শুক্রবার

০৬ আগস্ট ২০২১


২২ শ্রাবণ ১৪২৮,

২৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

কোরবানির বিধি-বিধান

কোরবানীর ইতিহাস, পশু কোরবানি একটি ইবাদত, পশু কোরবানি কখন করতে হবে, ভাগে পশু কোরবানি করা যাবে কি না?, অমুসলিমকে কোরবানির গোশত দেওয়া যাবে কিনা, কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিক্রি করা বা কসাইকে দেওয়ার বিধান

ধর্ম ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ২০ জুলাই ২০২১   আপডেট: ২০:৩৬, ২০ জুলাই ২০২১
কোরবানির বিধি-বিধান

ঈদের দিন এবং পরবর্তী ২ দিন কারো হাতে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পর নেসাব প্ররিমাণ সম্পদ থাকে তার উপরে পশু কোরবানি করা ওয়াজিব

সামর্থবান প্রত্যেক মুসলমানের উপরে পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানি করা ওয়াজিব। যদিও কোরবানি ওয়াজিব না সূন্নাহ এ ব্যাপারে ওলামাদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে রাসূল (সা.) এর হাদিস থেকে জানা যায় এটা ওয়াজিবের পর্যায়ভূক্ত। বর্ণিত হয়েছে,
 
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ قَالَ : مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ ، وَلَمْ يُضَحِّ ، فَلاَ يَقْرَبَنَّ مُصَلاَّنَا.
অর্থ : ‘হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যার কোরবানি করার সামর্থ থাকার পরও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (সূনান ইবনে মাজা ও মুসনাদে আহমাদ)

কাজেই ঈদের দিন এবং পরবর্তী ২ দিন কারো হাতে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পর নেসাব প্ররিমাণ সম্পদ থাকে তার উপরে পশু কোরবানি করা ওয়াজিব। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা কোরবানির ইতিহাস, বিধি-বিধান ও মুসলিম উম্মাহর করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ!

কোরবানির ইতিহাস

আমাদের আদি পিতা হজরত আদম (আ.) এর যুগ থেকেই কোরবানির বিধান চলে আসছে। আদম (আ.) এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানি করার ইতিহাস আমরা আল-কোরআন থেকে জানতে পারি। 

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ
অর্থ : ‘আর তুমি তাদের নিকট আদমের দুই পুত্রের সংবাদ যথাযথভাবে বর্ণনা কর, যখন তারা উভয়ে কোরবানি পেশ করল। অতঃপর তাদের একজন থেকে গ্রহণ করা হলো, আর অপরজন থেকে গ্রহণ করা হলো না। সে বলল, ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব’। অন্যজন বলল, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের থেকে গ্রহণ করেন।’ (সূরা : আল-মায়েদা, আয়াত : ২৭)

হজরত আদম (আ.) এর শরীয়াতে জমজ ভাইবোন বিবাহ করা হারাম ছিলো। কারণ মা হাওয়া (আ.) এর গর্ভে ২ জন করে সন্তান জন্মগ্রহন করতো, একটা ছেলে একটা মেয়ে। তাই আদম (আ.) বড় ছেলে হাবিলের সঙ্গে কাবিলের সঙ্গে জন্ম নেওয়া আকলিমার সঙ্গে এবং হাবিলের সঙ্গে জন্ম নেওয়া কন্যা লিওযাকে কাবিলের সঙ্গে বিবাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই দুই কন্যার মধ্যে আকলিমার চেহারা সুন্দর ছিলো তাই শয়তান কাবিলকে বললো, তোমার সহদরা বোনের চেহারা সুন্দর তুমি এর হকদার। কাবিল শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে বললো, আমার সঙ্গে জন্ম নেওয়া বোন আকলিমাকে আমি বিবাহ করবো। সে নাছোড় বান্দাহ তখন হজরত আদম (আ.) তাদের বললেন, তোমরা দুজনেই কোরবানি করো যার কোরবানি কবুল হবে সেই আকলিমাকে বিবাহ করবে। তারা দুজনেই কোরবানি করলো, হাবিলের কোরবানী কবুল হলো; অর্থাৎ আকাশ থেকে আগুন এসে খেয়ে ফেললো এবং কাবিলের কোরবানী কবুল হলো না; ময়দানে পড়ে থাকলো। এখান থেকেই কোরবানির ইতিহাস শুরু হয়।

