বুধবার

২৬ জানুয়ারি ২০২২


১৩ মাঘ ১৪২৮,

২০ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দিন বদল বাংলাদেশ

পর্যটন এলাকা সমৃদ্ধ, তবে নিরাপদ নয় 

আলম শাইন || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:১৫, ২৬ ডিসেম্বর ২০২১  
পর্যটন এলাকা সমৃদ্ধ, তবে নিরাপদ নয় 

শুধু বাংলাদেশই নয়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম একটি সমুদ্রসৈকত

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্হিত পর্যটন নগরী কক্সবাজার। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক মানের শহর বলা যায়। শুধু বাংলাদেশই নয়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম একটি সমুদ্রসৈকত।

সৈকতটির একটানা দৈর্ঘ্য প্রায় ১২০ কিলোমিটার। রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে ৪১৪ কিলোমিটার দূরত্ব হলেও মোটামুটি ঘণ্টা দশেকের মধ্যেই কক্সবাজার পৌঁছানো সম্ভব। যাতায়াত ভাড়া সাধ্যের মধ্যে থাকলেও হোটেল-মোটেল ভাড়া সাধ্যের মধ্যে নেই। অবশ্য পর্যটন স্পটের কারণে পিক সিজনে ভাড়া একটু বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। তাই বলে সেই ভাড়া কোনো মতেই তিন-চার গুণ হতে পারে না।

পিক সিজনে দেশি পর্যটকদের আনাগোনায় কক্সবাজার শহর থাকে মুখরিত। সূত্রমতে জানা যায়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। এ সময় একজন রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ব্যবসায়ী পর্যন্ত রমরমা অবস্হায় থাকেন। মাত্র মাস চারেকের আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়গুলো পার করেন তারা। এলাকাবাসীর পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব খাতে প্রচুর আয় করে থাকে মৌসুমে।

অন্যদিকে দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্হিত একমাত্র প্রবাল রাজ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপের অবস্হান বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে। এটি টেকনাফ উপজেলাধীন ইউনিয়ন। টেকনাফ থেকে দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এখানে রয়েছে প্রকৃতির অজস সম্পদ। যার কারণেই সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বলা হয় বিশ্বের দুর্লভতম স্হানের একটি।

এত সব লোভনীয় কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ইদানীং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। জানা যায়, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখানেও প্রায় ২ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ ইতিবাচক দিক। কিন্তু পর্যটকদের স্বাগত জানাতে গিয়ে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে অনেকটাই এখন।

অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রমুখী সীমানার নিকটবর্তী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মোহনায় অবস্হিত বিশ্বের সর্ববৃহত্ ‘ম্যানগ্রোভ’ অরণ্য সুন্দরবন। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এটি প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি। দুই বাংলাব্যাপী এ ম্যানগ্রোভ অরণ্যের বিস্তৃতি হলেও বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে অবস্হিত অংশের আয়তন ৩ হাজার ৯৮৩ বর্গ কিলোমিটার। মোট ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই বনটি ১৯৮৭ সালে জাতিসংঘের বিবেচনাতে বিশ্বের অন্যতম ‘ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ’ হিসেবে স্হান করে নিয়েছে।

এই শ্বাপদসংকুল অরণ্যটি যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে এক রোমাঞ্চকর জঙ্গল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আর রোমাঞ্চকর বলেই হয়তো এ জঙ্গলের গুরুত্ব অপরিসীম পর্যটকদের কাছে। যার ফলে প্রকৃতির এ লীলাভূমি দর্শনের উদ্দেশ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক ছুটে আসেন সুন্দরবন এলাকায়। ফলে পর্যটন খাতে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ পেয়ে থাকি। শুধু পর্যটন খাতেই নয় মত্স্য, মধু, গোলপাতা ও জ্বালানি কাঠ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বহুবিধ জিনিসের মাধ্যমে সরকার প্রচুর রাজস্ব পেয়ে থাকে সুন্দরবন থেকে। সে দিকটি বিবেচনা করে সরকার ইতিমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছেন সুন্দরবনকে আগামী ১০ বছরের জন্য সংরক্ষণ করার।

বন বিভাগের এক গবেষণায় জানা যায়, সুন্দরবন বছরে প্রায় ১৬ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৫-৬ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে বলা যায়, সুন্দরবন আমাদের জন্য প্রকৃতির বিশেষ অবদান, যার সঠিক ব্যবহারে বাংলাদেশ আরো সমৃদ্ধ হতে পারে।

এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে রয়েছে অনেক বৈচিত্র্যময় দুর্গম পর্যটন এলাকা। নয়নাভিরাম সেসব স্হানে রয়েছে উঁচু পাহাড়-পর্বত-ঝরনাসহ গভীর জঙ্গলের সমাহার। বৃহত্তর সিলেটেও তদ্রূপ; হাওর-বাঁওড়, বন-বনানী, চা-বাগানসহ নানা ধরনের দর্শনীয় স্হান। উল্লিখিত অঞ্চলগুলো ছাড়াও দেশের অন্যান্য স্হানেও কমবেশি পর্যটন এলাকা রয়েছে, যা আমাদের ঢেলে সাজাতে হবে।

আমাদের দেশে ঢেলে সাজানোর মতো বিনোদনকেন্দ্র খুব একটা নেই। প্রকৃতির অজস দর্শনীয় স্হান থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ঢেলে সাজাতে পারিনি। তার একটি উদাহরণ হচ্ছে কক্সবাজার এবং পার্বত্য এলাকা। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির মতো জায়গাগুলোতে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারছি না আমরা। দুর্গমের অজুহাতে পিছিয়ে রয়েছে এলাকাগুলো। অথচ কী নেই ওখানে! সেই তুলনায় কক্সবাজার খানিকটা পিছিয়ে আছে। তার পরও যাতায়াতের দিকটি বিবেচনায় এনে পর্যটকরা ছুটে আসেন কক্সবাজারে। কিন্তু সেই স্হানটি এখন আর নিরাপদ নয়। বছর দুয়েক আগে অস্ট্রেলিয়ার একজন নারী পর্যটক যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন। শুধু তিনি নন, দেশি পর্যটকদের অনেকের কাছেই এ ধরনের অভিযোগ আমরা শুনতে পাচ্ছি।

সম্প্রতি তেমনি একটি ঘটনা ঘটেছেও কক্সবাজারে। নারী পর্যটকের স্বামীর গায়ের সঙ্গে বিচে ধাক্কা লাগার অজুহাতে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তিন যুবক সিএনজি যোগে প্রথমে তার স্বামীকে অপহরণ করে। পরে সেই নারীকে শহরের একটি হোটেলে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন করে। হয়তো এই ঘটনাটি জানাজানি হয়েছে, আর অন্য সব আড়ালে থেকে যাচ্ছে। যৌন হেনস্তা ছাড়াও গলাকাটা দামের অভিযোগ রয়েছে কক্সবাজারে।

এসব বিষয় পর্যালোচনা করে বলতে হচ্ছে, আমাদের পর্যটনশিল্প সমৃদ্ধ কিন্তু নিরাপদ নয়। দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়াতে হলে কিংবা এ শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে হলে দ্রুত নিরাপত্তার দিকটি নিয়ে ভাবতে হবে আগে, তারপর থাকা-খাওয়ার বিষয়ে কড়া নজরদারি দিতে হবে। পর্যটনশিল্প টিকিয়ে রাখার স্বার্থে হলেও পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ভাবতে হবে কতৃ‌র্পক্ষকে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট

সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

দিনবদলবিডি/জিএ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়