ফেইক ফেসবুক প্রোফাইল শনাক্তে করণীয়

দিনবদলবিডি ডেস্ক || দিন বদল বাংলাদেশ

প্রকাশিতঃ দুপুর ০১:১৮, শনিবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২২, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

ব্যক্তিগত কথপোকথন ও অন্যান্য যোগাযোগের জন্য মানুষের কাছে অন্যতম পছন্দের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে ফেসবুক।

ফেসবুকের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষমতা, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি প্রায়ই অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় এমনও হতে পারে, আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন বলে ভাবছেন তিনি হয়তো সেই ব্যক্তিই না। ফেসবুকের একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে এই ফেইক প্রোফাইল বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট। তাই এই ফেইক অনলাইন প্রোফাইলের যুগে সতর্ক থাকাটা বেশ জরুরি।

ফেসবুকে কীভাবে একটি ফেইক প্রোফাইল চিহ্নিত করা যায় এবং এই প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে দূরে থাকা যায় তা নিয়েই আজকের আলোচনা। প্রথম দেখায় একটি আসল এবং ফেইক প্রোফাইল দেখতে একইরকম লাগবে।

আজকের আলোচনায় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কেন মানুষ ফেসবুকে ভুয়া প্রোফাইল খোলে এবং কীভাবে আপনি তা শনাক্ত করতে পারবেন। এর জন্য প্রথমে আমাদের জানতে হবে মানুষ কেন ফেইক ফেসবুক প্রোফাইল তৈরি করে?

ফেসবুকে আপনার আসল পরিচয় ব্যবহার করার বেশ কিছু ভালো দিক রয়েছে। আসল পরিচয় বা প্রোফাইল ব্যবহারে আপনার বন্ধুরা আপনাকে সহজেই এখানে খুঁজে পাবেন এবং আপনি যদি এই প্ল্যাটফর্মে ব্যবসা করেন তাহলে এর মাধ্যমে আপনি একটি বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডও তৈরি করতে পারবেন। তারপরও মানুষ কেন ফেইক ফেসবুক প্রোফাইল তৈরি করে?

এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে ভুয়া পরিচয় তৈরি করা বা অন্যের পরিচয় ধারণ করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নোয়াখালীর একজন কলেজছাত্র নিজেকে ঢাকায় বসবাসকারী এয়ারলাইন্স পাইলট হিসেবে পরিচয় দিতে পারে। এই পরিচয় দিয়ে সে তার ফ্রেন্ডলিস্টের যেকোনো মেয়ে বন্ধুকে তার প্রতি দুর্বল করতে পারে।

এ ছাড়া কোনো পরিবারের সদস্যদের গোপন তথ্য জানার জন্য স্ক্যামাররা ওই পরিবারের সদস্যদের ফেইক প্রোফাইল তৈরি করে। যার মাধ্যমে তারা পরিবারের তথ্যগুলো জেনে যায়, যেগুলো সাধারণভাবে পরিবারের সদস্যরা অপরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করতো না।

আবার, সেলিব্রেটি কিংবা বৈধ কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে মানুষের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎও করা যায় ফেইক প্রোফাইলের মাধ্যমে। একবার যদি কেউ ফেসবুকে একটি ভুয়া পরিচয় দিয়ে প্রমাণ করতে পারে যে এটা তার আসল পরিচয়। তাহলে বলা ভুল হবে না, সেই ফেইক প্রোফাইলের সীমাহীন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। তাহলে আপনি ঠিক কীভাবে একটি ফেইক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বা প্রোফাইল চিহ্নিত করবেন?

ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল শনাক্তের ৫ টিপস-

নকল বা চুরি করা ছবি

ফেইক প্রোফাইলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের তেমন কোনো ঘটনার উল্লেখ থাকে না। কারণ এই জীবনধারাটা ফেইক প্রোফাইলের ব্যক্তিটি প্রকৃতপক্ষে অনুসরণই করছে না। এর পরিবর্তে তারা নিজেদের অ্যাকটিভ হিসেবে দেখানোর জন্য প্রচুর ছবি ব্যবহার করা শুরু করে। তারা যে ছবিগুলো পোস্ট করে সেগুলোর ধরন বুঝতে হবে। তারা যে লাইফস্টাইলটা দেখাচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তারা তা অনুসরণ করছে না। তাই তারা যে ব্যক্তির ফেইক প্রোফাইল খুলেছে, সেই ব্যক্তির ছবি চুরি করে ব্যবহার করতে হয়। এগুলো বিশেষ করে অনলাইন ডেটিং স্ক্যামারদের ব্যবহৃত ফেইক ফেসবুক প্রোফাইলে বেশি হয়ে থাকে।

