মঙ্গলবার

১৯ জানুয়ারি ২০২১


৫ মাঘ ১৪২৭,

০৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

পেরেক তুলতে ঢাকায় ওয়াহিদ সরদার

নিউজ ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২৬, ১৩ জানুয়ারি ২০২১  
পেরেক তুলতে ঢাকায় ওয়াহিদ সরদার

ছবি: সংগৃহীত

ওয়াহিদ সরদার। নামটাই যেন চেনা চেনা। বাড়ি যশোর জেলায় হলেও সাইকেল চালিয়েই ঘুরে বেড়ান এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। সঙ্গে থাকে লোহার রড, একটা ব্যাগ, আর মাথায় মাথাল (কৃষকরা মাথায় পড়েন)। ওয়াহিদ সরদার দীর্ঘদিন গাছ নিয়ে কাজ করতে করতে হয়েছেন গাছের মতোই উদার আর প্রাণবন্ত।

ওয়াহিদ সরদার একসময় সারা যশোর জেলা ঘুরে বেড়াতেন। গাছে অন্য মানুষরা নির্দয়ের মতো যে লোহার কাঁটাতার (পেরেক), নাইলন দড়ি, ইত্যাদি গেঁথে দিয়ে যেতেন, গাছ থেকে সেসব তুলে গাছকে শান্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে গাছের পেরেক অপসারণ শুরু করেন তিনি। যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনা, মেহেরপুর চারটি জেলার বিভিন্ন রাস্তার ধারে থাকা গাছ থেকে পেরেক অপসারণ করেছেন। সারাদেশের প্রায় পঁচিশ হাজার গাছ থেকে তিনি পেরেক তুলেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে রাস্তার গাছ থেকে ৪৪০ কেজি অর্থাৎ প্রায় ১১ মণ পেরেক অপসারণ করেছেন তিনি।

যশোর থেকে সাইকেল নিয়ে গাছের পেরেক তুলতে তুলতে তিনি গত শুক্রবার ঢাকায় এসেছেন। এবার তিনি ঢাকার গাছকে লোহার পেরেক, দড়ি, কাঁটাতার মুক্ত করবেন এমনটাই জানা গেছে।

ওয়াহিদ সরদার শাহবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাবেন। সেখানেই গাছের পেরেক তুলবেন তিনি। দেখেই চেনা যাচ্ছা উদার প্রাণবন্ত ওয়াহিদ সরদারকে। কারণ, মাথায় পতাকার রঙের মাথাল। পায়ে পুরনো ময়লা কেডস। গাছ থেকে পেরেক তোলার জন্য হাতে তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জমাদি। আর সাইকেলের সামনে একটা ব্যানার। তাতে, গাছকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

ওয়াহিদ সরদার একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বলেন, এই গাছে কমপক্ষে ৩৭টা পেরেক গাঁথা আছে। এত বড় কাঁটাতার দিয়ে নৌকা বানানো হয় গ্রামদেশে। আর এসব সাংঘাতিক পেরেক গাছটার বুকে ঠুঁকছে। গাছটা বাঁচবে ক্যামনে! কথা শেষ করে গাছ থেকে পেরেক তুলতে লাগলেন তিনি।

পেরেক তুলতে গিয়ে শীতের দিনেও ঘামছেন ওয়াহিদ সরদার। কপাল থেকে ঘাম তার থুতনিতে নামছে বেয়ে বেয়ে। সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। বোঝা যাচ্ছে বড় বড় পেরেকগুলো এমনভাবে গাছে গাঁথা হয়েছে, গাছের খুব ভেতরে চলে গেছে সেসব। গুনে গুনে গাছ থেকে ৩১টা বড় পেরেক বের করলেন তিনি।

কপালের ঘাম মুছে ওয়াহিদ সরদার বলেন, ২০০৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজ খরচে এবং বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় প্রায় ৩০ হাজার গাছ লাগিয়েছি। গাছকে ভালবাসি। গাছই বন্ধু। কিন্তু নিরাপত্তাহীনতায় গাছ ভুগছে কাঁটার আঘাতে। বিজ্ঞান বলছে গাছের জীবন আছে, যেহেতু জীবন আছে তার মানে তার যন্ত্রণা, ব্যথা আছে। এ কারণে গাছের বুক থেকে কাঁটা তুলছি।

সাইকেলে রাখা ব্যাগে গাছ থেকে তোলা কাঁটাগুলো তুলে রাখলেন। তারপর সাইকেল ঘোরালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সামনের দিকে অনেক গাছ আছে মনে হয়।

এরপর মল চত্বরের বিভিন্ন গাছ থেকে প্রায় দেড়কেজি পেরেক তোলেন ওয়াহিদ সরদার। পেরেক তোলার সময় কিছু কাঁটাতার তার মাথায় পড়ছে, কপালে পড়ছে, বুকে পড়ছে।

ব্যাগে রাখা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছে আবার তাকালেন গাছের দিকে। ওয়াহিদ সরদার বলেন, কিছু শিক্ষিত মানুষ গাছের সঙ্গে বৈরী আচরণ করছে। এরমধ্যে পলিটিশিয়ান আছে, ডাক্তার আছে, কোচিং সেন্টার আছে, এর ভেতরে ভর্তি চলিতেছে আছে, পাত্র চাই আছে, কলিকাতা হারবাল আছে- যারা গাছে নিজেদের প্রচারণার জন্য কাঁটাতার গাঁথেন। ২০০৮ সাল থেকে ১৪০০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে, রাস্তা থেকে গাছের কাঁটা তুলেছি। এরপরও গাছের কাঁটা কমছে না। তুলি আবার মানুষ গাছে পেরেক ঠুঁকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরের গাছগুলো থেকে পেরেক অপসারণ শেষে এবার রমনা পার্কের দিকে গেলেন। সাইকেলে ঝোলানো ব্যাগে অনেক পেরেক জমা হয়েছে প্রায় ৫ কেজি হবে। তিনি জানান, অনেকেই বিশ্বাস করেন না যে তিনি এসব বিক্রি করেন না।

কথা বলতে বলতে সাইকেলে উঠে পড়লেন ওয়াহিদ সরদার। বিদায় নিয়ে কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে আসলেন। বললেন, গাছ থেকে যা বের হয়, তাকে কেউ  বলে কষ, আবার কেউ বলে আঁঠা। আসলে, ওসব হচ্ছে গাছের রক্ত। গাছের বুক দিয়েও রক্ত বের হয়। কারণ গাছেরও প্রাণ আছে।

দিনবদলবিডি/কে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়