রোববার

১৩ জুন ২০২১


৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮,

০২ জ্বিলকদ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

সবই তথ্যের খেলা!

মো. আব্দুল হামিদ || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:২৪, ২৬ মে ২০২১  
সবই তথ্যের খেলা!

ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, অনলাইন পোর্টালের মতো অসংখ্য উৎস থেকে আমরা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ তথ্যের ইনপুট নিচ্ছি- তার ঠিক কতটা সত্যিই দরকারি?

ধরা যাক, আপনার বাসায় একজন গর্ভবতী মা আছেন। তিনি বাসা থেকে খুব একটা বের হন না। নিকটতম প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজন ছাড়া এই তথ্যটা তেমন কেউ জানে না।

কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করলেন, কিছুদিন থেকে প্রসূতি মা ও সদ্য প্রসূত বাচ্চার জন্য দরকারি জিনিসপত্রের বিজ্ঞাপন আপনার ফোনে বারবার ভেসে উঠছে! সেটা কীভাবে সম্ভব? আপনি তো গুগল বা ফেসবুককে কখনো এই তথ্যটা দেননি। তাহলে ‘ঘরের কথা পরে জানল ক্যামনে?’

আসলে কৃষি ও শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে আমরা এখন বাস করছি তথ্যবিপ্লবের যুগে। আচ্ছা, তথ্যের সঙ্গে ‘বিপ্লব’ শব্দটা যায়? তা নিশ্চিত নই। তবে এটা বুঝতে পারছি যে, তথ্য দিয়ে শুধু বিপ্লব নয় বরং অতিবিপ্লব বা প্রতিবিপ্লবও ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব! তথ্যেরপ্রবাহ যেমন আলমদের ‘হিরো’ বানায়, ঠিক তেমনিভাবে কিছু তথ্যের সরবরাহ মুহূর্তেই বহু নায়ককে ভিলেন বানিয়ে ছাড়ে, তাই না?

আপনাদের হয়তো খেয়াল আছে, ২০১৬ সালে তুরস্কে এরদোয়ান সাহেবের বিরুদ্ধে (কথিত) এক অভ্যুত্থান অতিদক্ষতায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। সেই ঘটনায় বিশ্লেষকগণ ‘আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার’কে বিশেষ কৃতিত্ব দিয়েছিলেন। আবার চীন ও উত্তর কোরিয়ার জনগণকে বশে রাখার ক্ষেত্রেও নাকি তথ্যপ্রযুক্তির রয়েছে বিশেষ ভূমিকা।

যাহোক, শুরুতে বলছিলাম, আপনার ঘরের তথ্য কীভাবে অন্যরা জানছে? সেই মা ঘরের বাইরে না গেলেও তার সম্পর্কে জানার অসংখ্য উৎস প্রতিনিয়ত সক্রিয় রয়েছে। অনলাইনে বিশেষ কোনো পণ্য কেনা, কোনো অ্যাপ ব্যবহার করে তার স্বাস্থ্যের হাল-হকিকত বুঝতে চেষ্টা করা। কিংবা তার কোনো টেস্ট রিপোর্ট ছবি তুলে মেসেঞ্জারে পরিচিত ডাক্তারের কাছে পাঠানো... এমন অসংখ্য পন্থায় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো সেটা জানতে সক্ষম হয়। এমনকি সুপারশপে সেই ভোক্তার জন্য কেনা পণ্যের রেকর্ড থেকেও গুগল তথ্যটি পেতে পারে। বুঝলেন না? সেখানে বোনাস পয়েন্টের জন্য দেওয়া আপনার ফোন নম্বরটি তো গুগলের সঙ্গে সিনক্রোনাইজ করা আছে, তাই না?

এভাবেই কল্পনাতীত সব উৎস থেকে টেক জায়ান্টরা ভোক্তাদের মিলিয়ন-বিলিয়ন তথ্য জেনারেট করছে। শুধু ক্রয়কৃত পণ্যের তালিকা বিশ্লেষণ করেই নাকি একজন ডাটা সায়েন্টিস্ট বলে দিতে পারেন, সেই গর্ভবর্তী মায়ের সন্তানটি ছেলে না মেয়ে! সম্ভাব্য ডেলিভারি ডেটও নাকি অনুমান করতে পারে! মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- তাদের কেন মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য জানার এত আগ্রহ?

আসলে সেগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা নিখুঁতভাবে সম্ভাব্য ক্রেতাগোষ্ঠীকে টার্গেট করে। আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য ঠিক কতটা লোভনীয় তা বোঝার জন্য সম্প্রতি ৫৩ কোটি ৩০ লাখ ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য বেহাত হওয়ার খবরই যথেষ্ট! সেগুলোর সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের হাত বদলকে প্রভাবিত করা সম্ভব।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠছে যে, ভবিষ্যতের সুপার পাওয়ার (ব্যক্তি বা রাষ্ট্র নয়) তারাই হবে। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে- কীসের ভিত্তিতে তেমনটা হবে? সেটা হলো- বিলিয়ন মানুষের ট্রিলিয়ন তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ! এখনো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? ডোনাল্ড ট্রাম্পকে থামাতে তার টুইটার অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রভাব কল্পনা করতে পারেন? এটা তাদের প্রবল আধিপত্যের ব্যাপারটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে না?

