বৃহস্পতিবার

২২ এপ্রিল ২০২১


৯ বৈশাখ ১৪২৮,

০৯ রমজান ১৪৪২

দিন বদল বাংলাদেশ

তসলিমা কিছু বললেই হাঙ্গামা বেঁধে যায় কেন?

ভারতীয় হিন্দি পত্রিকার বিশ্লেষণ

ফিচার ডেস্ক || দিনবদলবিডি.কম

প্রকাশিত: ২৩:৩৭, ৭ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ২৩:৩৯, ৭ এপ্রিল ২০২১
তসলিমা কিছু বললেই হাঙ্গামা বেঁধে যায় কেন?

তসলিমা, মইন ও আর্চার -ফাইল ফটো

বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের সর্বসাম্প্রতিক এক মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এ সূত্রে তসলিমার কথাবার্তা নিয়ে এত হাঙ্গামা বেঁধে যায় কেন তার বিশ্লেষণে ভারতীয় হিন্দি পত্রিকা নবভারতটাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বুধবার। দিনবদলবিডি.কম পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করে উপস্থাপন করা হলো-    

ইংলিশ ক্রিকেটার মইন আলির বিষয়ে বাংলাদেশের উদারপন্থী লেখিকা তসলিমা নাসরিনের মন্তব্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তার ওপর চতুর্মুখী আক্রমণ চলছে এখন। বিশেষত ইসলামী-বামপন্থী শ্রেণি যেন মাথার উপরে আসমান তুলে নিয়েছে। তবে তসলিমা তার কোনো বক্তব্যের জন্য এই প্রথমবারের মতো টার্গেট হলেন এমনটি নয়। এ জাতীয় ‘বিতর্কিত’ বক্তব্য দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তার। যদি বলা হয় যে এই জাতীয় ‘বিতর্কিত’ বক্তব্যের কারণেই তিনি আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন তবে কিছু ভুল বলা হবে না। তসলিমা কট্টরপন্থীদের নিশানায় তো এমনিতেই থাকেন, তথাকথিত উদার বামপন্থীরাও সময়ে সময়ে তার ওপর চড়াও হন। আসুন, জেনে নেই এ যাবত কোন কোন সময়ে তসলিমা মুখ খুলতেই হাঙ্গামার সৃষ্টি হয়েছে-

মইন আলিকে খোঁচা দিয়ে করা তসলিমার টুইট

ক্রিকেটারকে নিয়ে মন্তব্য করে চতুর্মুখী চাপে তসলিমা
গত মঙ্গলবার ইংল্যান্ডের একজন ক্রিকেটারকে নিয়ে তসলিমা নাসরিন যা বলেছিলেন তা নিয়ে প্রচণ্ড তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তিনি টুইট করেছিলেন যে ইংল্যান্ডের এই  অলরাউন্ডার (মইন আলি) ক্রিকেটার না হলে তিনি আইএসআই-তে যোগ দিতেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইংল্যান্ডের ফাস্ট বোলার জোফরা আর্চার তসলিমার তীব্র নিন্দা করেন। যাইহোক, (সামাজিক মাধ্যমে) তার ওপর আক্রমণ বাড়তে দেখে তসলিমা ওই টুইটটি সরিয়ে নেন এবং এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে তিনি আসলে বিষয়টি নিয়ে রসিকতা করেছিলেন, কিন্তু লোকজন রসিকতা বুঝতে পারে না। 

(তসলিমার কথা হয়তো) ঠিক আছে, কিন্তু এ প্রসঙ্গে সত্যটি হচ্ছে এই যে- এই জাতীয় মন্তব্যকে আসলে রসিকতা হিসাবে নেওয়া যায় না।