আদম (আ.) এর পুত্র কাবিল ও হাবিলের কোরবানির পর থেকে ইব্রাহিম (আ.) পর্যন্ত কোরবানি চলতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির ইতিহাসে কোরবানির সেখান থেকেই শুরু। মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়াত নাজিল হয়েছে, প্রত্যেক শরীয়তের মধ্যে কোরবানি করার বিধান জারি ছিল। প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের মধ্যে অপরিহার্য অংশ ছিলো কোরবানি।

প্রত্যেক নবী-রাসূল এর সময়ও কোরবানি করার বিধান ছিলো। আর এটার পরিপূর্ণতা পেয়েছে মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সময় থেকে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর কাছে থেকে আল্লাহ তাআলা কয়েকটি বড় পরীক্ষা নিয়েছিলেন এর মধ্যে সবচেয় বড় পরীক্ষা ছিলো নিজের সন্তানকে কোরবানি করা। আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,

فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى
অর্থ : ‘অতঃপর যখন সে তার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, ‘হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি, অতএব, দেখ তোমার কী অভিমত।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০২)

একথা শুনে হজরত ইসমাইল (আ.) জবাবে বললেন,

قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ
অর্থ : ‘সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।; (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০২)

অতঃপর হজরত ইব্রাহিম (আ.) সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কোরবানি করার জন্য মক্কার অদুরে মিনার প্রান্তরে হাজির হলেন, পথিমধ্যে শয়তান ৩ জায়গায় তাদেরকে প্ররোচনা দেয়, তারা দুজনেই শয়তানকে পাথর মেরে বিতাড়িত করেন। এই স্মৃতিকে মুসলিম মিল্লাতের মধ্যে ধরে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা হজের জন্য এই স্থানে অবস্থিত জামারায় পাথর মারা ওয়াজিব করে দিয়েছেন।

হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবার সন্তানকে জবেহ করবেন এবং ইসমাইল (আ.) নিজেও জবেহ হবেন, সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেছে। হজরত ইব্রাহিম (আ.) যখন ছুরি চলাবেন তখন আল্লাহ তাকে ডাক দিলেন। আল-কোরআনে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,

فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ (১০৩) وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ (১০৪) قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ
অর্থ : ‘অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে কাত করে শুইয়ে দিল, তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, ‘হে ইব্রাহিম, ‘তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয় আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করে থাকি।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৩-১০৫)

এটা ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যখন হজরত ইব্রাহিম (আ.) উত্তীর্ণ হলেন, তখন আল্লাহ তাআলা কোরবানি করার জন্য আসমান থেকে একটা পশু পাটিয়ে দিলেন। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,

إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ 

وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
অর্থ : ‘নিশ্চয় এটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। আর আমি এক মহান জবেহের বিনিময়ে তাকে মুক্ত করলাম।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৬-১০৭)

এর পর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপরে কোরবানির এই বিধান জারি ছিল। আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে বলেন,

وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ
অর্থ : ‘পরবর্তী কালের লোকদের জন্য এটাকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ স্থাপন করলাম।’ (সূরা : সাফফাত, আয়াত : ১০৮)

হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর পর থেকে আজ অবধি মুসলিম উম্মাহর মাঝে আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের জন্য আল্লাহর রাস্তায় প্রিয়বস্তু উৎসর্গ করার নমুনা হিসেবে পশু কোরবানি করার প্রচলন চলে আসছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত এটা চালু থাকবে। আল্লহ তাআলা বলেন,

وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرِ الْمُخْبِتِينَ
অর্থ : ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি ককোরবানির বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিজিক নির্ধারণ করেছেন।’ (সূরা : হাজ্জ, আয়াত : ৩৪)

আমরা মুসলমানরা যে কোরবানি করি এটা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর শিক্ষা বুকে ধারণ করেই করি। হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর কোরবানি করার দিন থেকে প্রতি বছর হজের জন্য যারা মক্কায় আসেন তারা মিনার প্রান্তরে গিয়ে শয়তানকে পাথর মারার পরে কোরবানির নজরানা পেশ করেন এবং যারা হজজ করতে আসে না অথচ আর্থিক স্বচ্ছলতা আছে তারাও আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার জন্য, আল্লাহকে খুশি করার জন্য তাদের নিজ এলাকায় কোরবানির এই নজরানা পেশ করে। এটাই মুসলিম সমাজে কোরবানি বলে পরিচিত।

পশু কোরবানি একটি ইবাদত

আল্লাহর রাস্তায় পশু কোরবানি করা ইসলামি শরীয়াতে একাট ইবাদত, যা কোরআন, হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এব্যাপারে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অর্থ : ‘তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কোরবানি কর।’ (সূরা : আল-কাউসার, আয়াত : ২)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,

قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. لَاشَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
অর্থ : ‘বল, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তার কোন শরিক নাই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।’ (সূরা : আনয়াম, আয়াত : ১৬২-১৬৩)

পশু কোরবানি হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নাত

আমরা যে কোরবানি করি তা হজরত ইব্রাহিম (আ.) থেকে প্রাপ্ত প্রিয় জিনিস আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার নমুনা। এজন্য আল-হাদিসে কোরবানিকে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণিত আছে,

عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ ، قَالَ : قَالَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ : يَا رَسُولَ اللهِ ، مَا هَذِهِ الأَضَاحِيُّ ؟ قَالَ : سُنَّةُ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ قَالُوا : فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : بِكُلِّ شَعَرَةٍ ، حَسَنَةٌ قَالُوا : فَالصُّوفُ ؟ يَا رَسُولَ اللهِ ، قَالَ : بِكُلِّ شَعَرَةٍ مِنَ الصُّوفِ ، حَسَنَةٌ.
অর্থ : ‘হজরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) এর সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) কোরবানী কী? উত্তরে নবীজি (সা.) ইরশাদ করলেন, কোরবানি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত, তারা বললেন এতে আমাদের কী ফজিলত? নবীজি বললেন প্রতিটি পশমের বিনিময়ে পাঁচটি করে সওয়াব। তারা বললেন, ছুফ এর জন্যও কি? নবীজি জবাব দিলেন, ছুফ (অধিক পশম বিশিষ্ট পশু) এর জন্য নেকী রয়েছে।’ (সূনান ইবনে মাজাহ)

পশু কোরবানি করার বারাকা ও ফজিলত

কোরবানির মধ্যে আল্লাহ তাআলা অনেক বারাকা রেখে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি করবে আল্লাহ তাআলা তার এই কোরবানির প্রতিদান দেবেন। আল্লাহ তাআলা কোরবানির গোস্ত ও রক্ত কিছুই চাননা, বরং আল্লাহ মুমিনের অন্তরের তাকওয়া দেখতে চান। এ সম্পর্কে আল-কোরআনে বর্ণিত হয়েছে,

لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ كَذَلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَبَشِّرِ الْمُحْسِنِينَ
অর্থ : ‘আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর এজন্য যে, তিনি তোমাদের পথ-প্রদর্শন করেছেন; সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে।’ (সূরা : আল-হাজ্জ, আয়াত : ৩৭)

কোরবানির দিনে সবচেয়ে প্রিয় কাজ পশু কোরবানি করা। কোরবানির পশুর রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহর দরবারে কবুল হয়ে যায়। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, 

 عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ قَالَ : مَا عَمِلَ ابْنُ آدَمَ يনোَوْمَ النَّحْرِ عَمَلاً أَحَبَّ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ ، مِنْ هِرَاقَةِ دَمٍ ، وَإِنَّهُ لَتَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، بِقُرُونِهَا ، وَأَظْلاَفِهَا ، وَأَشْعَارِهَا ، وَإِنَّ الدَّمَ ، لَيَقَعُ مِنَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ ، بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ عَلَى الأَرْضِ ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا.
অর্থ : ‘হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই। ওই ব্যক্তি কেয়ামতের দিন জবেহকৃত পশুর লোম, শিং, ক্ষুর, পশমসমূহ নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত জমিনে পতিত হবার পূর্বেই তা আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা কোরবানির দ্বারা নিজেদের নফসকে পবিত্র কর।’ (সূনান ইবনে মাজাহ)

আল-কোরআনের এ আয়াত ও হাদিসের মাধ্যমে জানা যায়, পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোরবানিদাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন করেন। এবং পশু কোরবানী করার বারাকা হিসেবে যে পশু জবেহ করা হয় তার গায়ের পশম সমপরিমান বা তার পাঁচগুন সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয়। আল-হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

فَمَا لَنَا فِيهَا يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : بِكُلِّ شَعَرَةٍ ، حَسَنَةٌ قَالُوا : فَالصُّوفُ ؟ يَا رَسُولَ اللهِ ، قَالَ : بِكُلِّ شَعَرَةٍ مِنَ الصُّوفِ ، حَسَنَةٌ.
অর্থ : ‘সাহাবিরা বললেন এতে আমাদের কী ফজিলত? নবীজি (সা.) বললেন প্রতিটি পশমের বিনিময়ে পাঁচটি করে সওয়াব। তারা বললেন, ছুফ এর জন্যও কি? নবীজি (সা.) জবাব দিলেন, ছুফ (অধিক পশম বিশিষ্ট পশু) এর জন্য নেকী রয়েছে।’ (সূনান ইবনে মাজাহ)

পশু কোরবানি কখন করতে হবে

কোরবানি করার সময় সম্পর্কে সকল ওলামায়ে কেরাম একমত যে, কোরবানি করতে হবে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করার পরে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم : مَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلاَةِ تَمَّ نُسُكُهُ وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ.
অর্থ : ‘হজরত বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, যে ঈদের সালাতের পর কোরবানির পশু জবেহ করল তার কোরবানি পরিপূর্ণ হলো ও সে মুসলিমদের আদর্শ সঠিকভাবে পালন করল।’ (সহিহ আল-বুখারি)

যদি কেউ ঈদের নামাজের আগে জবেহ করে তাহলে তার কোরবানি আদায় হবে না, বরং ঈদের নামাজের পরে আর একটি কোরবানি করতে হবে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ جُنْدَبٍ قَالَ صَلَّى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ النَّحْرِ ثُمَّ خَطَبَ ثُمَّ ذَبَحَ فَقَالَ مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَلْيَذْبَحْ أُخْرَى مَكَانَهَا
অর্থ : ‘হজরত জুনদুব (রা.) বর্ণিত তিনি বলেন, কোরবানির দিন রাসূল (সা.) নামাজ আদায় করলেন, তারপর খুতবা দিলেন, তারপর পশু জবেহ করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নামাজের আগে কোরবানি করবে, অবশ্যই তাকে এর স্থলে আর একটি পশু জবেহ করতে হবে।’ (সহিহ আল-বুখারি)

ভাগে পশু কোরবানি করা যাবে কি না?