জাস্ট কল্পনা করুন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে আপনার ইমেইল, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকতে পারছেন না! পাসওয়ার্ড ঠিকঠাক দেওয়ার পরেও কোনো রেসপন্স পাচ্ছেন না! আমি নিশ্চিত ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনার মাথা হ্যাং হয়ে যাবে। অনেকের পাগল হওয়ার দশা হবে, তাই না?

আমরা বাঙ্গি আর তরমুজের মতো নিরীহ বস্তু নিয়ে লাখ লাখ পোস্ট-কমেন্ট করি। আর জাকারবার্গের মিলিয়ন ডলারের আয় বাড়ে! কারণ আমাদের যত এনগেজমেন্ট ফেসবুকের ততই ইনকাম। কিন্তু ওই ফল-ফসলের উৎপাদনকারী ও ভোক্তারা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার গঠনমূলক প্রস্তাবনা খুব একটা নজরে আসে না। কারণ আমরা সবাই ‘ট্রেন্ড’ ফলো করে নিজেকে ‘ব্যাকডেটেড’ হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে চাই। আর সেটাই তথ্য কারবারিদের ব্যবসায়ের মূল উপকরণ!

করোনাকালে অনেকেরই হাতে অফুরন্ত সময়। ফলে নানা বিষয়ে ‘তথ্য ভোক্তা’ হতে মরিয়া হয়ে উঠছেন। পারস্পরিক সাক্ষাৎ, ফোনালাপ, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, অনলাইন পোর্টালের মতো অসংখ্য উৎস থেকে আমরা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ তথ্যের ইনপুট নিচ্ছি- তার ঠিক কতটা সত্যিই দরকারি?

খাওয়া, ঘুম, শরীরচর্চা, বিনোদন, খেলাধুলা সবকিছুই পরিমিত হওয়া ভালো। কোনো কারণে সেগুলো মাত্রাতিরিক্ত হলে আমাদের শরীর ও মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাহলে তথ্যের ক্ষেত্রেও কি একই কথা প্রযোজ্য নয়?

খাবার টেবিলে অসংখ্য আইটেম থাকলেও একপর্যায়ে আমরা ফুলস্টপ দিই। কেউ না ডাকলেও একসময় ঘুম থেকে উঠে পড়ি। তাহলে শুধু তথ্যের ক্ষেত্রে কেন যত পাব, ততই নিতে থাকব? কোনো একটা বিষয়ে ধারণা পাওয়ার জন্য আগ্রহী হওয়া স্বাভাবিক। সেজন্য নির্ভরযোগ্য দু-একটা উৎস থেকে জানতে চেষ্টা করলেই হয়।

কিন্তু ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপডেট, লাইভ সম্প্রচার, বুলেটিন, টকশো সবকিছু ফলো করে শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে আসলে কী অর্জন করতে চাই? আপনি নিশ্চিত, ঘটনা যে দিকেই মোড় নিক না কেন- আপনার ভূমিকায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তার পরও মিনিটে মিনিটে আপডেটেড থাকার দরকার কী?

কোনো কিছুর পর্যাপ্ত সাপ্লাই থাকলে সাধারণত সেটা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই হ্রাস পায়। সে হিসাবে তথ্যের বিপুল প্রবাহে একসময় আগ্রহে ভাটা পড়ার কথা ছিল। আগে সীমিত উৎসের নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় অনেক কিছুই জানা যেত না। কিন্তু এখন তথ্যের অসংখ্য উৎস হওয়ার পরেও সেই ধাঁধা কেটেছে কি?

আমার তো মনে হয়- ধোঁয়াশা আরো বেড়েছে! আগে টিভি-নিউজপেপার থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে একটা উপসংহারে পৌঁছা যেত। এখন হাজারো উৎসের ‘অথেনটিক’ তথ্য জেনেও তেমন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় কি? তাহলে এত বেশি জানার সুযোগ কি কল্যাণ করছে, নাকি উলটো ঝামেলায় ফেলছে?

এ কথা ঠিক যে, আগামী দিনে আমরা শত চেষ্টা করেও অন্যদের ডাটাবেজের অংশ হওয়া কিংবা নানা তথ্য ইনপুট নেওয়ার হাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারব না। তার পরও ভোগপ্রবণতায় লাগাম টানার ক্ষমতা এখনো আমাদের হাতে রয়েছে। সারা দিন অন্যের তথ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকলে নিজের কাজে মনোযোগী হব কখন? সেটা বিবেচনা করেই আমাদের করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করা জরুরি, তাই না?

-শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

দিনবদলবিডি/জিএ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়