের  ‘উদ্বেগ’ দেখানোর ব্যাপারটি দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় দেশ বাংলাদেশ, যারা মানবিকতার টানে উদারভাবে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে কিছুদিন আগে, ওয়াশিংটনের সিনেটররা সেই বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটিলিয়ন (র‍্যাব) এর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীনভাবে ‘ক্রস ফায়ার’-এর অভিযোগ তোলে। মিশর, চীন ও অন্যান্য স্থানে ফেইসবুক বন্ধ করে দেওয়ায় মার্কিন প্রশাসনের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। কিন্তু এবার তারা সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজ, ভিডিও ও টুইটার বন্ধ করেছে।  

এছাড়া, কুখ্যাত ৯/১১ আক্রমণের পর, আমেরিকা সন্ত্রাস দমনের যুদ্ধের (war on terrorism) নামে ৬.৪ ট্রিলিয়ান ডলার খরচ করেছে। যার ফলাফল হিসেবে বিশ্ব দেখেছে ৮,০০০০০ মৃত্যু, ১ কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া, আর কোটি মানুষের আহত হওয়া- যার সবটাই বিদেশের মাটিতে। ওয়াশিংটনের প্রোপাগান্ডা চরিত্র এতদিন এমন প্রচার করে আসছিল যেন তারা ক্যাপ্টেন আমেরিকা (আলোচিত কমিকের বিখ্যাত ও প্রধান চরিত্র), তারা হয়ে উঠেছিল প্রথম ‘প্রতিহতকারী’ বৈশ্বিক পুলিশ, ‘শয়তান ও সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতা।  কিন্তু এখন, ক্যাপিটল দাঙ্গার পর, মার্কিন প্রশাসন তাদের নিজেদের দাঙ্গা সমনে স্পেশাল ফোর্স ডাকছে। সুতরাং সময় হয়েছে, ক্যাপ্টেন আমেরিকাকে দেশে ডেকে এনে তাদের নিজ দেশের ‘থানোস’ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দমন করার। 

ট্রাম্প সমর্থিত ক্যাপিটল হিল হামলার পর আমেরিকার এখন সময় হয়েছে নিজেদের ‘নির্বাচনী ব্যবস্থা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ নিয়ে চিন্তা করার। ক্যাপিটল দাঙ্গা আমেরিকার জন্য একটি চরম শিক্ষা, যার মধ্য দিয়ে অন্যদের দিকে আঙুল তুলে নির্বাচন ব্যবস্থাসহ রাজনৈতিক অবস্থা ও মানবাধিকার নিয়ে কোনো কথা বলার নৈতিক অধিকার তারা হারিয়েছে। আমেরিকার এখন সময় হয়েছে অন্য দেশের গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার স্ট্যান্ডার্ডকে বারবার প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ‘হস্তক্ষেপ’ না করে ‘নিজের চরকায় তেল দেওয়ার’। বলা নিষ্প্রয়োজন, সমস্ত দুনিয়ার মানুষ প্রার্থনা ও আশা করছে বিখ্যাত কমিক ও মুভি চরিত্র ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকার’র মতো কেউ আমেরিকাকে ফের ‘থানোস’-এর হাত থেকে রক্ষা করবে।

দিনবদলবিডি/এইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়