শুক্রবার

০৬ আগস্ট ২০২১


২২ শ্রাবণ ১৪২৮,

২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

কোরবানির ইতিহাস ও পরিচয়

ধর্ম ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:০৩, ২০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ১৭:১১, ২০ জুলাই ২০২১
কোরবানির ইতিহাস ও পরিচয়

প্রত্যেক যুগেই ধারাবাহিকভাবে কোরবানির এ বিধান সব শরীয়তেই বিদ্যমান ছিল

কোরবানির ইতিহাস অতি প্রাচীন। জগৎ সৃষ্টির শুরুর দিকেই কোরবানির প্রচলন শুরু হয়েছে। পবিত্র কোরআনুল কারিমে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলা কোরবানির সে ঘটনা এভাবে তুলে ধরেছেন-

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنْ الآخَرِ قَالَ لأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنْ الْمُتَّقِينَ 
অর্থ : ‘আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল। তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো এবং অন্য জনের কোরবানি কবুল হলো না। (তাদের একজন) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। (অপরজন) বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের কোরবানিই কবুল করে থাকেন।’ (সূরা : মায়েদা, আয়াত : ২৭)

لَئِنۡۢ بَسَطۡتَّ اِلَیَّ یَدَکَ لِتَقۡتُلَنِیۡ مَاۤ اَنَا بِبَاسِطٍ یَّدِیَ اِلَیۡکَ لِاَقۡتُلَکَ ۚ اِنِّیۡۤ اَخَافُ اللّٰهَ رَبَّ الۡعٰلَمِیۡنَ সে অর্থ : ‘(হাবিল) বলল, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার প্রতি হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ (সূরা : মায়েদা, আয়াত : ২৮)

তারপর থেকে প্রত্যেক যুগেই ধারাবাহিকভাবে কোরবানির এ বিধান সব শরীয়তেই বিদ্যমান ছিল। মানব সভ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে যুগে যুগে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করতেন। আর আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রিয়বস্তু উৎসর্গই আজকের কোরবানি। এ কথার প্রমাণে মহান আল্লাহ বলেন-

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرْ الْمُخْبِتِينَ 
অর্থ :  ‘আমি প্রতিটি সম্প্রদায়ের জন্য (কোরবানির) নিয়ম করে দিয়েছি। তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিজিক দেওয়া হয়েছে সেগুলোর উপর তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে (এই বিভিন্ন নিয়ম-পদ্ধতির মূল লক্ষ্য কিন্তু এক- আল্লাহর নির্দেশ পালন)। কারণ তোমাদের মাবুদই একমাত্র উপাস্য। কাজেই তার কাছেই আত্মসমর্পণ কর আর সুসংবাদ দাও সেই বিনীতদেরকে।’ (সূরা : হজ, আয়াত : ৩৪)

বর্তমান কোরবানির ঘটনা

মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর ১০ জিলহজ যে কোরবানি দিয়ে থাকেন, এর প্রচলন আসছে হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম থেকে। আল্লাহ তাআলা প্রাণপ্রিয় সন্তানকে কোরবানির নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম সে হুকুম পালন করে সফল হয়েছিলেন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কোরবানির পর থেকে উম্মতে মুসলিমাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে তার এ নির্দেশ কোরবানির বিধান পালন করে আসছেন। কোরবানির এ নির্দেশের বর্ণনাও কোরআনে এভাবে ওঠে এসেছে-

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعۡیَ قَالَ یٰبُنَیَّ اِنِّیۡۤ اَرٰی فِی الۡمَنَامِ اَنِّیۡۤ اَذۡبَحُکَ فَانۡظُرۡ مَاذَا تَرٰی ؕ قَالَ یٰۤاَبَتِ افۡعَلۡ مَا تُؤۡمَرُ ۫ سَتَجِدُنِیۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰهُ مِنَ الصّٰبِرِیۡنَ 
অর্থ : ‘অতঃপর যখন সে তার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি, অতএব, দেখ তোমার কী অভিমত? সে বলল, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০২)

فَلَمَّاۤ اَسۡلَمَا وَ تَلَّهٗ لِلۡجَبِیۡنِ 
‘অতঃপর বাবা-ছেলে উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহিম (আলাইহিস সালাম) তাকে জবেহ করার জন্য তাকে কাত করে শুইয়ে দিলেন।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৩)

قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡیَا ۚ اِنَّا کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ - وَ نَادَیۡنٰهُ اَنۡ یّٰۤاِبۡرٰهِیۡمُ 
অর্থ : ‘তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইব্রাহিম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয়ই আমি এইভাবে সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৪-১০৫)

اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الۡبَلٰٓـؤُا الۡمُبِیۡنُ - وَ فَدَیۡنٰهُ بِذِبۡحٍ عَظِیۡمٍ
অর্থ : ‘নিশ্চয়ই এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার (সন্তান কোরবানির) পরিবর্তে জবেহযোগ্য এক মহান জন্তু দিয়ে (কোরবানি করিয়ে) তাকে (সন্তানকে) মুক্ত করে নিলাম।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৬-১০৭)

وَ تَرَکۡنَا عَلَیۡهِ فِی الۡاٰخِرِیۡنَ 
অর্থ : ‘আর এ (কোরবানির) বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম। (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৮)

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ তাআলা কতই না মহান! যিনি তার বন্ধু হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে প্রিয় সন্তান কোরবানির নির্দেশ দিয়েছেন। তিনিও তার নির্দেশ পালন নিজ সন্তানকে জবেহ করার জন্য শুইয়ে দিয়েছেন। আর তিনি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তারপর থেকেই মুসলিম উম্মাহ কোরবানির এ বিধান পালন করে আসছেন।

কোরআন-সুন্নায় কোরবানির পরিচয়

আরবি করব বা কুরবান (قرب বা قربان) শব্দটি উর্দূ ও ফার্সীতে (قربانى) কোরবানি নামে রূপান্তরিত। এর অর্থ হলো-নৈকট্য বা সান্নিধ্য। কোরআনুল কারিমের কোরবানির একাধিক সমার্থক শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।

>نحر অর্থে। আল্লাহ বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য নামাজ এবং কোরবানি আদায় করুন। এ কারণে কোরবানির দিনকে يوم النحر বলা হয়।

> نسك অর্থে। আল্লাহ বলেন, قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ ‘আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মৃত্যু; সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য।’ (সূরা : আনআ’ম, আয়াত : ১৬২) 

> منسك অর্থে। আল্লাহ বলেন, ‘ لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً ‘আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কোরবানির বিধান রেখেছি।’ (সূরা : হজ্জ, আয়াত : ৩৪)

> الاضحى অর্থে। হাদিসের ভাষায় অর্থে কোরবানির ঈদকে (عيد الاضحى) ‘ঈদ-উল-আজহা’ বলা হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে-

হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের বন্ধুত্ব মহান আল্লাহর প্রতি কত গভীর ছিল। তা একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়। হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম যখন চলাফেরা করার বয়সে উপণীত হলেন; তখন প্রায় ১০০ বছরের বৃদ্ধ হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। তখন তিনি আল্লাহ তাআলার পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সে সময় মিনা প্রান্তরে প্রাণাধিক সন্তানকে কোরবানির নির্দেশ পালন করেছিলেন।

আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে তার মানসিকতা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে গিয়েছিল। যা আজও মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ এ তিন দিনের যেকোনো একদিন পালন করে থাকেন।

ইয়া আল্লাহ! মুসলিম উম্মাহকে আপনার প্রতিটি আদেশ-নিষেধ গুলোকে সঠিক ভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

দিনবদলবিডি/জিএ

পাঠকপ্রিয়