আপনি যদি একটি একাউন্টকে ফেইক হিসেবে সন্দেহ করেন, তাহলে আপনি সহজেই গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ করে তা যাচাই করে নিতে পারেন। অথবা আপনি টিনআই (Tineye) এবং Pixsy (পিক্সসি)-এর মতো অন্যান্য ডেডিকেটেড ইমেজ সার্চ টুল ব্যবহার করতে পারেন। প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। এর জন্য আপনাকে শুধু সেখানে ছবিটি আপলোড করতে হবে এবং সার্চ করতে হবে।

এ ছাড়া আপনি যদি আগে অন্য কোথাও একই ছবি কোনো সময়ে পোস্ট করা হয়েছে দেখে থাকেন, তাহলে এমন হতে পারে যে আপনি যে অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন সেটি একটি ফেইক একাউন্ট।

একটি অসামঞ্জস্যতাপূর্ণ টাইমলাইন

ফেসবুকে অনেক ভুয়া অ্যাকাউন্ট বিক্রি করা কিংবা হ্যাক করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে সত্য যে পুরোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলোরা জন্য একটি সমৃদ্ধ ব্ল্যাক মার্কেটও রয়েছে। যদি একজন ব্যক্তি একটি নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির ছদ্মবেশ নেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে এটি বেশ সহজেই শনাক্ত করা যায়। তাই অসৎ ব্যক্তিরা পুরানো অ্যাকাউন্টগুলো খুঁজে বেড়ায়। এই ব্ল্যাক মার্কেটগুলো থেকে ইচ্ছে অনুযায়ী যেকোনো দেশের ১০ বছরের পুরনো একটি একাউন্ট যে কেউ কিনে নিতে পারে। কিন্তু এই পদ্বতিতে ফেইক প্রোফাইল ব্যবহার করলে একটি ভুল সবসময়ই থেকে যায়। যা হচ্ছে একটি অসামঞ্জস্যতাপূর্ণ টাইমলাইন।

আপনি যদি কিছু ফেইক প্রোফাইলের টাইমলাইনে যথেষ্ট সময় পর্যন্ত ঘুরে দেখেন তাহলে আপনি তাদের পোস্ট করার পদ্ধতিতে এক ধরনের অসঙ্গতি লক্ষ্য করবেন। কিছু মানুষ কেবল আগের সমস্ত পোস্ট মুছে ফেলে এবং শুধু নতুন করে পোস্ট করা শুরু করে। এই কারণে আপনার একটি ফাঁকা টাইমলাইনযুক্ত অ্যাকাউন্ট দেখলে সতর্ক হওয়া উচিত।

এ ছাড়া কখনো কখনো আপনি দীর্ঘ সময় ধরে একটি প্রোফাইল থেকে কোনো পোস্ট পাবেন না এবং দেখবেন যে হঠাৎ প্রায় প্রতিদিনই পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের আচরণ একটি সতর্কবাণী।

সাহায্যের জন্য অদ্ভুত কোনো গল্প

যদি আপনার কোনো বন্ধু বা পরিবারের সদস্য ফেসবুকে অস্বাভাবিকভাবে কোনো তথ্য বা সাহায্য চায়, তাহলে সেই বিষয়টিকে সাবধানতার সঙ্গে মূল্যায়ন করুন।

আপনি যতদিন ধরেই কারো সঙ্গে ফেসবুকে বন্ধু থাকেন না কেন, কখনোই কোনো সন্দেহজনক গল্প বিশ্বাস করবেন না। বিশেষ করে যার জন্য আপনার কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সংস্থান বা গোপন তথ্য চাওয়া হতে পারে।