আমাদের দেশে ভাগে কোরবানি করা যাবে কি না এব্যাপারে মতভেদ আছে। বর্তমান সময়ে কেউ কেউ বলছেন, একজন একটা পশু কোনিরবানি করতে হবে ভাগে কোরবানি করা যাবে না। তবে সফরে ভাগে কোরবাননি করা যাবে বলে তারা মতামত দেন। তারা দলিল হিসেবে নিম্নোক্ত হাদিস পেশ করেন। 

عَنْ أَبِي سَرِيحَةَ ، قَالَ كَانَ أَهْلُ الْبَيْتِ يُضَحُّونَ بِالشَّاةِ وَالشَّاتَيْنِ
অর্থ : ‘হজরত আবি সারিহাতা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, (রাসূল (সা.) এর জামানায়) একটি পরিবাবেরর পক্ষ থেকে একটি অথবা দুইটি ভেড়া/বকরি কোরবানি করা হতো।’ (সূনান ইবনে মাজা)

عَنْ مِخْنَفِ بْنِ سُلَيْمٍ ، قَالَ : كُنَّا وَقُوفًا عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ بِعَرَفَةَ فَقَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيَّةً وَعَتِيرَةً.
অর্থ : ‘হজরত মিখনাফ ইবনে সুলাইম (রা.) বলেন, আমরা নবী (সা.) এর সঙ্গে আরাফাতে অবস্থান করছিলাম, তখন তিনি বললেন, হে মানব সকল প্রত্যেক পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতি বছর একটি করে কোরবানি।’ (সূনান আবু দাউদ)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-সহ প্রায় সকল উলামাগণ বলেছেন, একটা গরু সাত ভাগে এবং উট ১০ ভাগে কোরবানি করা যাবে। দলিল হিসেবে তারা নিম্নোক্ত হাদিস পেশ করেন।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ : كُنَّا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ فِي سَفَرٍ ، فَحَضَرَ الأَضْحَى ، فَاشْتَرَكْنَا فِي الْجَزُورِ عَنْ عَشَرَةٍ ، وَالْبَقَرَةِ عَنْ سَبْعَةٍ.
অর্থ : ‘হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সঙ্গে সফরে ছিলাম, এমন সময় ঈদুল আজহা উপস্থিত হলো, আমরা ১০ ভাগে উট কোরবানি করেছিলাম এবং সাতভাগে গরু কোরবানি করেছিলাম।’ (সূনান ইবনে মাজা, মুসনাদে আহমদ)

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَامَ الْحُدَيْبِيَةِ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ.

অর্থ : ‘হজরত যাবের ইবনে আবদুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার বছর একটি উটে সাত ভাগ এবং একটি গরুতে সাত ভাগে কোরবানি করেছিলাম।’ (সহহিহ মুসলিম)

উক্ত হাদিসের মধ্যে সফরে ছাড়া ভাগে কোরবানি করা যাবে না এটা বলা হয়নি। বরং রাসূল (সা.) নিজে এই সফরে সাত ভাগে কোরবানি করেছিলেন। তাই আমাদের উচিৎ যদি কারো পক্ষে সম্ভব হয় নিজেই একটা পশু কোরবানি করবেন আর সম্ভব না হলে ভাগে হলেও পশু কোরবানি করতে হবে। ভাগে কোরবানি করার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই, কারণ রাসূল (সা.) নিজেই ভাগে কোরবানি করেছেন।

কোরবানির গোশত বন্টনের বিধান

কোরবানির গোশত বন্টনের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা সরাসরি আল-কোরআনে বিধান বলে দিয়েছেন।

فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ
অর্থ : ‘অতঃপর তোমরা তা হতে আহার কর এবং দুঃস্থ, অভাব গ্রস্থকে আহার করাও।’ (সূরা : আল-হজ্জ, আয়াত : ২৮)

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, কোরবানির গোশত নিজেরা খাও এবং অভাবী ও দুঃস্থদের আহার করাও। আল-হাদিসে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, 

قَالَ : رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم كُلُوا , وَأَطْعِمُوا , وَادَّخِرُوا
অর্থ : ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) কোরবানির গোশত সম্পর্কে বলেছেন, তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর।’ (সহিহ আল-বুখারি)

এখানে আহার করাও বাক্য দ্বারা অভাবগ্রস্থকে দান করা ও আত্মীয়-স্বজনকে উপহার হিসেবে দেওয়াকে বুঝায়। তাই উলামায়ে কেরাম কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে বন্টনের কথা বলেছেন।

