মঙ্গলবার

০২ মার্চ ২০২১


১৭ ফাল্গুন ১৪২৭,

১৭ রজব ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে ইসলামের নির্দেশনা

ধর্ম ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৩০, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১০:৪৫, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১
ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে ইসলামের নির্দেশনা

ভাষা কোনো ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না, তবে ধর্ম তার নির্দেশনাবলি প্রকাশ এবং উপাসনার মাধ্যম হিসেবে একটি ভাষাকে গ্রহণ করে

ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতির ব্যাপারে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পৃথিবীতে যেমন নানা বর্ণের মানুষ আছে, তেমনি নানাবিধ ভাষা আছে। সব ভাষাই মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার দান। তিনিই মানুষকে কথা বলা শিখিয়েছেন। ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা তাঁর অন্যতম নিদর্শন।

আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি এবং মনের ভাব প্রকাশ করি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। যেকোনো ভাষায় মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করা যায়। আল্লাহ শোনেন, বোঝেন এবং প্রার্থনা কবুল করেন।

আরো পড়ুন >>> আল্লাহর বিশেষ দান: ভাষা ও মাতৃভাষা 

ভাষা কোনো ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে না, তবে ধর্ম তার নির্দেশনাবলি প্রকাশ এবং উপাসনার মাধ্যম হিসেবে একটি ভাষাকে গ্রহণ করে। সেটি সে ধর্মের দাপ্তরিক ভাষা। যেমন- ইসলাম ধর্মের দাপ্তরিক ভাষা আরবি। আরবি ভাষায় পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।

মহানবী রাসূলুল্লাহ (সা.) আরবিভাষী হওয়ায় তাঁর কথা, কাজ ও সম্মতি, যা হাদিস হিসেবে পরিচিত, সেটিও আরবি ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। আরবি আমাদের ধর্মের ভাষা। ধর্মচর্চার জন্য আরবি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আরো পড়ুন >>> ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ ও প্রতিকার

রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ

‘তাঁর আর ও এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।’ (সূরা: রুম, আয়াত: ২২)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا

‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বলো।’  (সূরা: আহজাব, আয়াত: ৭০)

এখানে সঠিক কথার ব্যাখ্যা হলো, যে কথা চারটি বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ। (ক) বিশুদ্ধ হওয়া। (খ) সত্য হওয়া। (গ) গাম্ভীর্যপূর্ণ হওয়া; বিদ্রুপমূলক না হওয়া। (ঘ) কোমল হওয়া।

ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে ইসলামের নির্দেশনা

স্পষ্ট ভাষায় কথা বলা: স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষায় এমনভাবে কথা বলতে হবে, যেন সবাই তা বুঝতে পারে। মুসা (আ.)-এর মুখে জড়তা থাকায় তিনি আল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলেন, 

وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسِلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي 

‘আর আমার ভাই হারুন, সে আমার চেয়ে স্পষ্টভাষী, তাই তাকে আমার সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন, সে আমাকে সমর্থন করবে।’ (সূরা: আল-কাসাস: ৩৪)

স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল ভাষা সবার জন্যই কাম্য বিষয়। প্রয়োজনে কোনো কথা তিনবার বলতে হবে, যেন সবাই তা বুঝতে পারে। কোরআন মজিদে অনেক কথা তিনবার করে বলা হয়েছে। 

আল্লাহ বলেন, 

الْقَارِعَةُ

مَا الْقَارِعَةُ

وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْقَارِعَةُ

‘মহাপ্রলয়, মহাপ্রলয় কী? মহাপ্রলয় সম্পর্কে তুমি কী জান?’ (সূরা: আল-কারিয়া, আয়াত: ১-৩)

এ ছাড়া নবী (সা.) অনেক কথা তিনবার করে বলতেন। আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) যখন কোনো কথা বলতেন তা তিনবার বলতেন, যেন তা বোঝা যায়। (বুখারি, হাদিস: ৯৫)

শালীন ভাষায় কথা বলা: সর্বদা শালীন ভাষায় কথা বলা উচিত। কাউকে ভর্ৎসনা, গালমন্দ ও অভিসম্পাতমূলক, অশ্লীল ও অশালীন কথা ঈমানদারের জন্য শোভনীয় নয়।

আরো পড়ুন >>> একুশে পদকের আদ্যোপান্ত

আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, মুমিন ব্যক্তি কারো প্রতি ভর্ৎসনা ও অভিসম্পাত করে না এবং অশ্লীল ও অশালীন কথা বলে না। (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭৭)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ আর তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি। (বুখারি, হাদিস: ৪৮; মুসলিম, হাদিস: ২৩০)

অনর্থক কথন থেকে বেঁচে থাকা: যেসব কথার দ্বারা ইহকালীন ও পরকালীন কোনো উপকার নেই, ঈমানদার ব্যক্তির এসব কথা থেকে বেঁচে থাকা খুবই দরকার। আল্লাহ তায়ালা অনর্থক কথন থেকে বেঁচে থাকাকে মুমিন ব্যক্তির অন্যতম নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 

আল্লাহ বলেন, 

قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ

الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ

وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ

‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের নামাজে, আর যারা অনর্থক কথন থেকে বেঁচে থাকে।’ (সূরা: আল-মুমিনুন, আয়াত: ১-৩)

হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হলো সে অহেতুক কথা ও কাজ পরিহার করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৮)

আরো পড়ুন >>> আপনি কি মিথ্যার অনুশীলন করছেন মোবাইলের মাধ্যমে?

ব্যঙ্গাত্মকভাবে কথা না বলা: কাউকে বিদ্রুপ, দোষারোপ, অবমাননাকর ও মন্দ নামে ডাকা কোনো ঈমানদারের ভাষা হতে পারে না। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, 

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَومٌ مِّن قَوْمٍ عَسَى أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاء مِّن نِّسَاء عَسَى أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الاِسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

‘মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তওবা না করে তারাই যালেম।’ (সূরা: হুজরাত, আয়াত: ১১)

ঝগড়া ও দ্বন্দ্বমূলক ভাষা এড়িয়ে চলা: আল্লাহ তায়ালা তাঁর একনিষ্ঠ বান্দার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, 

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا

‘রহমান-এর বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞ লোকেরা তাদের সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম।’ (সূরা: ফোরকান, আয়াত: ৬৩)

অর্থাৎ তারা শান্তি কামনা করে এবং তর্কে জড়ায় না।

পরিশেষে বলা যায়, ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগে সংযত হতে হবে। বিশুদ্ধ, স্পষ্ট ও শালীন ভাষায় কথা বলতে হবে। অশ্লীল, অনর্থক, ব্যঙ্গাত্মক, ঝগড়া ও দ্বন্দ্বমূলক ভাষা পরিহার করতে হবে। সর্বোপরি বলার ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়টি স্মরণ রাখতে হবে। ভাষার এই মাসে এমন সচেতনতা একান্ত কাম্য।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা সবাইকে ভাষার প্রতি সম্মান দানের তাওফিক দান করুন।

দিনবদলবিডি/জিএ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়