বেশিরভাগ স্ক্যামাররা ফেসবুকে তাদের স্ক্যাম করতে সফল হওয়ার কারণ হলো ভুক্তভোগীরা সাধারণত ভাবে যে, তারা জানে যে তারা কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এই বানোয়াট কিংবা সন্দেহজনক গল্পগুলো বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন- তারা বলতে পারে, আপকে তাদের একটি অনলাইন সার্ভিসের জন্য অর্থ প্রদান করে সহায়তা করতে, কারণ তাদের ওই মুহূর্তে ক্রেডিট কার্ড বা অনুরূপ কিছু নেই। আফ্রিকায় জাতিসংঘের মিশনে একজন মার্কিন সৈনিকের একটি জনপ্রিয় গল্প রয়েছে। যেখানে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে বলা হয় ‘একজন সৈনিকের আফ্রিকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার জন্য আপনার সাহায্যের প্রয়োজন।’ এমন ধরনের অসংগতি দেখতে পেলে সেটা অবশ্যই ফেইক ফেসবুক প্রোফাইল।  

যে একাউন্ট থেকে খুব কম মেসেজ আসে

প্রচুর সংখ্যক ফেইক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা বটের মাধ্যমে বা কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এরা আপনার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানে না। ফলস্বরূপ তারা সাধারণত এমন কোনো কথোপকথন এড়াতে চেষ্টা করবে যা আপনার সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের অভাব প্রকাশ করতে পারে। এই কারণেই একটি অ্যাকাউন্ট ফেইক কি না তা নিশ্চিত করার একটি ভালো উপায় হলো একটি গভীর কথোপকথন শুরু করা।

মিউচুয়াল ফ্রেন্ড নেই এমন আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাওয়া

আপনি যদি এমন অ্যাকাউন্টগুলো থেকে প্রচুর ফেন্ড রিকোয়েস্ট পান যেগুলোর সঙ্গে আপনার কোনো মিচ্যুয়াল ফ্রেন্ড নেই, তাহলে সেটি ফেইক একাউন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যা আপনাকে টার্গেট করে করা হচ্ছে। প্রচুর ফেইক প্রোফাইল রয়েছে, যেগুলো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতারিত করার জন্য তৈরি করা হয়। এগুলো চিহ্নিত করার আরও জটিল কারণ তারা আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে আসে। এগুলো কিছু উদাহরণ মাত্র, যেগুলোতে আপনার লক্ষ্য রাখা উচিত।

চাইলে আপনি আপনার প্রোফাইলে কে আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারবেন সে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আপনার সঙ্গে  মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ড নেই এমন কেউ আপনাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারবে না এই বিষয়টিও নিশ্চিত করা সম্ভব।

এটা করার জন্য আপনার ফেসবুক অ্যাপের সেটিংস অপশনে গিয়ে নিচের দিকে স্ক্রল করে, ‘হাউ পিপল ক্যান ফাইন্ড অ্যান্ড কন্টাক্ট ইউ অপশনে ক্লিক করুন।’ তারপর, ‘হু ক্যান সেন্ড ইউ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট?’ থেকে ‘ফ্রেন্ডস অব ফ্রেন্ডস’ অপশনটি সিলেক্ট করুন।

নিজেকে ফেইক প্রোফাইল হতে দূরে রাখুন

না দেখে যেন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট কেউ অ্যাকসেপ্ট না করে সেই বিষয়ে আপনার বন্ধুদের জানান। বহু মানুষ যেকোনো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেলেই তা অ্যাকসেপ্ট করে, যা তাদের অসৎ ব্যক্তির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়।

আপনি যদি কাউকে চেনেন কি না তা নিশ্চিত হতে না পারেন তাহলে তাদের একটি মেসেজ পাঠান এবং তাদের পরিচয় মনে করিয়ে দিতে বলুন। যদি তারা না পারে কিংবা কোনো উত্তর না দেয় তাহলে বুঝতে হবে, তারা সম্ভবত আপনার পরিচিত কেউ নয়। আপনি যদি মনে করেন যে অ্যাকাউন্টটি কেউ একজন আপনার বন্ধুর ছদ্মবেশে ব্যবহার করছে, তাহলে ফেসবুকে যোগাযোগ না করে  ইমেইল বা ফোন নাম্বারের মাধ্যমে সেই বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করুন। এ ছাড়া আপনার মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ডদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে নিন, অ্যাকাউন্টটি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করছে তা আসল কি না।

তথ্যসূত্র: মেক ইউজ অব

দিনবদলবিডি/আরএজে

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়