তসলিমা এবং মামলা-ফতোয়ার জঞ্জাল
১৯৯০-এর দশকে তসলিমা নাসরিন দুনিয়ার নজরে আসেন যখন তার বিরুদ্ধে নিজ দেশ বাংলাদেশে ‘ইসলাম অবমাননার’ অভিযোগ উঠে। তিনি তার জীবনীতে মুসলিম সমাজে বিরাজমান কুপ্রথা ও ধর্মান্ধতার উল্লেখ করেন, যার কারণে বিক্ষুব্ধ মাওলানারা তার বিরুদ্ধে ফতোয়ার পর ফতোয়া জারি করতে থাকে। আদালত তার বই নিষিদ্ধ করে। অন্যদিকে, মুসলমানদের কট্টরপন্থী ধারা তাকে হত্যার ফিকির শুরু করে। পরিস্থিতি এমন হয় যে তাকে নিজ দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

লেখক-সাহিত্যিকদেরও তোপের মুখে তসলিমা
১৯৯৪ সালে তসলিমা একদিকে মুসলিম ধর্মীয় গুরু অপরদিকে সরকারেরও নিশানায় পরিণত হন। মোল্লারা তার মুণ্ডু কাটার ফতোয়া জারি করে আর সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ১৯৯৩ সালে তার 'লজ্জা' বই প্রকাশের কারণে এমনটি ঘটেছিল। তসলিমা পালিয়ে পশ্চিমা দেশগুলিতে আশ্রয় নিতে শুরু করে। তিনি ফেলো হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হিউম্যান রাইট্‌স পলিসিতে যোগদান করেন। তবে তার জীবনী সিরিজের তৃতীয় বইটি লেখক এবং সাহিত্যিক মহলে হৈ চৈ তৈরি করে। বাংলা ভাষার একটি বর্ণ ‘ক’ শিরোনামে তার প্রকাশিত ওই বইয়ে বাংলাদেশি লেখক সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে বয়ান সাহিত্য জগতে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারতীয় সাহিত্যিক-লেখকরাও তসলিমার পিছনে পড়ে যান। তসলিমা তার বইয়ে দাবি করেছেন যে লেখক সৈয়দ শামসুল হক তার শ্যালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন তার কাছে।

ইসলামের দিকে বেশি মনোযোগ তসলিমার
বিশেষত ইসলাম ও এর অনুসারীদের ওপর কড়া নজরদারি রাখেন তসলিমা। এমনকি তিনি বিশ্বকে ইসলাম বর্জন করারও আহ্বান করেছেন। ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর তিনি টুইট করেছিলেন, ‘বয়কট ইসলাম’ (ইসলাম বর্জন করুন)। এই টুইটের প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস-বামপন্থী ধারার অ্যাক্টিভিস্ট সাকেত গোখলে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। গোখলে এই টুইটটির বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। এর কিছুদিন পরে তসলিমা টুইট করেন, ‘ইসলাম ধর্মের সংস্কার দরকার, নচেৎ আধুনিক সভ্যতায় এই ধর্মের কোনও স্থান নেই।’ তসলিমা বলেন যে ইসলাম শান্তির ধর্ম-ই নয়। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলা ছেড়ে দেয়া উচিত। ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কে তার অনেক বক্তব্য বিতর্কের জন্ম দেয়।

বামপন্থী, উদারপন্থীদেরও সমালোচনা
তসলিমা নাসরিন তথাকথিত বামপন্থী ও উদারপন্থীদেরকে ইসলামী ডানপন্থী হিসেবে দেখেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন যে বাম এবং উদারপন্থী যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ঢোল পেটায় তারা বাস্তবে ইসলামের সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের সামর্থ রাখে না। একইভাবে, তিনি নারীবাদীদেরও নিশানা করেছেন এই বলে যে, নারীবাদীরা যে নারীর অধিকারের কথা বলে, তারা ইসলামকে এবং নারীদের গৌণ মর্যাদাকর হিসেবে বিবেচিত ইসলামিক রীতিনীতিকে কীভাবে সমর্থন করতে পারে? 