১. এক ভাগ দুস্থ ও দরিদ্রদের দান করতে হবে,

২. এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের দান করতে হবে,

৩. একভাগ নিজেরা খেতে পারবে।

অভাবী ও আত্মীয়, প্রতিবেশীর হক দেওয়ার পরে বাকি গোশত কোরবানিদাতা জমিয়ে রেখে আহার করতে পারবে এব্যাপারে কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তবে মহামারি, দুর্যোগ অবস্থায় তিন দিনের বেশি জমিয়ে রাখা নিষেধ। আবার কেউ চাইলে সে তার কোরবানির সম্পূর্ণ গোশতকে বিতরণ করে দিতে পারবে। আর তা করলে উপরোক্ত আয়াতের বিরোধিতা করা হবে না। কারণ ওই আয়াতে খাওয়ার আদেশ হলো মুস্তাহাব বা সুন্নাত।

অমুসলিমকে কোরবানির গোশত দেওয়া যাবে কিনা

কোরবানির গোশত হতে অমুসলিমকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী করার জন্য দেওয়া বৈধ। আর তা ইসলামের এক মহানুভবতা। (ফাতহুল বারী)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) তার ইহুদি প্রতিবেশীকে দিয়ে গোশত বণ্টন শুরু করেছিলেন। (সহিহ আল-বুখারি)

যারা কোরবানির গোশত কোনো কাফেরকে দেওয়া যাবে না বলেন, তারা বায়হাকী বর্ণিত ‘তোমরা মুসলিমদের কোরবানি থেকে মুশরিকদের আহার করিও না মর্মে যে হাদিস দলিল হিসেবে পেশ করেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিস এ হাদিসকে যঈফ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কোরবানির পশুর কোনো অংশ বিক্রি করা বা কসাইকে দেওয়ার বিধান

কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া, চর্বি বা অন্য কোনো কিছু বিক্রি করে নিজে গ্রহন করা জায়েয নেই। তবে দান বা উপহার হিসেবে দরিদ্রকে কিছু দিলে তা নাজায়েয হবে না। তাই কোরবানির চামড়া বিক্রি করা অর্থ এতিম, অসহায় ও দুস্থদের দান করে দিতে হবে।

কসাই বা অন্য কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত দেওয়া জায়েয নেই। এ সম্পর্কে হজরত আলী (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, 

وَأَمَرَهُ أَنْ يَقْسِمَ بُدْنَهُ كُلَّهَا لُحُومَهَا وَجُلُودَهَا وَجِلاَلَهَا فِى الْمَسَاكِينِ وَلاَ يُعْطِىَ فِى جِزَارَتِهَا مِنْهَا شَيْئًا
অর্থ : ‘রাসূল (সা.) এর আদেশ হলো, পশুর গোটা শরীর, তার গোশত ও তার চামড়া মিসকিনদের মাঝে বন্টন করে দিতে হবে। এবং তার প্রস্তুত করণে (কসাইকে) তার থেকে কিছু দেওয়া হবে না।’ (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহ তাআলা আামাদের কাছ থেকে আমাদের জীবন ও সম্পদ ব্যয়ের ইচ্ছাশক্তি ক্রয় করে নিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে আমাদেরকে জান্নাত দান করেছেন। আল্লাহ তাআালা বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَىٰ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ
 অর্থ : ‘আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে।’ (সূরা : আত তাওবাহ, আয়াত : ১১১)

তাই আমাদের উচিত আল্লাহর দেওয়া অর্থের বিনিময়ে পশু ক্রয় করে কোরবানির দিনগুলোতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করে সমাজের এতিম, অসহায়, দরীদ্র মানুষের বাসায় গোস্ত পৌঁছিয়ে দেওয়া। তবেই আল্লাহ আমাদের কোরবানি কবুল করবেন এবং এর উত্তম প্রতিদান দান করবেন। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

দিনবদলবিডি/জিএ

পাঠকপ্রিয়