তসলিমার টুইটের জবাবে মইন আলির সতীর্থ জোফরা আর্চারের টুইট

মইন আলিকে নিয়ে মন্তব্যের পরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় বামপন্থী, উদারপন্থী ও নারীবাদীদের কঠোর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি এক টুইটে লিখেন, ‘আপনি যদি ইসলাম ব্যতীত অন্যান্য ধর্মের সমালোচনা করেন তবে আপনাকে প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তক, উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, বুদ্ধিজীবী, বিপ্লবী বলা হয়। কিন্তু যদি ইসলামকে সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেন, তখন আপনি ঘৃণ্য, ভীতিজনক, বিরক্তিকর, ধর্মান্ধ ও মাসোহারাভোগী দালাল হয়ে যাবেন।’

ভারতে তসলিমার জীবন
দুনিয়াজুড়ে চক্কর কাটার পর তসলিমা ভারতকে তার শেষ গন্তব্যস্থল বানিয়ে নিয়েছেন। তিনি ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য লাগাতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের নাগরিকত্ব না পেলেও সুইডেনের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অবশ্য সাফল্য পেয়েছেন। তবে তিনি বেশিরভাগ সময় ভারতে কাটান। ১৯৯০ এর দশকে বাংলাদেশ ত্যাগ ছাড়ার পর দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো তসলিমা নাসরিনকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়ার সাহস কোনো সরকারই যোগাতে পারেনি। সরকারগুলি আশঙ্কা করে যে তসলিমাকে গ্রহণ করতে গেলেই কোটি কোটি মুসলমান এবং তথাকথিত উদারপন্থীরা মাথায় আসমান তুলে নেবে। দেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা না দেখা দেয়- এই আশঙ্কায় সরকারগুলি তার ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় ঠিকই, তবে পুরো নাগরিকত্ব দিতে নারাজি থাকে।

মোদি সরকার যখন তসলিমার বিষয়ে...
কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের কয়েক মাস পরে তসলিমা নাসরিন ভারতের নাগরিকত্বের জন্য পুনরায় আবেদন করেছিলেন। ভারতীয় মুসলমানদের সন্দেহ ছিল যে মোদী সরকার তসলিমাকে নাগরিকত্ব দিয়ে দেবে। তখন সামনে ঈদ উৎসব। এ উপলক্ষে কলকাতার রেড রোডে আয়োজিত এক সমাবেশে মাওলানা ক্বারি ফজলুর রহমান মোদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। যাহোক, যখন কয়েক দিন পরে মোদি সরকার তাসলিমার অস্থায়ী ট্যুরিস্ট ভিসার মেয়াদ দুই মাস বাড়িয়ে দিলেও তাকে নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন একই মাওলানা ফজলুর রহমান আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন। তিনি মোদি সরকারের প্রশংসা করে বলেন যে এই ঘোষণাটি বেশ আগেই করা উচিত ছিল।

ভরা সংসদে প্রণব দা বলেছিলেন- তসলিমাকে আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত থাকবে 
এটি নভেম্বর ২০০৭ সালের কথা। বিজেপি তখন বিরোধী দলে। লোকসভায় বিজেপির এক প্রশ্নের জবাবে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারে পশ্চিম বাংলার শক্তিমান নেতা প্রণব মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন যে তার সরকার ভারতে তসলিমা নাসরিনকে আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রাখবে। তিনি আরও বলেছিলেন যে তসলিমার জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে  নিরাপত্তা প্রদানও অব্যাহত থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, ‘ভারত তার সমগ্র ইতিহাসে এমন কাউকে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেনি যে এখানে এসে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেছে।’ তিনি বলেছিলেন যে সভ্যতার এই ঐতিহ্য এখন সরকারের নীতিতে পরিণত হয়েছে যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। 

সেদিন আসলে, সরকারকে বিরোধী দলে বসে থাকা বিজেপি প্রশ্ন করেছিল যে কেন বাংলাদেশি লেখিকাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে? তাকে এখন কোথায় রাখা হবে? সরকার তার সুরক্ষার জন্য কী ব্যবস্থা করবে এবং তসলিমার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে ফের পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দেওয়া হবে কি না?

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়